নোরা একাই কি পুতুল? A Doll’s House নাটকে টরভাল্ড হেলমারের চরিত্র বিশ্লেষণ
নোরা একাই কি পুতুল, নাকি টরভাল্ডও সামাজিক মর্যাদা ও পুরুষতান্ত্রিক ভূমিকায় বন্দী? ইবসেনের নাটকে টরভাল্ডকে নতুনভাবে পাঠ।
ইংরেজি সাহিত্য
নোরা একাই কি পুতুল? A Doll’s House নাটকে টরভাল্ড হেলমারের চরিত্র বিশ্লেষণ
সংসারের দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রক টরভাল্ড হেলমার কি সত্যিই স্বাধীন? নাকি সামাজিক মর্যাদা, পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্ব এবং আদর্শ দাম্পত্যের অভিনয় তাঁকেও অদৃশ্য পুতুলে পরিণত করেছে?
প্রকাশনা ও সম্পাদকীয় নোট
লেখাটি Nusrat Jahan Nowrin Neela-র নামে ১ অক্টোবর ২০২২ দ্য ব্যাকস্পেস জার্নালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।
বর্তমান সংস্করণটি লেখিকার মূল প্রশ্ন, আবেগ, দৃষ্টিভঙ্গি ও বৌদ্ধিক মালিকানা সংরক্ষণ করে অভিযাত্রী সম্পাদনা প্যানেলের গবেষণা, তথ্য যাচাই ও গভীর সম্পাদনায় প্রস্তুত হালনাগাদ পুনঃপ্রকাশ।
হেনরিক ইবসেনের A Doll’s House নামটি শুনলে সবার আগে কী মনে পড়ে? এমন একটি বাড়ি, যেখানে সবই পুতুল? মানুষের সংসারের মতোই সাজানো পুতুলের একটি সংসার?
কিন্তু একটু ভেবে দেখলে প্রশ্নটি শুধু নাটকের ঘরের মধ্যে আটকে থাকে না। আজও মানুষ মানুষ হিসেবে বাঁচে কম, অন্যের ইচ্ছা ও প্রত্যাশার পুতুল হয়ে বাঁচে বেশি। সন্তান কখনো মা-বাবার স্বপ্নের পুতুল হয়, প্রেমিক-প্রেমিকা একে অপরের চাহিদামতো নিজেকে সাজায়, স্বামী স্ত্রীর ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়, আবার কখনো স্ত্রীও স্বামীকে একটি নির্দিষ্ট ভূমিকায় আটকে রাখতে চায়।
বাইরে থেকে সবই স্বাভাবিক মনে হয়। ঘর আছে, সাজসজ্জা আছে, হাসি আছে, ভালোবাসার ভাষাও আছে। অথচ সেই সুন্দর ঘরের ভেতর মানুষগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের আসল মুখ হারিয়ে ফেলে। হেলমার পরিবারের সংসারও ঠিক এমন একটি ঘর। সুন্দর, পরিপাটি, আরামদায়ক, কিন্তু কারও না কারও অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা।
কেন্দ্রীয় প্রশ্ন
কিন্তু এই পুতুলের বাড়িতে শুধু নোরাই কি পুতুল? নাকি নিজেকে সংসারের নিয়ন্ত্রক মনে করা টরভাল্ড হেলমারও অন্য এক অদৃশ্য শক্তির হাতে পরিচালিত?
টরভাল্ডের নোরা: একজন মানুষ, না আদুরে খেলনা?
