সমুদ্রের নিচে ইন্টারনেটের মহাসড়ক: সাবমেরিন ক্যাবল কীভাবে বিশ্ব ও বাংলাদেশকে যুক্ত রাখে

সাবমেরিন ক্যাবল কীভাবে ডেটা বহন করে এবং বাংলাদেশের SEA-ME-WE-4, 5 ও 6-এর বর্তমান অবস্থা কী, জানুন বিস্তারিত।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ১
সমুদ্রের নিচে ইন্টারনেটের মহাসড়ক: সাবমেরিন ক্যাবল কীভাবে বিশ্ব ও বাংলাদেশকে যুক্ত রাখে
গভীর সমুদ্রের তলদেশে কাটা অংশ উন্মুক্ত একটি ফাইবার-অপটিক সাবমেরিন ক্যাবল থেকে নীল আলোকসংকেত প্রবাহিত হচ্ছে; দূরের সমুদ্রপৃষ্ঠে সূর্যাস্তের আলোয় একটি ক্যাবল স্থাপনকারী জাহাজ দেখা যাচ্ছে।

প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামো

সমুদ্রের নিচে ইন্টারনেটের মহাসড়ক

আমাদের ফোন ও কম্পিউটার তারহীনভাবে ইন্টারনেটে যুক্ত হলেও এক দেশ থেকে অন্য দেশে অধিকাংশ তথ্য পৌঁছায় সমুদ্রের গভীরে বিছানো আলোকতন্তু যোগাযোগ ক্যাবলের মধ্য দিয়ে। আধুনিক পৃথিবীর এই প্রায় অদৃশ্য অবকাঠামোই আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

Wi-Fi যদি তারহীন হয়, তাহলে সমুদ্রের নিচে ক্যাবল কেন?

বাসা, অফিস কিংবা শ্রেণিকক্ষে আমরা সাধারণত Wi-Fi, মোবাইল নেটওয়ার্ক বা রাউটারের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করি। ফলে মনে হতে পারে, ইন্টারনেট বুঝি পুরোপুরি তারহীন। বাস্তবে আমাদের যন্ত্র থেকে তথ্য প্রথমে স্থানীয় মোবাইল বা ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কে যায়। এরপর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক অতিক্রম করে দূরের সার্ভার, ক্লাউড সেবা বা তথ্যকেন্দ্রে পৌঁছায়।

International Telecommunication Union বা ITU-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রতলের টেলিযোগাযোগ ক্যাবল আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট যোগাযোগের ৯৯ শতাংশের বেশি বহন করে। অর্থাৎ আমাদের ব্যবহার করা ইন্টারনেটের আন্তর্জাতিক অংশটি প্রধানত মহাকাশ দিয়ে নয়, সমুদ্রের নিচ দিয়ে যাতায়াত করে।

সাবমেরিন কমিউনিকেশন ক্যাবল কী?

সাবমেরিন কমিউনিকেশন ক্যাবল হলো সমুদ্র, সাগর বা অন্য বৃহৎ জলাধারের তলদেশে স্থাপিত বিশেষ যোগাযোগ ক্যাবল। আধুনিক ক্যাবলের কেন্দ্রীয় অংশে থাকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম আলোকতন্তু বা অপটিক্যাল ফাইবার। এই তন্তুর মধ্য দিয়ে আলোকসংকেত ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল তথ্য দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো হয়।

সমুদ্রের নিচে থাকা সব ক্যাবল অবশ্য ইন্টারনেট ক্যাবল নয়। বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্যও সমুদ্রতলের বিদ্যুৎ ক্যাবল ব্যবহৃত হয়। ইন্টারনেট, টেলিফোন, ক্লাউড সেবা ও আন্তর্জাতিক তথ্য পরিবহনের ক্যাবলকে ইংরেজিতে submarine telecommunications cable বলা হয়।

একটি আধুনিক ক্যাবলের ভেতরে কী থাকে?

