ডায়াবেটিস কী, কেন হয় এবং কাদের পরীক্ষা করা উচিত? লক্ষণ, ধরন ও সঠিক পরীক্ষার নির্দেশনা
ডায়াবেটিসের ধরন, কারণ, লক্ষণ, ঝুঁকি, জরুরি সংকেত এবং HbA1c, fasting glucose ও OGTT দিয়ে কাদের পরীক্ষা করা উচিত, জানুন প্রমাণভিত্তিকভাবে।
স্বাস্থ্য • জনসচেতনতা • তথ্যযাচাই
ডায়াবেটিস কী, কেন হয় এবং কাদের পরীক্ষা করা উচিত? লক্ষণ, ধরন ও সঠিক পরীক্ষার নির্দেশনা
ডায়াবেটিস শুধু বেশি চিনি খাওয়ার কারণে হওয়া একটি রোগ নয়। শরীরে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ব্যাহত হলে বিভিন্ন ধরনের ডায়াবেটিস হতে পারে। ধরন অনুযায়ী এর কারণ, পরীক্ষা ও চিকিৎসাও আলাদা হতে পারে।
পাঠকের জন্য চিকিৎসাবিষয়ক সতর্কতা
এই নিবন্ধটি সাধারণ স্বাস্থ্যশিক্ষার জন্য। এটি ব্যক্তিগত রোগনির্ণয়, ওষুধ পরিবর্তন কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষার ফল ব্যাখ্যা, গর্ভাবস্থা, শিশু-কিশোর, সম্ভাব্য টাইপ ১ ডায়াবেটিস কিংবা গুরুতর উপসর্গের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
সম্পাদকীয় নোট
এই নিবন্ধটি ৮ অক্টোবর ২০২২ তারিখে দ্য ব্যাকস্পেস জার্নালে প্রকাশিত একটি লেখার কেন্দ্রীয় প্রশ্নকে বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকা এবং নতুন তথ্যযাচাইয়ের ভিত্তিতে সম্পূর্ণভাবে পুনর্গঠন করে প্রস্তুত করা হয়েছে। পুরোনো লেখার অপ্রচলিত শ্রেণিবিভাগ, অতিরঞ্জিত কারণ, প্রমাণহীন খাদ্যদাবি এবং বিভ্রান্তিকর চিকিৎসাবিষয়ক ব্যাখ্যা বর্তমান সংস্করণে ব্যবহার করা হয়নি।
এক নজরে মূল কথা
১. ডায়াবেটিস একক কোনো রোগ নয়। টাইপ ১, টাইপ ২, গর্ভকালীন এবং আরও কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ডায়াবেটিস রয়েছে।
২. টাইপ ১ ডায়াবেটিসে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুল করে ইনসুলিন তৈরির কোষ আক্রমণ করে।
৩. টাইপ ২ ডায়াবেটিসে শরীর ইনসুলিনের নির্দেশে স্বাভাবিকভাবে সাড়া দিতে পারে না এবং সময়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ইনসুলিনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
৪. টাইপ ২ ডায়াবেটিস শুরুতে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে।
৫. শুধু উপসর্গ থাকলেই নয়, বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ীও পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
৬. বাড়ির গ্লুকোমিটারে পাওয়া একবারের ফল দিয়ে নিজে নিজে চূড়ান্ত রোগনির্ণয় বা ওষুধ পরিবর্তন করা উচিত নয়।
বাংলাদেশে ডায়াবেটিস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের ২০২৪ সালের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ মানুষ ডায়াবেটিস নিয়ে বসবাস করছিলেন। বয়সের পার্থক্য সমন্বয় করে সংস্থাটি দেশে ডায়াবেটিসের হার ১৩.২ শতাংশ বলে হিসাব করেছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের আনুমানিক ৩৯.১ শতাংশ তখনো নিজের রোগ সম্পর্কে জানতেন না।
এই সংখ্যাগুলো দেশের প্রত্যেক মানুষকে পরীক্ষা করে পাওয়া সরাসরি গণনা নয়। জাতীয় তথ্য ও বিভিন্ন গবেষণার ভিত্তিতে এগুলো তৈরি করা হয়েছে। তবু বিপুলসংখ্যক মানুষের রোগ শনাক্ত না হওয়ার আশঙ্কা কেন বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী পরীক্ষা প্রয়োজন, তা স্পষ্ট করে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্যন্ত্র, রক্তনালি, চোখ, কিডনি ও স্নায়ুর ক্ষতি হতে পারে। অন্যদিকে রোগ দ্রুত শনাক্ত করা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা, উপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ বা ইনসুলিনের মাধ্যমে এসব জটিলতার ঝুঁকি কমানো বা বিলম্বিত করা সম্ভব।
রক্তের গ্লুকোজ ও ইনসুলিন কীভাবে কাজ করে?