নাটকের শুরু থেকেই টরভাল্ড নোরাকে সমান মর্যাদার একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হিসেবে দেখেন না। তিনি নোরাকে ছোট পাখি, কাঠবিড়ালি কিংবা অপচয়ী ছোট্ট মানুষ হিসেবে আদর করে ডাকেন। ওপর থেকে এই সম্বোধনগুলো ভালোবাসায় পূর্ণ মনে হয়। কিন্তু সেই ভালোবাসার গভীরে তাকালে দেখা যায়, টরভাল্ড নোরাকে একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে নয়, সুন্দর, দুর্বল, আনন্দদায়ক এবং তাঁর ওপর নির্ভরশীল একটি সত্তা হিসেবে দেখতে ভালোবাসেন।
তিনি নোরার খরচ নিয়ে অভিভাবকের মতো কথা বলেন। কী খাবে, কত টাকা ব্যয় করবে, ঋণ সম্পর্কে কী ভাববে, এমনকি কোন আচরণটি তার জন্য শোভন, সেসবও তিনি ঠিক করে দিতে চান। তাঁর ভাষায় স্নেহ আছে, কিন্তু সমতা নেই; আদর আছে, কিন্তু সেই আদরের ভেতরেই ছোট করে দেখার প্রবণতাও আছে।
টরভাল্ড নোরার এমন একটি সংস্করণকে ভালোবাসেন, যে হাসিখুশি, সুন্দর, অনুগত, কিছুটা বোকা এবং তাঁর কাছে সাহায্যপ্রার্থী। নোরা যে গোপনে কঠোর পরিশ্রম করতে পারে, আর্থিক দায়িত্ব নিতে পারে, ঝুঁকি নিতে পারে কিংবা নৈতিক সিদ্ধান্তে তাঁর সঙ্গে দ্বিমত করতে পারে, এমন নোরাকে তিনি চিনতেই শেখেননি।
নাটকের শুরুতে নোরা গোপনে ম্যাকারুন, অর্থাৎ একধরনের ছোট মিষ্টান্ন, খায় এবং টরভাল্ডের কাছে তা লুকায়। ঘটনাটি খুব ছোট। কিন্তু একটি প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে যদি সামান্য মিষ্টিও স্বামীর চোখ এড়িয়ে খেতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: এই সম্পর্ক কি শুধু ভালোবাসার, নাকি অভিভাবক ও শিশুর সম্পর্কের মতো?
ভালোবাসার নির্মম পরিহাস
নোরাকে ছোট করে, তার স্বাধীনতা সীমিত করে এবং তার সক্ষমতাকে অস্বীকার করেও টরভাল্ড নিজেকে ভালোবাসার স্বামী বলে ভাবেন। এখানেই তাঁর ভালোবাসার সবচেয়ে নির্মম পরিহাস।
ঋণ, স্বাক্ষর এবং নোরার গোপন জীবন
বাইরে থেকে নোরাকে যতটা সরল ও নির্ভরশীল মনে হয়, তার গোপন জীবন ততটাই জটিল। টরভাল্ড অসুস্থ হওয়ার পর তাকে ইতালিতে নিয়ে চিকিৎসা করানোর জন্য নোরা গোপনে অর্থ ধার করেছিল। সে শুধু ঋণই নেয়নি, ঋণের নথিতে বাবার স্বাক্ষর ব্যবহার করেছিল। কিন্তু নথির তারিখ এমন ছিল, যা প্রকাশ করে দেয় যে বাবার মৃত্যুর পরে স্বাক্ষরটি বসানো হয়েছে।
নোরার উদ্দেশ্য ছিল স্বামীর জীবন রক্ষা করা। কিন্তু তার ব্যবহৃত উপায় আইনগতভাবে সমস্যামুক্ত ছিল না। এই জায়গায় নাটকটি সহজ নৈতিক সিদ্ধান্ত দেয় না। আইন বলে, নথিতে অন্যের স্বাক্ষর ব্যবহার করা অপরাধ। অন্যদিকে নোরার প্রশ্ন হলো, একজন মেয়ে কি মৃত্যুপথযাত্রী বাবাকে দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা করতে পারবে না? একজন স্ত্রী কি স্বামীর জীবন বাঁচাতে পারবে না?