ক্যাবলের নকশা ও সুরক্ষার স্তর অবস্থানভেদে পরিবর্তিত হয়। সাধারণভাবে এর মধ্যে থাকে:

১. তথ্য বহনকারী এক বা একাধিক অপটিক্যাল ফাইবার জোড়া।
২. ফাইবারকে ঘিরে জলরোধী ও চাপ সহনশীল সুরক্ষা স্তর।
৩. দীর্ঘ পথে সংকেত-পরিবর্ধককে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য ধাতব পরিবাহী।
৪. ক্ষয়, পানি প্রবেশ ও যান্ত্রিক আঘাত ঠেকানোর জন্য বাইরের আবরণ।
৫. উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ অংশে নোঙর ও মাছ ধরার সরঞ্জাম থেকে রক্ষার জন্য অতিরিক্ত ইস্পাতের সুরক্ষা স্তর।

International Cable Protection Committee বা ICPC-এর উপস্থাপিত কারিগরি তথ্য অনুযায়ী, গভীর সমুদ্রের সুরক্ষা-বর্মহীন টেলিযোগাযোগ ক্যাবল প্রায় ১৭ মিলিমিটার ব্যাসের হতে পারে। উপকূলের কাছে অতিরিক্ত সুরক্ষা যোগ হলে ব্যাস প্রায় ৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ সমুদ্রজুড়ে বিস্তৃত এত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অনেক স্থানে দেখতে সাধারণ পানির পাইপের চেয়েও সরু।

ফাইবারের ভেতর তথ্য চলে কীভাবে?

মোবাইল ফোন, কম্পিউটার বা অন্য ডিজিটাল যন্ত্রের তথ্য শেষ পর্যন্ত সংকেতে রূপান্তরিত হয়। ফাইবার-অপটিক ব্যবস্থায় লেজার বা আলোর স্পন্দনের মাধ্যমে সেই তথ্য পাঠানো হয়। একই ফাইবারে আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য ব্যবহার করে একসঙ্গে একাধিক তথ্যপ্রবাহ বহন করা সম্ভব। এই পদ্ধতিকে Wavelength Division Multiplexing বলা হয়। সহজভাবে বললে, একই আলোকপথে ভিন্ন ভিন্ন রঙের বহু সংকেত পাশাপাশি চলতে পারে।

একটি দূরপাল্লার ক্যাবলকে সমুদ্রের নিচের দীর্ঘ আলোকপথের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আলো বহু দূর যাওয়ার সময় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়। তাই মহাসাগর পাড়ি দেওয়া ক্যাবলে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর সমুদ্রতলে সংকেত-পরিবর্ধক বসানো হয়। এগুলো আলোকসংকেতকে শক্তিশালী করে পরবর্তী অংশে পাঠায়। ক্যাবলের ভেতরের ধাতব পরিবাহীর মাধ্যমে এসব যন্ত্রে বিদ্যুৎ পৌঁছানো হয়।

সমুদ্রের তলদেশে ক্যাবল কীভাবে স্থাপন করা হয়?

ক্যাবল স্থাপনের আগে সম্ভাব্য পথের সমুদ্রতল জরিপ করা হয়। পানির গভীরতা, সমুদ্রতলের ভূপ্রকৃতি, ভূমিকম্প ও ভূমিধসের ঝুঁকি, মাছ ধরার এলাকা, জাহাজ চলাচলের পথ, পরিবেশগত প্রভাব এবং আগে থেকে থাকা অন্যান্য অবকাঠামোর অবস্থান বিশ্লেষণ করে উপযুক্ত পথ নির্ধারণ করা হয়।

এরপর বিশেষায়িত ক্যাবল স্থাপনকারী জাহাজ পরিকল্পিত পথ ধরে ধীরে ধীরে ক্যাবল নামায়। গভীর সমুদ্রে ক্যাবল অনেক ক্ষেত্রে সমুদ্রতলের ওপরেই থাকে। অগভীর ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ লাঙলসদৃশ যন্ত্র, খননযন্ত্র বা দূরনিয়ন্ত্রিত ডুবোযান ব্যবহার করে ক্যাবলকে তলদেশের নিচে পুঁতে রাখা হতে পারে। ICPC-এর কারিগরি নির্দেশনায় ক্যাবলের পথ নির্বাচন, স্থাপন, পার্শ্ববর্তী অবকাঠামো থেকে নিরাপদ দূরত্ব, সুরক্ষা ও মেরামতকে পৃথক পরিকল্পনার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ডুবুরিরা কি পুরো ক্যাবল বিছিয়ে দেন?