ভাত, রুটি, আলু, ফল ও অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাবার হজম হওয়ার পর তার একটি অংশ গ্লুকোজে পরিণত হয়। গ্লুকোজ হলো শরীরের কোষের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানিগুলোর একটি। রক্তের মাধ্যমে গ্লুকোজ শরীরের বিভিন্ন কোষে পৌঁছায়।
রক্ত থেকে অধিকাংশ কোষে গ্লুকোজ প্রবেশ ও ব্যবহারের জন্য ইনসুলিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইনসুলিন হলো শরীরের একটি রাসায়নিক বার্তাবাহক বা হরমোন। এটি অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন তৈরিকারী বিটা কোষ থেকে তৈরি হয়। অগ্ন্যাশয় পেটের ভেতরে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজ বাড়লে সুস্থ অগ্ন্যাশয় প্রয়োজন অনুযায়ী ইনসুলিন ছাড়ে। ইনসুলিন শরীরের কোষকে গ্লুকোজ গ্রহণের নির্দেশ দেয় এবং যকৃতে গ্লুকোজ জমা রাখা ও ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। এই ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটলে রক্তে গ্লুকোজ জমতে শুরু করতে পারে।
ইনসুলিন কোষকে রক্ত থেকে গ্লুকোজ গ্রহণ ও ব্যবহার করার সংকেত দেয়। শরীরে ইনসুলিন একেবারে না থাকলে, প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকলে অথবা শরীর ইনসুলিনের নির্দেশে ঠিকভাবে সাড়া না দিলে রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যেতে পারে।
সহজভাবে বুঝুন
ডায়াবেটিস কী?
ডায়াবেটিস মেলিটাস হলো কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি বিপাকীয় অবস্থার সমষ্টি। বিপাক বলতে শরীর কীভাবে খাবারকে শক্তিতে রূপান্তর ও ব্যবহার করে, সেই প্রক্রিয়াকে বোঝায়। ডায়াবেটিসে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না, তৈরি হওয়া ইনসুলিন যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারে না অথবা দুটি সমস্যাই একসঙ্গে দেখা দেয়।
এর ফলে রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে হাইপারগ্লাইসেমিয়া বলা হয়। দীর্ঘ সময় রক্তে গ্লুকোজ বেশি থাকলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
একদিন বেশি মিষ্টি খাওয়া অথবা একবার রক্তে গ্লুকোজ কিছুটা বেড়ে যাওয়া মানেই ডায়াবেটিস নয়। রোগনির্ণয়ের জন্য স্বীকৃত পরীক্ষাগারে নির্দিষ্ট রক্ত পরীক্ষা এবং নির্ধারিত ফলের সীমা অনুসরণ করতে হয়। খুব স্পষ্ট জরুরি অবস্থা না থাকলে একটি অস্বাভাবিক ফল সাধারণত পুনরায় অথবা অন্য স্বীকৃত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়।
ডায়াবেটিসের প্রধান ধরন
১. টাইপ ১ ডায়াবেটিস
টাইপ ১ ডায়াবেটিসে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুল করে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন তৈরিকারী বিটা কোষ আক্রমণ করে। এই প্রক্রিয়াকে অটোইমিউন প্রক্রিয়া বলা হয়। এর ফলে ইনসুলিন উৎপাদন ক্রমে অত্যন্ত কমে যায়।
টাইপ ১ ডায়াবেটিস নিয়ে নিরাপদে বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত ইনসুলিন প্রয়োজন হয়। ইনসুলিন গ্রহণ করা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এই ধরনের ডায়াবেটিসে ইনসুলিন জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা।
রোগটি শিশু ও কিশোর বয়সে বেশি শনাক্ত হলেও যেকোনো বয়সে শুরু হতে পারে। তাই একে শুধু শিশুদের ডায়াবেটিস বলা সঠিক নয়।
২. টাইপ ২ ডায়াবেটিস
টাইপ ২ ডায়াবেটিসের শুরুতে শরীরের পেশি, যকৃৎ ও চর্বি কোষ ইনসুলিনের নির্দেশে আগের মতো সাড়া দিতে পারে না। এই অবস্থাকে ইনসুলিন প্রতিরোধ বলা হয়।
অগ্ন্যাশয় প্রথমে বেশি ইনসুলিন তৈরি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ইনসুলিন তৈরিকারী বিটা কোষ শরীরের বাড়তি চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হতে পারে। তখন রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যায়।
বংশগত ঝুঁকি, বয়স, পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, আগে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে চর্বির অস্বাভাবিকতা, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম এবং কিছু ওষুধ টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে একটি কারণ দিয়ে প্রত্যেক মানুষের টাইপ ২ ডায়াবেটিস ব্যাখ্যা করা যায় না।