নোরার এই কাজকে শুধু স্বামীকে বোকা বানানোর কৌশল বললে তার আত্মত্যাগকে ছোট করা হয়। আবার শুধু ভালোবাসার মহৎ কাজ বললে তার সিদ্ধান্তের আইনি ও নৈতিক জটিলতা আড়াল হয়ে যায়। নোরা ভালোবেসেছিল, ঝুঁকি নিয়েছিল এবং আইন ভেঙেছিল। এই তিনটি সত্য একই সঙ্গে বহন করেই তার চরিত্রকে বুঝতে হয়।
সে বছরের পর বছর গোপনে কাজ করে ঋণ পরিশোধ করেছে। যে নারীকে টরভাল্ড অর্থ বোঝে না বলে মনে করেন, সেই নারীই গোপনে সংসারের সবচেয়ে বড় আর্থিক দায়িত্বগুলোর একটি বহন করেছে। অথচ নোরা তাকে সত্যটি বলতে পারে না। কারণ সে জানে, টরভাল্ড তার আত্মত্যাগের চেয়ে নিজের পৌরুষ, কর্তৃত্ব এবং সামাজিক মর্যাদার আঘাতটিকেই আগে দেখবেন।
নোরার অভিনয়: আত্মরক্ষা, ভালোবাসা, না গোপন বিদ্রোহ?
নোরা টরভাল্ডের সামনে প্রায়ই নিজেকে সরল, দুর্বল ও নির্ভরশীল হিসেবে উপস্থাপন করে। সে আবদার করে, শিশুর মতো কথা বলে, টরভাল্ডের পছন্দের ছোট পাখি বা কাঠবিড়ালির ভূমিকায় নিজেকে সাজিয়ে রাখে। কিন্তু এই আচরণ তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ব নয়। এটি কখনো আত্মরক্ষা, কখনো ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা, আবার কখনো নিজের প্রয়োজন পূরণের কৌশল।
টরভাল্ড যে নোরাকে দেখতে চান, নোরা অনেক সময় সেই নোরাই হয়ে ওঠে। এই ছদ্মবেশ তাকে সংসারের ভেতর সামান্য প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়। সরাসরি কথা বললে টরভাল্ড হয়তো শুনবেন না; কিন্তু আদুরে পুতুল হয়ে অনুরোধ করলে তিনি কিছু কথা শুনতে পারেন। নোরা এই পদ্ধতিটি জানে এবং প্রয়োজনে ব্যবহারও করে।
এখানেই নোরার চরিত্রের আনন্দ ও বেদনা এক হয়ে যায়। চোখের আড়ালে কাজ করতে পারা, ঋণের কিস্তি শোধ করা এবং সবাইকে নিজের অক্ষমতা সম্পর্কে ভুল ধারণায় রাখতে পারা তাকে একধরনের গোপন আনন্দ দেয়। সে অনুভব করে, সবাই তাকে যতটা বোকা মনে করে, সে ততটা বোকা নয়।
কিন্তু এ কি স্বাধীনতা? যে নারীকে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করতে গোপনে কাজ করতে হয়, যে নিজের কথা সরাসরি না বলে অভিনয়ের মাধ্যমে বলার চেষ্টা করে, সে কি সত্যিই ক্ষমতাবান? নোরা কিছু সিদ্ধান্তে টরভাল্ডকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু সেই প্রভাব সমমর্যাদার ক্ষমতা নয়। সেটি অসম সম্পর্কের ভেতর নিজের জন্য সামান্য জায়গা তৈরি করার কৌশল।
একটি প্রয়োজনীয় পার্থক্য
নোরা পুতুলের অভিনয় ব্যবহার করে টরভাল্ডকে প্রভাবিত করে, কিন্তু তাতে সে টরভাল্ডের সমান ক্ষমতার অধিকারী হয় না। কারণ অভিনয়টি তাকে করতে হয় টরভাল্ডের অহং ও কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রেখেই।
তাহলে টরভাল্ড কি নোরার হাতের পুতুল?