না। গভীর সমুদ্রে মানুষ ডুব দিয়ে হাজার কিলোমিটার ক্যাবল স্থাপন করেন না। ডুবুরিরা মূলত অগভীর উপকূলীয় অংশ, তীরসংলগ্ন স্থাপন, পরিদর্শন বা বিশেষ সহায়ক কাজে অংশ নিতে পারেন। গভীর সমুদ্রের কাজ বিশেষায়িত জাহাজ, ক্যাবল স্থাপনকারী যন্ত্র, উদ্ধারকারী হুক এবং দূরনিয়ন্ত্রিত ডুবোযানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

১৮৫০ থেকে ফাইবার-অপটিক যুগ

আধুনিক ফাইবার-অপটিক ক্যাবল আসার অনেক আগে সমুদ্রের নিচ দিয়ে টেলিগ্রাফ সংকেত পাঠানোর চেষ্টা শুরু হয়েছিল। ১৮৫০ সালে ইংল্যান্ডের Dover এবং ফ্রান্সের Calais-এর মধ্যে একটি পরীক্ষামূলক ক্যাবল স্থাপন করা হয়। সেটি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ব্যর্থ হয়। পরের বছর অধিক শক্তিশালী ও সুরক্ষিত আরেকটি ক্যাবল সফলভাবে স্থাপন করা হয়।

Science Museum Group-এর সংরক্ষিত নমুনা ও বর্ণনা অনুযায়ী, দ্বিতীয় Dover–Calais ক্যাবলটি ১৮৫১ সালে স্থাপিত হয় এবং ১৩ নভেম্বর সেটি দিয়ে প্রথম বার্তা পাঠানো হয়। প্রয়োজনীয় ছোটখাটো মেরামতসহ এটি ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছিল। তাই দ্বিতীয় প্রচেষ্টার সাল ১৯৫৩ নয়, ১৮৫১।

১৮৫৮: প্রথম অতলান্তিক টেলিগ্রাফ ক্যাবল চালু হলেও অল্প সময়ের মধ্যে ব্যর্থ হয়।
১৮৬৬: টেকসই অতলান্তিক টেলিগ্রাফ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৫৬: TAT-1 প্রথম অতলান্তিক টেলিফোন ক্যাবল হিসেবে চালু হয়।
১৯৮৮: TAT-8 প্রথম অতলান্তিক ফাইবার-অপটিক ক্যাবল হিসেবে আধুনিক উচ্চক্ষমতার যোগাযোগ যুগের সূচনা করে।

সাবমেরিন ক্যাবল ও স্যাটেলাইট কি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী?

এ দুটিকে সরলভাবে পরস্পরের বিকল্প বলা ঠিক নয়। আন্তর্জাতিক উচ্চক্ষমতার তথ্য পরিবহনে সাবমেরিন ক্যাবল প্রধান মাধ্যম। অন্যদিকে স্যাটেলাইট দুর্গম অঞ্চল, সমুদ্রগামী জাহাজ, বিমান, দুর্যোগকালীন যোগাযোগ এবং যেখানে স্থল বা সমুদ্রতলের সংযোগ সহজে পৌঁছায় না, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিপুল তথ্য ধারণক্ষমতা ও তুলনামূলক কম বিলম্বের কারণে মহাদেশগুলোর মধ্যে নিয়মিত ইন্টারনেট যোগাযোগে ফাইবার-অপটিক ক্যাবল বেশি কার্যকর। একটি স্থিতিস্থাপক যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমুদ্রতলের ক্যাবল, স্থলপথের সংযোগ ও স্যাটেলাইট পরস্পরকে সম্পূরক সহায়তা দিতে পারে।

ক্যাবল কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়?

সাবমেরিন ক্যাবল গভীর সমুদ্রে তুলনামূলক সুরক্ষিত থাকলেও অক্ষত থাকার নিশ্চয়তা নেই। জাহাজের নোঙর, মাছ ধরার ভারী সরঞ্জাম ও অন্যান্য সামুদ্রিক কার্যক্রম বড় ঝুঁকি। ভূমিকম্প, সমুদ্রতলের ভূমিধস, সুনামি ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতও একসঙ্গে একাধিক ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

নোঙরের ক্ষতি কতটা গুরুতর?