৩. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস
গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় বা তৃতীয় পর্যায়ে প্রথম শনাক্ত হওয়া ডায়াবেটিসকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বলা হতে পারে, যদি গর্ভধারণের আগে ডায়াবেটিস থাকার স্পষ্ট প্রমাণ না থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস মেলিটাস বা সংক্ষেপে জিডিএম বলা হয়।
গর্ভাবস্থায় শরীরে হরমোন ও বিপাকীয় পরিবর্তনের কারণে ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সাড়া কমে যেতে পারে। এতে রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সন্তান জন্মের পর রক্তের গ্লুকোজ স্বাভাবিক হয়ে গেলেও ভবিষ্যতে প্রিডায়াবেটিস বা টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি শেষ হয় না। তাই সন্তান জন্মের পর পরীক্ষা এবং পরবর্তী জীবনে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
৪. অন্যান্য নির্দিষ্ট ধরনের ডায়াবেটিস
কিছু ডায়াবেটিস বিশেষ ধরনের বংশগত পরিবর্তন, অগ্ন্যাশয়ের রোগ বা ক্ষতি, সিস্টিক ফাইব্রোসিস, হরমোনের সমস্যা অথবা নির্দিষ্ট ওষুধের কারণে হতে পারে। সঠিক ধরন নির্ধারণ জরুরি, কারণ এক ধরনের ডায়াবেটিসের চিকিৎসা অন্য ধরনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত নাও হতে পারে।
টাইপ ১.৫ বা লাডা কী?
“টাইপ ১.৫” কোনো আনুষ্ঠানিক রোগপর্যায় নয়। এই নামটি সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের ধীরগতির অটোইমিউন ডায়াবেটিস বোঝাতে অনানুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করা হয়। এর পূর্ণ ইংরেজি নাম Latent Autoimmune Diabetes in Adults এবং সংক্ষিপ্ত নাম LADA বা লাডা। বর্তমান চিকিৎসাবিষয়ক শ্রেণিবিভাগে এটি টাইপ ১ ডায়াবেটিসের অন্তর্ভুক্ত।
লাডা শুরুতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের মতো মনে হতে পারে। কারণ রোগ শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আক্রান্ত ব্যক্তির ইনসুলিন প্রয়োজন নাও হতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন তৈরির ক্ষমতা কমতে থাকে।
রক্তে বিশেষ ধরনের প্রতিরোধী উপাদান শনাক্ত করার পরীক্ষা এবং শরীর কতটা ইনসুলিন তৈরি করছে তা বোঝার জন্য সি-পেপটাইড পরীক্ষা রোগের ধরন নির্ধারণে চিকিৎসককে সাহায্য করতে পারে। দীর্ঘদিন টাইপ ২ ডায়াবেটিস থাকার কারণে লাডা তৈরি হয় না। একইভাবে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে পরে ইনসুলিন প্রয়োজন হওয়া মানেই রোগটি টাইপ ১-এ পরিণত হয়েছে, এমন নয়।
টাইপ ১ ডায়াবেটিসকে “টাইপ এ” এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসকে “টাইপ বি” বলা বর্তমান স্বীকৃত শ্রেণিবিভাগ নয়। এ ধরনের অপ্রচলিত নাম ব্যবহার করলে পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন
ডায়াবেটিস কেন হয়?
সব ধরনের ডায়াবেটিস একই কারণে হয় না। টাইপ ১ ডায়াবেটিসে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ভুল আক্রমণে ইনসুলিন তৈরিকারী কোষ ধ্বংস হওয়া কেন্দ্রীয় বিষয়। টাইপ ২ ডায়াবেটিসে ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সাড়া কমে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় ইনসুলিন সরবরাহে অগ্ন্যাশয়ের ক্রমশ ব্যর্থ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে গর্ভাবস্থার হরমোন ও বিপাকীয় পরিবর্তন ভূমিকা রাখে। আবার অগ্ন্যাশয়ের রোগ, বিশেষ বংশগত পরিবর্তন এবং কিছু ওষুধের কারণেও নির্দিষ্ট ধরনের ডায়াবেটিস হতে পারে।
“শুধু বেশি চিনি খেলেই ডায়াবেটিস হয়” কথাটি সঠিক নয়। অতিরিক্ত ক্যালরি, চিনিযুক্ত পানীয় এবং কম পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস ওজন ও বিপাকীয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কিন্তু ডায়াবেটিস তৈরিতে বংশগত বৈশিষ্ট্য, বয়স, শরীরে চর্বির অবস্থান, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম, ওষুধ, গর্ভাবস্থা, খাদ্য পাওয়ার সুযোগ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশসহ অনেক কারণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রদাহের ভূমিকা কতটা?