নাটকের সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রশ্নটি এখানেই। নোরা যদি নিজের প্রকৃত জীবন গোপন রাখে, যদি টরভাল্ডকে এমন একটি বাস্তবতা বিশ্বাস করাতে পারে যা আসলে সত্য নয়, তাহলে টরভাল্ডও কি নোরার হাতের পুতুল হয়ে যান?
এক অর্থে টরভাল্ড অবশ্যই নোরার অভিনয়ে বিভ্রান্ত হন। তিনি বিশ্বাস করেন, নোরা অর্থ বোঝে না, গুরুতর সিদ্ধান্ত নিতে পারে না এবং তাঁর নির্দেশিত সীমার মধ্যেই জীবন কাটায়। বাস্তবে নোরা তাঁর অজান্তে ঋণ নেয়, গোপনে কাজ করে, কিস্তি পরিশোধ করে এবং এমন একটি সংকট বহন করে, যা পুরো সংসারকে ভেঙে দিতে পারে।
নোরা টরভাল্ডকে যা বিশ্বাস করাতে চায়, তিনি অনেকাংশে সেটিই বিশ্বাস করেন। কারণ এই বিশ্বাস তাঁর অহংকে আরাম দেয়। তিনি এমন একজন স্বামী হতে চান, যিনি দুর্বল স্ত্রীকে রক্ষা করেন। নোরা যদি তাঁর চেয়ে বেশি সাহসী, দায়িত্বশীল কিংবা আত্মত্যাগী হয়ে ওঠে, তাহলে টরভাল্ডের নিজের সম্পর্কে তৈরি ছবিটিই ভেঙে যায়।
তবু টরভাল্ডকে সরাসরি নোরার পুতুল বলা পুরো সত্য নয়। পরিবারে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক কর্তৃত্ব তাঁর হাতেই থাকে। নোরা তাঁকে একটি সাজানো বাস্তবতা বিশ্বাস করাতে পারে, কিন্তু টরভাল্ডের মতো প্রকাশ্য ক্ষমতা তার নেই। নোরা গোপনে নিয়ম ভাঙে; টরভাল্ড প্রকাশ্যে নিয়ম নির্ধারণ করেন।
তাই বলা ভালো, নোরা টরভাল্ডকে নিজের পুতুল বানায় না; বরং তাঁর সামনে এমন একটি অভিনয় মঞ্চস্থ করে, যেখানে টরভাল্ড নিজেকে কর্তা ভেবে সন্তুষ্ট থাকেন। নোরার অভিনয় তাঁকে বিভ্রান্ত করে, কিন্তু সেই অভিনয়ের প্রয়োজনই প্রমাণ করে প্রকৃত ক্ষমতার ভার কার দিকে ঝুঁকে আছে।
ঋণকে ঘৃণা করেন, কিন্তু সত্যকে কতটা বোঝেন?