ICPC-এর ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, টেনে নেওয়া জাহাজের নোঙর প্রতিবছর সাবমেরিন ক্যাবল ক্ষতির প্রায় ৩০ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। এর অর্থ বছরে আনুমানিক ৬০টি ত্রুটি। একটি নোঙর পাশাপাশি থাকা একাধিক ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত করলে বিকল্প যোগাযোগপথও একই সময়ে বিঘ্নিত হতে পারে।

ত্রুটির সম্ভাব্য অবস্থান নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। বিশেষায়িত মেরামতকারী জাহাজ ঘটনাস্থলে গিয়ে ক্যাবলের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ উদ্ধার করে। জাহাজের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ফাইবার জোড়া লাগানো, পরীক্ষা ও পুনর্সংযোগের পর ক্যাবল আবার সমুদ্রে নামানো হয়। আবহাওয়া, পানির গভীরতা, অনুমতি, অতিরিক্ত ক্যাবল, মেরামতকারী জাহাজের প্রাপ্যতা এবং ঘটনাস্থলের দূরত্ব অনুযায়ী মেরামতের সময় পরিবর্তিত হতে পারে।

SEA-ME-WE নামটির অর্থ কী?

SEA-ME-WE হলো South East Asia–Middle East–Western Europe-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এই পরিবারের ক্যাবল ব্যবস্থা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে যোগাযোগের পথ তৈরি করেছে।

এ ধরনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সাধারণত একটি দেশের একক মালিকানায় থাকে না। বিভিন্ন টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ও পরিচালনাকারী সংস্থা consortium বা যৌথ অংশীদারত্ব গঠন করে নির্মাণ, সক্ষমতা, অবতরণকেন্দ্র ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়। তাই পুরো ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং সদস্য হিসেবে কোনো একটি দেশের প্রাপ্য সক্ষমতা একই বিষয় নয়।

Capacity বলতে সব সময় একই বিষয় বোঝায় না

নকশাগত সক্ষমতা: প্রযুক্তিগত নকশায় সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সক্ষমতা।
অংশীদারি সক্ষমতা: consortium member বা অংশীদার হিসেবে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য অংশ।
সক্রিয় সক্ষমতা: প্রয়োজনীয় আলোকীয় যন্ত্রপাতি সক্রিয় করে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত সক্ষমতা।
সরবরাহ করা bandwidth: গ্রাহকদের কাছে বাস্তবে সরবরাহ করা সক্ষমতা।
বাস্তব তথ্যপ্রবাহ: নির্দিষ্ট সময়ে নেটওয়ার্ক দিয়ে বাস্তবে প্রবাহিত তথ্য।

বাংলাদেশের প্রথম সাবমেরিন ক্যাবল: SEA-ME-WE-4

বাংলাদেশ ২০০৬ সালের ২১ মে SEA-ME-WE-4-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়। এর অবতরণকেন্দ্র কক্সবাজারে। বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি ২০২৬ সালের ২১ মে সংযোগটির ২০ বছর পূর্তি পালন করেছে।

এই সংযোগ দেশের আন্তর্জাতিক bandwidth capacity বৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট সেবা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু একটি ক্যাবলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে সেই পথে বড় ত্রুটি দেখা দেওয়ার সময় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

BSCPLC-এর প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস অনুসারে, SEA-ME-WE-4-এর পরিকল্পিত আয়ুষ্কাল ২০৩০ সালে শেষ হওয়ার কথা। তবে পরিকল্পিত আয়ুষ্কাল, বর্তমান ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সম্ভাবনা আলাদা বিষয়।

দ্বিতীয় সংযোগ: SEA-ME-WE-5

বাংলাদেশ কুয়াকাটা অবতরণকেন্দ্রের মাধ্যমে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল SEA-ME-WE-5-এ যুক্ত হয়। বাংলাদেশে এর বাণিজ্যিক সেবা ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়।

SEA-ME-WE-5 Consortium-এর তথ্য অনুযায়ী, পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাটি প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এর প্রাথমিক নকশাগত সক্ষমতা ছিল ২৪ টেরাবিট প্রতি সেকেন্ড বা ২৪ Tbps। পরবর্তী প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ব্যবস্থাটির সক্ষমতা আরও বেড়েছে।