শরীরে দীর্ঘদিন ধরে চলা মৃদু প্রদাহ টাইপ ২ ডায়াবেটিস তৈরি হওয়া এবং ধীরে ধীরে বেড়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। চর্বি জমার স্থানে অস্বাভাবিকতা, কোষের ওপর বিপাকীয় চাপ, প্রদাহজনিত সংকেত এবং অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন তৈরিকারী কোষের পরিবর্তন ইনসুলিন প্রতিরোধ ও ইনসুলিনের ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
টাইপ ১ ডায়াবেটিসে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার প্রদাহজনিত প্রক্রিয়া বিটা কোষ ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত। তবে প্রদাহকে সব ধরনের ডায়াবেটিসের একমাত্র বা চূড়ান্ত কারণ বলা যায় না। প্রদাহ কখনো রোগ তৈরির প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে, কখনো রোগের ফল হিসেবে বাড়তে পারে এবং কখনো দুটি ঘটনাই একসঙ্গে ঘটতে পারে।
তাই শরীরে প্রদাহ থাকলেই ডায়াবেটিস হবে অথবা প্রদাহ কমাতে পারলেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ নিশ্চিত হবে, এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
আইএপি ও অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণা কী বলছে?
ইনটেস্টাইনাল অ্যালকালাইন ফসফাটেজ বা সংক্ষেপে আইএপি হলো অন্ত্রে তৈরি একটি এনজাইম। এনজাইম হলো শরীরের বিভিন্ন রাসায়নিক কাজে সহায়তাকারী বিশেষ ধরনের প্রোটিন। আইএপি অন্ত্রের সুরক্ষাব্যবস্থা ঠিক রাখা এবং কিছু ব্যাকটেরিয়াজাত ক্ষতিকর উপাদান নিষ্ক্রিয় করার কাজে ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের গবেষকেরা আইএপির ঘাটতি এবং ভবিষ্যতে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন। গবেষণাটি অন্ত্র, ব্যাকটেরিয়া, প্রদাহ এবং ডায়াবেটিসের সম্ভাব্য সম্পর্ক বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ দেখিয়েছে।
তবে গবেষণায় দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেলেই একটি বিষয় অন্যটির সরাসরি কারণ প্রমাণিত হয় না। আইএপি কম থাকা এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি থাকার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিন্তু আইএপির ঘাটতিই প্রত্যেক মানুষের ডায়াবেটিসের একমাত্র কারণ, এমন সিদ্ধান্ত এখনো দেওয়া যায় না।
মলের নমুনা দিয়ে আইএপি পরীক্ষা বর্তমানে সাধারণ মানুষের ডায়াবেটিস শনাক্ত করার স্বীকৃত নিয়মিত পরীক্ষা নয়। আইএপি বড়ি বা সম্পূরক গ্রহণ, নির্দিষ্ট সবজি খাওয়া কিংবা অন্য কোনো উপায়ে আইএপি বাড়িয়ে মানুষের ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায়, এমন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা নির্দেশনাও এখনো নেই।
বর্তমান প্রমাণের সীমা
ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণ
রক্তে গ্লুকোজ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে। টাইপ ১ ডায়াবেটিসে এগুলো দ্রুত ও তীব্রভাবে শুরু হতে পারে। টাইপ ২ ডায়াবেটিসে লক্ষণ হালকা হতে পারে অথবা দীর্ঘদিন স্পষ্ট নাও হতে পারে।
১. স্বাভাবিকের তুলনায় ঘন ঘন বা বেশি পরিমাণে প্রস্রাব হওয়া
২. অস্বাভাবিক বেশি তৃষ্ণা লাগা
৩. চেষ্টা ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
৪. অস্বাভাবিক বেশি ক্ষুধা লাগা
৫. ক্লান্তি বা দুর্বলতা
৬. চোখে ঝাপসা দেখা
৭. ক্ষত শুকাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগা
৮. ত্বক, মাড়ি বা শরীরের অন্য স্থানে বারবার সংক্রমণ হওয়া
ঘন ঘন বা বেশি পরিমাণে প্রস্রাব হওয়ার চিকিৎসাবিষয়ক নাম পলিইউরিয়া। তবে শুধু রাতে তৃষ্ণা লাগা বা গলা শুকিয়ে যাওয়া ডায়াবেটিসের নির্দিষ্ট লক্ষণ নয়। গরম আবহাওয়া, শরীরে পানির ঘাটতি, মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া, কিছু ওষুধ এবং আরও অনেক কারণে এমন হতে পারে। লক্ষণটি নিয়মিত হলে অথবা অন্য লক্ষণের সঙ্গে দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কখন জরুরি চিকিৎসা দরকার?