নাটকের শুরুতেই টরভাল্ড ঋণ ও ধার করার বিরুদ্ধে কঠোর নৈতিক অবস্থান নেন। তাঁর কাছে ঋণের ওপর দাঁড়ানো সংসারে স্বাধীনতা বা সৌন্দর্য থাকতে পারে না। কথাটি নিজে অযৌক্তিক নয়। ঋণ সত্যিই মানুষের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে।
কিন্তু নাটকের বিদ্রূপ হলো, যে মানুষ ঋণকে নৈতিক দুর্বলতা মনে করেন, তাঁর জীবনই নোরার গোপন ঋণের কারণে রক্ষা পেয়েছে। তিনি নীতির কথা বলেন, কিন্তু সেই নীতির বাইরে দাঁড়িয়ে একজন নারী কেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল, তা বোঝার প্রস্তুতি তাঁর নেই।
টরভাল্ডের নৈতিকতা তাই পুরোপুরি মিথ্যা নয়; বরং সংকীর্ণ। তিনি নিয়ম বোঝেন, কিন্তু মানুষের পরিস্থিতি বোঝেন না। তিনি অপরাধ শনাক্ত করতে পারেন, কিন্তু ভালোবাসা, ভয় এবং অসহায়তার জটিলতা বিচার করতে পারেন না।
ক্রগস্টাড: নৈতিকতার আড়ালে আহত অহং
ক্রগস্টাডের প্রতি টরভাল্ডের মনোভাবেও তাঁর চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পায়। তিনি ক্রগস্টাডের অতীত নৈতিক বিচ্যুতি নিয়ে আপত্তি করেন। কিন্তু তাঁর বিরক্তির সবটুকু যে নৈতিক, তা নয়। ক্রগস্টাড তাঁকে পুরোনো পরিচয়ের সূত্রে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্বোধন করে এবং অধস্তন কর্মচারীর প্রত্যাশিত দূরত্ব বজায় রাখে না। এতে টরভাল্ডের আত্মসম্মান আহত হয়।
নোরা ক্রগস্টাডের চাকরি রক্ষার অনুরোধ করলে টরভাল্ড সিদ্ধান্তটি নতুন করে বিবেচনা না করে বরং নিজের কর্তৃত্ব রক্ষায় আরও অনড় হয়ে ওঠেন। স্ত্রীর অনুরোধ মেনে নিলে অফিসের লোকেরা তাঁকে দুর্বল ভাবতে পারে, এই আশঙ্কা তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ টরভাল্ড শুধু নৈতিকতার অনুসারী নন; তিনি মর্যাদার অভিনয়ও করেন। তিনি চান অন্যেরা তাঁকে দৃঢ়, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও কর্তৃত্বশীল মানুষ হিসেবে দেখুক। এই সামাজিক দৃষ্টি তাঁর সিদ্ধান্তকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যা তিনি নিজে হয়তো বুঝতেও পারেন না।
তারানতেলার মঞ্চে নোরাকে পরিচালনা
তারানতেলা নাচের দৃশ্যে নোরা একদিকে ভেঙে পড়ার আতঙ্কে ছুটছে, অন্যদিকে টরভাল্ড তার নাচের সৌন্দর্য, ছন্দ ও উপস্থাপন ঠিক করে দিতে ব্যস্ত। নোরার ভেতরে তখন মৃত্যুভয়, গোপন সত্য প্রকাশের ভয় এবং সংসার ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা। কিন্তু টরভাল্ডের চোখে সে তখনও সাজানো পোশাকের সুন্দর নৃত্যশিল্পী।
তিনি নোরাকে শেখান কীভাবে নাচতে হবে। নোরার দেহ, পোশাক এবং পরিবেশনাকে নিজের রুচির মধ্যে সাজিয়ে তোলেন। দৃশ্যটি যেন পুরো দাম্পত্যের একটি ক্ষুদ্র প্রতিরূপ: নোরা ভেতরে আতঙ্কিত, টরভাল্ড বাইরে তার সৌন্দর্য পরিচালনা করছেন।