২৪ Tbps কি পুরোটা বাংলাদেশের?

না। এটি পুরো আন্তর্জাতিক SEA-ME-WE-5 ব্যবস্থার প্রাথমিক নকশাগত সক্ষমতা। Consortium-এর প্রতিটি সদস্যের নিজস্ব প্রাপ্য সক্ষমতা থাকে। পুরো ব্যবস্থার সক্ষমতাকে বাংলাদেশের প্রাপ্ত বা ব্যবহৃত bandwidth হিসেবে উপস্থাপন করা ভুল।

দ্বিতীয় ক্যাবল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগপথের বৈচিত্র্য বাড়িয়েছে। প্রথম ক্যাবলে সমস্যা হলে অন্য ক্যাবল ও স্থলপথ দিয়ে কিছু তথ্যপ্রবাহ পুনর্নির্দেশের সুযোগ তৈরি হয়। তবে দুটি ক্যাবল থাকলেই নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট নিশ্চিত হয় না। অবতরণকেন্দ্র, স্থলভাগের সংযোগ, রাউটিং, বিদ্যুৎ, জাতীয় সঞ্চালনব্যবস্থা বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে ত্রুটি হলেও সেবা ব্যাহত হতে পারে।

তৃতীয় ক্যাবল SEA-ME-WE-6: বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশের তৃতীয় রাষ্ট্রীয় সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্প SEA-ME-WE-6 consortium-এর অংশ। পুরোনো পরিকল্পনায় প্রকল্পটি ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্পের সময়, ব্যয় ও বাস্তবায়নসূচি পরে সংশোধিত হয়েছে।

BSCPLC-এর সরকারি প্রকল্পপাতা অনুযায়ী, দ্বিতীয় সংশোধিত প্রকল্পের মেয়াদ জানুয়ারি ২০২১ থেকে জুন ২০২৭। প্রাক্কলিত ব্যয় ১,২৮৫.৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৪৭৬.২২ কোটি এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৮০৯.৫৩ কোটি টাকা।

একই সরকারি পাতায় বাংলাদেশ শাখার ক্যাবল স্থাপনের কাজ শতভাগ এবং পুরো SEA-ME-WE-6 ব্যবস্থার প্রায় ৬২ শতাংশ স্থাপন সম্পন্ন হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কক্সবাজার থেকে Singapore এবং Mumbai বা France প্রান্তে বাংলাদেশের প্রায় ৩০,০০০ Gbps সক্ষমতা পাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিকে সেবা শুরুর প্রত্যাশাও উল্লেখ করা হয়েছে।

যাচাই-অবস্থা: প্রকল্প চলমান

[Partially Verified] জুন ২০২৭ হলো সংশোধিত প্রকল্পের মেয়াদ। তবে প্রকল্পের মেয়াদ, ক্যাবল স্থাপন, পরীক্ষা, commissioning, পরীক্ষামূলক তথ্যপ্রবাহ, বাণিজ্যিক সেবা এবং পূর্ণ সক্ষমতা সক্রিয় হওয়া এক status নয়।

কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশিত সময়কে বাস্তব সেবা চালুর তারিখ হিসেবে ধরা যাবে না। বাণিজ্যিক সেবা শুরু হওয়ার পর চালুর তারিখ ও সক্রিয় সক্ষমতা আবার সরকারি উৎস থেকে যাচাই করতে হবে।

বেশি ক্যাবল মানেই কি বেশি ইন্টারনেট গতি?

একটি দেশে বেশি submarine cable এবং ভৌগোলিকভাবে পৃথক যোগাযোগপথ থাকলে আন্তর্জাতিক bandwidth capacity, বিকল্প পথ ও নেটওয়ার্কের স্থিতিস্থাপকতা বাড়তে পারে। কিন্তু ক্যাবলের সংখ্যা বাড়লেই প্রত্যেক ব্যবহারকারীর মোবাইল বা ব্রডব্যান্ডের গতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায় না।

বাস্তব ইন্টারনেট গতি নির্ভর করে data package, ISP-এর সক্ষমতা, mobile tower বা fixed broadband network, স্থানীয় চাপ, Wi-Fi router, ব্যবহৃত যন্ত্র, জাতীয় সঞ্চালনব্যবস্থা, স্থানীয় traffic exchange, content server-এর অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগপথের ওপর।