জরুরি সংকেত
অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও প্রস্রাবের সঙ্গে বমি, পেটব্যথা, দ্রুত বা গভীর শ্বাস, শরীরে মারাত্মক পানিশূন্যতা, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, বিভ্রান্তি অথবা চেতনা কমে গেলে দ্রুত জরুরি বিভাগে যেতে হবে।
এগুলো ইনসুলিনের তীব্র ঘাটতিতে তৈরি হওয়া প্রাণঘাতী জটিলতা ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস অথবা রক্তে শর্করা বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে তৈরি হওয়া অন্য জরুরি অবস্থার লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, কিশোর এবং সম্ভাব্য টাইপ ১ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে বিলম্ব বিপজ্জনক।
কাদের ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা উচিত?
টাইপ ২ ডায়াবেটিস অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করা যথেষ্ট নয়। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো লক্ষণ না থাকলেও বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি বিবেচনা করে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ডায়াবেটিস পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
১. বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি হলে: অন্য কোনো ঝুঁকি না থাকলেও ডায়াবেটিস বা প্রিডায়াবেটিস শনাক্ত করার পরীক্ষা শুরু করা উচিত। ফল স্বাভাবিক হলে সাধারণত অন্তত তিন বছর পর আবার পরীক্ষা করা যেতে পারে। তবে ওজন বা অন্য ঝুঁকির পরিবর্তন হলে চিকিৎসক আরও আগে পরীক্ষা দিতে পারেন।
২. যেকোনো বয়সে অতিরিক্ত ওজন থাকলে: এশীয় বংশোদ্ভূত মানুষের দেহভর সূচক বা বিএমআই ২৩ কিলোগ্রাম প্রতি বর্গমিটার বা বেশি এবং নিচের অন্তত একটি ঝুঁকি থাকলে পরীক্ষা বিবেচনা করা উচিত।
• মা-বাবা, ভাই-বোন অথবা সন্তানের ডায়াবেটিস থাকা
• উচ্চ রক্তচাপ থাকা অথবা উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ গ্রহণ
• হৃদ্যন্ত্র বা রক্তনালির রোগের ইতিহাস
• রক্তে ভালো কোলেস্টেরল কম অথবা ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি থাকা
• পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম থাকা
• নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম না করা
• ঘাড় বা বগলের ত্বক অস্বাভাবিক কালো ও মোটা হওয়া, মারাত্মক স্থূলতা কিংবা বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত যকৃতে চর্বি জমার রোগ থাকা
৩. প্রিডায়াবেটিস থাকলে: সাধারণত অন্তত বছরে একবার ডায়াবেটিস তৈরি হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসক পরীক্ষার সময় পরিবর্তন করতে পারেন।
৪. আগে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলে: সন্তান জন্মের পর পরীক্ষা এবং পরবর্তী জীবনে প্রতি এক থেকে তিন বছরে ডায়াবেটিস পরীক্ষা প্রয়োজন।
৫. বিশেষ ওষুধ বা শারীরিক অবস্থা থাকলে: দীর্ঘদিন প্রদাহ কমানোর স্টেরয়েড ওষুধ, কিছু মানসিক রোগের ওষুধ কিংবা এইচআইভির ওষুধ গ্রহণ করলে এবং অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রক্তের গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের পরীক্ষার সাধারণ নির্দেশনা
শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের বয়সের নিয়ম ব্যবহার করা যায় না। বয়ঃসন্ধি শুরু হওয়ার পর অথবা ১০ বছর বয়স থেকে, যেটি আগে ঘটে, অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে বাড়তি ঝুঁকি থাকলে পরীক্ষা বিবেচনা করা যেতে পারে। সিদ্ধান্তটি শিশু বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে নিতে হবে।
গর্ভাবস্থায় কখন পরীক্ষা করা হয়?