তবু তারানতেলা শুধু টরভাল্ডের নিয়ন্ত্রণের দৃশ্য নয়। নোরার তীব্র, প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন নাচ তার ভেতরের ভয়, হতাশা এবং আটকে থাকা সত্তারও প্রকাশ। যে শরীরকে টরভাল্ড দৃশ্যমান সৌন্দর্যে বেঁধে রাখতে চান, সেই শরীরই যেন মুহূর্তের জন্য সাজানো ভঙ্গি ভেঙে নিজের আতঙ্ক প্রকাশ করে।
টরভাল্ডের কল্পিত বীরত্ব
টরভাল্ড নিজের মনে একজন রক্ষক। তিনি ভাবতে ভালোবাসেন, কোনো ভয়ংকর বিপদ এলে নোরার জন্য সবকিছু ত্যাগ করবেন। এই কল্পনায় তিনি বীর, আর নোরা বিপদে পড়া অসহায় নারী।
নোরাও দীর্ঘদিন এই অলৌকিক ঘটনার অপেক্ষা করে। সে বিশ্বাস করে, তার গোপন কাজ প্রকাশিত হলে টরভাল্ড সমস্ত দায় নিজের ওপর নেবেন। তাঁর ভালোবাসা সামাজিক নিয়ম ও ব্যক্তিগত সম্মানের চেয়েও বড় হয়ে উঠবে।
কিন্তু সত্যিকারের বিপদ যখন আসে, টরভাল্ডের কল্পিত বীরত্ব ভেঙে পড়ে। তখন তাঁর প্রথম উদ্বেগ নোরার ভয়, আত্মত্যাগ কিংবা সম্ভাব্য শাস্তি নয়। তাঁর উদ্বেগ নিজের সুনাম, চাকরি, সামাজিক অবস্থান এবং মানুষ কী বলবে।
টরভাল্ডের ট্র্যাজেডি এখানেই। তিনি হয়তো সচেতন প্রতারক নন। তিনি সত্যিই নিজেকে সাহসী, নৈতিক ও ভালোবাসাপূর্ণ স্বামী বলে বিশ্বাস করেন। কিন্তু সংকট তাঁর ঘোষিত মূল্যবোধ ও প্রকৃত আচরণের ব্যবধান প্রকাশ করে দেয়। এটি শুধু ভণ্ডামি নয়; এটি গভীর আত্মপ্রবঞ্চনা।
টরভাল্ডের নৈতিক অসংগতি
তিনি নোরাকে বিপদ থেকে রক্ষা করার স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু বিপদ সত্যি হয়ে এলে প্রথমে নিজেকেই রক্ষা করতে চান।
চিঠির পরে ভালোবাসার মুখোশ
ক্রগস্টাডের প্রথম চিঠি পড়ার পর টরভাল্ড নোরাকে কঠোরভাবে দোষারোপ করেন। তিনি মনে করেন, নোরা তাঁর সুখ নষ্ট করেছে, ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছে এবং সন্তানদের মানুষ করার যোগ্যতাও হারিয়েছে। তবু তিনি চান নোরা ঘরে থাকুক, যেন বাইরের মানুষ তাদের সংসারের ভাঙন বুঝতে না পারে।
এই মুহূর্তে তাঁর কাছে সম্পর্কের সত্যের চেয়ে সম্পর্কের বাহ্যিক চেহারা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভেতরে ভালোবাসা না থাকলেও বাইরে সুখী দাম্পত্যের অভিনয় চালিয়ে যেতে তিনি প্রস্তুত।
কিন্তু দ্বিতীয় চিঠিতে বিপদ কেটে যাওয়ার খবর পাওয়া মাত্র তাঁর ভাষা বদলে যায়। তিনি নোরাকে ক্ষমা করার ভঙ্গিতে আবার আগের অবস্থায় ফিরতে চান। যেন কয়েক মুহূর্ত আগে নোরার প্রতি তাঁর ঘৃণা, ভয় এবং নিষ্ঠুর শব্দগুলো কোনো গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রকাশ করেনি।
টরভাল্ড মনে করেন, বিপদ শেষ হয়েছে। কিন্তু নোরার কাছে বিপদ তখনই প্রথম সত্য হয়ে উঠেছে। কারণ সে বুঝেছে, যে মানুষটির জন্য সে এত বড় ঝুঁকি নিয়েছিল, সেই মানুষটি সংকটের মুহূর্তে তাকে বুঝতে বা রক্ষা করতে পারেনি।
টরভাল্ড কি শুধু খলচরিত্র?