APNIC-এর ২০২৫ সালের বাংলাদেশবিষয়ক বিশ্লেষণে নগরকেন্দ্রের বাইরে fibre সম্প্রসারণ, গ্রামীণ এলাকার শেষ প্রান্তের সংযোগ এবং সীমিত স্থানীয় traffic exchange-কে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে সমুদ্রের নিচে সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের ভেতরের network infrastructure উন্নয়নও জরুরি।

ভালো ইন্টারনেটের জন্য একসঙ্গে যা প্রয়োজন

১. একাধিক আন্তর্জাতিক সমুদ্র ও স্থলপথ।
২. যথেষ্ট আন্তর্জাতিক সক্ষমতা এবং বাস্তব চাহিদাভিত্তিক সক্রিয়করণ।
৩. শক্তিশালী জাতীয় সঞ্চালনব্যবস্থা ও আঞ্চলিক আলোকতন্তু নেটওয়ার্ক।
৪. কার্যকর স্থানীয় traffic exchange ও স্থানীয় content infrastructure।
৫. উন্নত mobile ও fixed-broadband last-mile connection।
৬. নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, routing security এবং দক্ষ network management।

স্থলপথের bandwidth কি শুধু নির্ভরতা?

বাংলাদেশ submarine cable-এর পাশাপাশি International Terrestrial Cable বা ITC পরিচালনাকারীদের মাধ্যমে স্থলপথেও আন্তর্জাতিক bandwidth গ্রহণ করে। কোনো একটি বিদেশি পথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু স্থলপথের সংযোগ নিজে থেকে নেতিবাচক নয়।

একাধিক submarine route, পৃথক অবতরণকেন্দ্র এবং ভৌগোলিকভাবে বিচিত্র স্থলপথ একসঙ্গে থাকলে স্থিতিস্থাপকতা বাড়ে। প্রয়োজন কোনো একটি পথ পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়; বরং একটি পথে সমস্যা হলে অন্য পথে তথ্যপ্রবাহ নেওয়ার মতো বৈচিত্র্য তৈরি করা।

সাবমেরিন ক্যাবল কি তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে?

ফাইবার-অপটিক ক্যাবল উচ্চ সক্ষমতা, কম বিলম্ব ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ দেয়। কিন্তু ক্যাবল দিয়ে তথ্য পাঠানো মানেই সেই তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পূর্ণ নিরাপদ, এমন নয়।

যোগাযোগের গোপনীয়তা নির্ভর করে encryption, authentication, network security, routing protection এবং সংশ্লিষ্ট সেবার নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর। অন্যদিকে cable security বলতে ক্যাবলের পথ, অবতরণকেন্দ্র, বিদ্যুৎব্যবস্থা ও অন্যান্য বাস্তব অবকাঠামোকে ক্ষতি বা অননুমোদিত প্রবেশ থেকে রক্ষা করাও বোঝায়।

বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি ও বেসরকারি উদ্যোগ

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় submarine cable প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান নাম বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি বা BSCPLC। পূর্বে এটি বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড বা BSCCL নামে পরিচিত ছিল। প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রীয় submarine cable ব্যবস্থা পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক bandwidth সরবরাহে কাজ করে।

২০২২ সালে Summit Communications, CdNet Communications ও Metacore Subcom-কে submarine cable ব্যবস্থা স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের licence দেওয়া হয়। তবে licence পাওয়া, cable স্থাপন, commissioning এবং commercial operation আলাদা status। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের প্রথম বড় private submarine cable initiative প্রয়োজনীয় regulatory clearance-এর অভাবে স্থাপন পর্যায়ে বিলম্বিত ছিল।

তাই BSCPLC-কে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও বর্তমানে কার্যকর প্রধান submarine cable operator বলা যায়। কিন্তু বেসরকারি licence দেওয়া হয়েছে বলেই প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে কার্যকর cable service দিচ্ছে, এমন দাবি করা যাবে না।