গর্ভধারণের পরিকল্পনার সময় ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থাকা ব্যক্তির প্রিডায়াবেটিস বা আগে থেকে থাকা ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা প্রয়োজন হতে পারে। গর্ভধারণের আগে পরীক্ষা না হলে ঝুঁকি অনুযায়ী প্রথমবার গর্ভকালীন চিকিৎসা নিতে যাওয়ার সময় অথবা গর্ভাবস্থার ১৫ সপ্তাহের আগেও পরীক্ষা করা হতে পারে।
যাঁদের আগে ডায়াবেটিস বা উচ্চঝুঁকির অস্বাভাবিক গ্লুকোজ পাওয়া যায়নি, তাঁদের সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের পরীক্ষা করা হয়।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ধরা পড়লে সন্তান জন্মের ৪ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে মুখে নির্ধারিত গ্লুকোজ খাওয়ানোর পর রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে আবার মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এরপর সারা জীবনে প্রতি এক থেকে তিন বছরে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা উচিত।
ডায়াবেটিস নির্ণয়ের প্রধান পরীক্ষা
১. এইচবিএ১সি পরীক্ষা
এইচবিএ১সি বা HbA1c পরীক্ষা গত প্রায় দুই থেকে তিন মাসে রক্তে গ্লুকোজের গড় অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেয়। পরীক্ষাটির জন্য সাধারণত খালি পেটে থাকতে হয় না।
ডায়াবেটিসের নির্ধারিত সীমা: ৬.৫ শতাংশ বা বেশি।
প্রিডায়াবেটিসের সীমা: ৫.৭ থেকে ৬.৪ শতাংশ।
২. খালি পেটে রক্তরসের গ্লুকোজ পরীক্ষা
এই পরীক্ষার আগে অন্তত আট ঘণ্টা কোনো খাবার বা ক্যালরিযুক্ত পানীয় গ্রহণ করা যাবে না। পানি পান করা যায়। অনুমোদিত পরীক্ষাগারে রক্তের নমুনা নিয়ে গ্লুকোজের মাত্রা মাপা হয়।
ডায়াবেটিসের নির্ধারিত সীমা: ১২৬ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার বা ৭.০ মিলিমোল/লিটার এবং বেশি।
প্রিডায়াবেটিসের সীমা: ১০০ থেকে ১২৫ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার।
৩. মুখে গ্লুকোজ খাওয়ানোর পর পরীক্ষা
এই পরীক্ষার নাম ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট বা সংক্ষেপে OGTT। নির্ধারিত পরিমাণ গ্লুকোজ মেশানো পানীয় পান করার দুই ঘণ্টা পর রক্তের গ্লুকোজ মাপা হয়। পরীক্ষাটি চিকিৎসক বা অনুমোদিত পরীক্ষাগারের নির্দেশনা অনুযায়ী করতে হয়।
ডায়াবেটিসের নির্ধারিত সীমা: ২০০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার বা ১১.১ মিলিমোল/লিটার এবং বেশি।
প্রিডায়াবেটিসের সীমা: ১৪০ থেকে ১৯৯ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার।
৪. দিনের যেকোনো সময়ে রক্তরসের গ্লুকোজ পরীক্ষা
অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব কিংবা অকারণে ওজন কমার মতো পরিচিত লক্ষণের সঙ্গে দিনের যেকোনো সময়ে পরীক্ষাগারে রক্তরসের গ্লুকোজ ২০০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার বা ১১.১ মিলিমোল/লিটার এবং বেশি পাওয়া গেলে চিকিৎসক ডায়াবেটিস নির্ণয় করতে পারেন। কোনো লক্ষণ না থাকলে একবারের ফল দিয়েই সাধারণত চূড়ান্ত রোগনির্ণয় করা হয় না।
এইচবিএ১সি সব ক্ষেত্রে সমান নির্ভরযোগ্য নয়
গর্ভাবস্থা, রক্তস্বল্পতা, সাম্প্রতিক রক্তক্ষরণ বা রক্ত গ্রহণ, লোহিত রক্তকণিকার আয়ু পরিবর্তন, কিছু বংশগত হিমোগ্লোবিনের ভিন্নতা এবং কিডনির গুরুতর সমস্যার কারণে এইচবিএ১সির ফল প্রভাবিত হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে চিকিৎসক রক্তরসের গ্লুকোজভিত্তিক পরীক্ষা বেছে নিতে পারেন।
বাড়ির গ্লুকোমিটার কি রোগনির্ণয় করতে পারে?
বাড়ির গ্লুকোমিটার প্রতিদিন রক্তের গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণে উপকারী। তবে যন্ত্র, পরীক্ষার ফিতা, রক্তের নমুনা নেওয়ার পদ্ধতি, হাত পরিষ্কার না থাকা, তাপমাত্রা এবং ব্যবহারকারীর ভুল ফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
গ্লুকোমিটারে অস্বাভাবিক ফল পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। কিন্তু চূড়ান্ত রোগনির্ণয় সাধারণত হাসপাতাল, ক্লিনিক বা অনুমোদিত পরীক্ষাগারে মান যাচাই করা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা উচিত।
একটি অস্বাভাবিক ফল দেখে নিজের সিদ্ধান্তে ইনসুলিন বা অন্য ওষুধ শুরু, বন্ধ কিংবা মাত্রা পরিবর্তন করা নিরাপদ নয়। আবার ফল খুব বেশি এবং সঙ্গে গুরুতর লক্ষণ থাকলে নিয়মিত পরীক্ষার তারিখের অপেক্ষা করাও উচিত নয়।
প্রিডায়াবেটিস কী?
প্রিডায়াবেটিস হলো রক্তের গ্লুকোজ বা এইচবিএ১সি এমন একটি সীমায় থাকা, যা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কিন্তু ডায়াবেটিস নির্ণয়ের সীমায় পৌঁছায়নি। সহজ ভাষায় এটি ডায়াবেটিসের আগের একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা।
প্রিডায়াবেটিস থাকা মানেই প্রত্যেক মানুষের ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস হবে, এমন নয়। তবে তাঁদের টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
প্রিডায়াবেটিস ধরা পড়লে শুধু “চিনি বন্ধ করুন” ধরনের সাধারণ পরামর্শ যথেষ্ট নয়। ওজন, কোমরের মাপ, রক্তচাপ, রক্তের চর্বি, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম, ব্যবহৃত ওষুধ, পারিবারিক ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসক ও প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরিকল্পনা করা উচিত।
খাদ্য নিয়ে প্রচলিত কয়েকটি ভুল ধারণা
“চিনি ও সাদা ভাত দুটিই বিষ”
এটি চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক ভাষা নয়। খাবার বা পানীয়তে আলাদাভাবে যোগ করা অতিরিক্ত চিনি, চিনিযুক্ত কোমল পানীয়, খুব বড় পরিমাণে খাবার এবং আঁশ কম থাকা খাদ্যাভ্যাস বিপাকীয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কিছু জনগোষ্ঠীর গবেষণায় বেশি পরিমাণে সাদা ভাত খাওয়ার সঙ্গে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিন্তু খাবারের পরিমাণ, মোট খাদ্যাভ্যাস, শাকসবজি, ডাল, প্রোটিন, আঁশ ও শারীরিক কার্যক্রম বিবেচনা না করে ভাতকে বিষ বলা বিভ্রান্তিকর।
“সয়াবিন তেল সরাসরি ডায়াবেটিস সৃষ্টি করে”
সয়াবিন তেলকে ডায়াবেটিস বা প্রদাহের একক প্রধান কারণ বলার মতো চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক ঐকমত্য নেই। তেলের মোট পরিমাণ, রান্নার ধরন, একই তেল বারবার গরম করা, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় মোট ক্যালরি গ্রহণ আলাদা বিষয়। পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া কোনো একটি ভোজ্যতেলকে সব মানুষের জন্য বিষ বলা উচিত নয়।
“জিন পরিবর্তিত সব শস্য ডায়াবেটিসের কারণ”
জিনগতভাবে পরিবর্তিত সব খাবারকে একসঙ্গে প্রদাহ বা ডায়াবেটিসের কারণ ঘোষণা করার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। নির্দিষ্ট খাবার, পরিবর্তনের ধরন, পুষ্টিমান এবং নিরাপত্তা আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হয়। ভয় তৈরিকারী সাধারণ দাবি স্বাস্থ্যশিক্ষার বিকল্প নয়।
টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে কী করা যায়?