ডিজিটাল অর্থনীতিতে ক্যাবলের ভূমিকা

আন্তর্জাতিক bandwidth software export, freelancing, cloud computing, outsourcing, e-commerce, digital payment, online education এবং দূরবর্তী কাজের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর একটি অংশ। কিন্তু কোনো দেশের তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানি বৃদ্ধির সম্পূর্ণ কৃতিত্ব শুধু submarine cable-কে দেওয়া যায় না।

দক্ষ জনবল, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা, অর্থ গ্রহণের বৈধ পথ, বিদ্যুৎ, স্থানীয় network quality, ব্যবসায়িক সক্ষমতা, নীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। তাই নির্ভরযোগ্য উপাত্ত ছাড়া “কয়েক হাজার বিলিয়ন ডলার” ধরনের অঙ্ক ব্যবহার করা গুরুতর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। একটি ক্যাবল সম্ভাবনার পথ তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক ফলাফলে রূপ দিতে আরও অনেক অবকাঠামো ও মানবিক সক্ষমতা প্রয়োজন।

শেষ কথা

ইন্টারনেটকে আমরা প্রায়ই অদৃশ্য বা পুরোপুরি তারহীন প্রযুক্তি বলে ভাবি। বাস্তবে আমাদের বার্তা, ভিডিও কল, cloud file, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক যোগাযোগের বড় অংশ সমুদ্রের গভীরে স্থাপিত দীর্ঘ ফাইবার-অপটিক পথ দিয়ে বহন করা হয়।

বাংলাদেশের জন্য নতুন submarine cable শুধু বেশি bandwidth পাওয়ার প্রকল্প নয়। প্রকৃত সুফল পেতে route diversity, landing-station security, national backbone, local peering, rural last mile এবং দক্ষ network management একসঙ্গে উন্নত করতে হবে। সমুদ্রের নিচে নতুন পথ তৈরি করাই শেষ কথা নয়; সেই পথের সুবিধা দেশের সব অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছানোই বড় পরীক্ষা।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

১. International Telecommunication Union. ১৭ জুন ২০২৬। “Submarine Cable Resilience.” Submarine Cable Resilience

২. International Hydrographic Organization ও International Cable Protection Committee. ২০২৩। “ICPC Activities Affecting HSSC.” ICPC Activities Affecting HSSC

৩. International Cable Protection Committee. ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ হালনাগাদ। “ICPC Recommendations.” ICPC Recommendations

৪. Science Museum Group. “Specimen of Dover-Calais Telegraph Cable, 1851.” Specimen of Dover-Calais Telegraph Cable, 1851

৫. International Cable Protection Committee. ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। “Damage to Submarine Cables from Dragged Anchors.” Damage to Submarine Cables from Dragged Anchors

৬. বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি। ২৪ মে ২০২৬ হালনাগাদ। “প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস।” বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসির প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস

৭. SEA-ME-WE 5 Consortium. “About the SEA-ME-WE 5 Submarine Cable.” About the SEA-ME-WE 5 Submarine Cable

৮. বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি। ৪ নভেম্বর ২০২৫ হালনাগাদ। “বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন, ২য় সংশোধিত।” SEA-ME-WE-6 প্রকল্পের সরকারি তথ্য

৯. APNIC Blog. ২৬ মার্চ ২০২৫। “Bridging Connectivity and Collaboration Gaps in Bangladesh.” Bridging Connectivity and Collaboration Gaps in Bangladesh

১০. The Daily Star. ৩০ আগস্ট ২০২২। “3 Private Firms Get Nod to Lay, Run Undersea Cables.” 3 Private Firms Get Nod to Lay, Run Undersea Cables

১১. The Financial Express. ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬। “Bangladesh to Open Submarine Cable Market to Private Investors.” Bangladesh to Open Submarine Cable Market to Private Investors

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
আব্দুস সবুর (লোটাস) আমি আব্দুস সবুর, লেখালেখিতে লোটাস নামে পরিচিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছি। অর্থনীতি, শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, ক্রীড়া ও সম্পাদকীয় বিষয়ে লেখালেখির অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। অভিযাত্রীর সহ-সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে আমি লেখা পর্যালোচনা, সম্পাদকীয় সমন্বয় এবং প্রকাশনার মাননিয়ন্ত্রণে যুক্ত আছি।