বর্তমানে জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে টাইপ ১ ডায়াবেটিস প্রতিরোধের কোনো প্রতিষ্ঠিত উপায় নেই। তবে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানো অথবা রোগের শুরু বিলম্বিত করার সুযোগ রয়েছে। ব্যক্তির বয়স, স্বাস্থ্য, আয়, দৈনন্দিন কাজ ও শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী পরিকল্পনা আলাদা হওয়া উচিত।
১. সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটা, শরীরচর্চা ও পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করা
২. নিয়মিত খাবারে শাকসবজি, ডাল, কম প্রক্রিয়াজাত পূর্ণ শস্য এবং উপযুক্ত প্রোটিন রাখা
৩. চিনিযুক্ত পানীয় ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করা
৪. প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সহায়তায় নিরাপদ ও বাস্তবসম্মতভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা
৫. তামাক ও ধূমপান এড়িয়ে চলা
৬. রক্তচাপ ও রক্তের চর্বি পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া
৭. পর্যাপ্ত ঘুম এবং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ সামলানোর স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থা রাখা
৮. প্রিডায়াবেটিস বা অন্য ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা করা
এসব পদক্ষেপ ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তির ডায়াবেটিস হলেই তিনি ব্যর্থ, অলস বা দায়িত্বহীন, এমন নয়। বংশগত বৈশিষ্ট্য, গর্ভাবস্থা, ব্যবহৃত ওষুধ, আয়, স্বাস্থ্যকর খাবার পাওয়ার সুযোগ, নিরাপদ ব্যায়ামের জায়গা, কর্মঘণ্টা এবং চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে।
ডায়াবেটিস শুধু বেশি চিনি খাওয়ার রোগ নয়। সব ধরনের ডায়াবেটিস একই শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায়ও তৈরি হয় না। টাইপ ১, টাইপ ২, গর্ভকালীন এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট ধরনের ডায়াবেটিসের কারণ ও চিকিৎসা আলাদা হতে পারে।
উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। আবার টাইপ ২ ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে বলে বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী পরীক্ষা করাও প্রয়োজন।
ভয়, সামাজিক অপবাদ কিংবা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা একক কারণের গল্প নয়; স্বীকৃত পরীক্ষাগারের সঠিক পরীক্ষা, ডায়াবেটিসের যথাযথ ধরন নির্ধারণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসাই নিরাপদ পথ।
মূল আলোচনার লেখক: সাদিক ইবনে আফতাব
মূল প্রকাশনা: দ্য ব্যাকস্পেস জার্নাল
মূল প্রকাশের তারিখ: ৮ অক্টোবর ২০২২
গবেষণা, চিকিৎসাবিষয়ক তথ্যযাচাই, পুনর্গঠন ও সম্পাদনা: অভিযাত্রী সম্পাদনা প্যানেল
বর্তমান সংস্করণের ধরন: গবেষণাভিত্তিক সম্পূর্ণ পুনর্গঠিত সংস্করণ
বর্তমান প্রকাশনা ও কপিরাইট: অভিযাত্রী
American Diabetes Association Professional Practice Committee for Diabetes. “Diagnosis and Classification of Diabetes: Standards of Care in Diabetes—2026.” Diabetes Care, vol. 49, supplement 1, 2026, pp. S27–S49. DOI: https://doi.org/10.2337/dc26-S00210.2337/dc26-S002.
American Diabetes Association Professional Practice Committee for Diabetes. “Prevention or Delay of Diabetes and Associated Comorbidities: Standards of Care in Diabetes—2026.” Diabetes Care, vol. 49, supplement 1, 2026, pp. S50–S60. DOI: https://doi.org/10.2337/dc26-S00310.2337/dc26-S003.
World Health Organization. “Diabetes.” Updated 14 November 2024. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডায়াবেটিস তথ্যপত্র. সংগ্রহের তারিখ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
International Diabetes Federation. “Diabetes in Bangladesh.” IDF Diabetes Atlas, 11th edition data. বাংলাদেশের ডায়াবেটিস তথ্য. সংগ্রহের তারিখ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
American Diabetes Association. “Understanding Latent Autoimmune Diabetes in Adults.” প্রাপ্তবয়স্কদের ধীরগতির অটোইমিউন ডায়াবেটিস নির্দেশিকা. সংগ্রহের তারিখ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
Tsalamandris, Sotirios, et al. “The Role of Inflammation in Diabetes: Current Concepts and Future Perspectives.” European Cardiology Review, vol. 14, no. 1, 2019, pp. 50–59. DOI: https://doi.org/10.15420/ecr.2018.33.110.15420/ecr.2018.33.1.
Böni-Schnetzler, Marianne, and Daniel T. Meier. “Islet Inflammation in Type 2 Diabetes.” Seminars in Immunopathology, vol. 41, 2019, pp. 501–513. DOI: https://doi.org/10.1007/s00281-019-00745-410.1007/s00281-019-00745-4.
Yu, Jiayue, et al. “White Rice, Brown Rice and the Risk of Type 2 Diabetes: A Systematic Review and Meta-analysis.” BMJ Open, vol. 12, 2022, article e065426. DOI: https://doi.org/10.1136/bmjopen-2022-06542610.1136/bmjopen-2022-065426.
Prothom Alo. “Bangladesh Scientists Make Remarkable Breakthrough in Diabetes Research.” 23 March 2022. মূল সংবাদ প্রতিবেদন. সংগ্রহের তারিখ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
The Business Standard. “Bangladeshi Scientists Discover a New Cause for Diabetes.” 23 March 2022. মূল সংবাদ প্রতিবেদন. সংগ্রহের তারিখ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
চূড়ান্ত কথা
লেখকত্ব, গবেষণা ও সম্পাদকীয় কৃতিত্ব
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0