এত কিছুর পর টরভাল্ডকে সহজেই নিষ্ঠুর, ভণ্ড কিংবা স্বার্থপর মানুষ বলে শেষ করে দেওয়া যায়। কিন্তু তাতে তাঁর চরিত্রের জটিলতা কমে যায়।
তিনি নোরাকে ভালোবাসেন না, এমন নয়। বরং সমস্যা হলো, তিনি ভালোবাসাকে সমতার সম্পর্ক হিসেবে কল্পনা করতে শেখেননি। তাঁর ভালোবাসার জন্য নোরাকে দুর্বল হতে হয়, কারণ নোরা শক্তিশালী হয়ে উঠলে টরভাল্ডের রক্ষকসত্তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।
তিনি সামাজিক নিয়মের নিষ্ক্রিয় শিকারও নন। নোরাকে ছোট করে দেখা, তার ওপর কর্তৃত্ব করা, তার নৈতিক সিদ্ধান্ত অস্বীকার করা এবং সামাজিক মর্যাদাকে সম্পর্কের সত্যের ওপরে রাখা তাঁর নিজের কাজ। সমাজ তাঁকে একটি ভূমিকা দিয়েছে, কিন্তু তিনি সেই ভূমিকাকে ব্যবহার করে সুবিধাও পেয়েছেন এবং সেটিকে সক্রিয় রেখেছেন।
তাই টরভাল্ডের প্রতি সহানুভূতি দেখানো যায়, কিন্তু তাঁর দায় মুছে ফেলা যায় না। তিনি সমাজের হাতে গড়া মানুষ, আবার সেই সমাজের ক্ষমতাকাঠামোর সক্রিয় ধারকও।
টরভাল্ড: সমাজের পুতুল, আবার পুতুলনাচের পরিচালকও
টরভাল্ডের কাছে ভালো স্বামী হওয়ার অর্থ পরিবারের আর্থিক নিয়ন্ত্রক, নৈতিক বিচারক, রক্ষক এবং সামাজিক মুখপাত্র হওয়া। তিনি এই ভূমিকাগুলোকে স্বাভাবিক সত্য বলে মেনে নিয়েছেন। পুরুষকে শক্তিশালী, নারীকে দুর্বল; পুরুষকে সিদ্ধান্তদাতা, নারীকে নির্ভরশীল ভাবার যে সামাজিক শিক্ষা, সেটিই তাঁর ব্যক্তিত্বের ভেতর বসবাস করে।
এই অর্থে তিনি সমাজের পুতুল। মানুষ কী ভাববে, অফিসে তাঁর মর্যাদা থাকবে কি না, সংসারের বাহ্যিক সম্মান রক্ষা পাবে কি না, এসব প্রশ্ন তাঁর সিদ্ধান্তকে টেনে নিয়ে যায়।
কিন্তু তিনি কেবল পুতুল নন। একই সঙ্গে তিনি নোরার পুতুলনাচের পরিচালক। তিনি ঠিক করেন নোরা কীভাবে কথা বলবে, কীভাবে অর্থ ব্যয় করবে, কীভাবে নাচবে এবং একজন স্ত্রী হিসেবে কোন সীমার মধ্যে থাকবে।
টরভাল্ডের চরিত্রের মূল দ্বন্দ্ব এখানেই: তিনি যে সামাজিক ব্যবস্থার হাতে পরিচালিত, সেই ব্যবস্থার ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনিও নোরাকে পরিচালনা করেন।
নোরার বিদ্রোহ কি আগে থেকেই ছিল?
নোরার গোপন ঋণ, ম্যাকারুন খাওয়া, ছোট ছোট মিথ্যা এবং টরভাল্ডকে প্রভাবিত করার চেষ্টা তার ভেতরের প্রতিরোধের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু শুরু থেকেই সে সম্পূর্ণ সচেতন বিদ্রোহী ছিল, এমন বলা ঠিক হবে না।
নোরা একই সঙ্গে দুই বিপরীত সত্যে বেঁচেছে। একদিকে সে টরভাল্ডের নিয়ম গোপনে ভেঙেছে; অন্যদিকে সে তাদের দাম্পত্যের অলৌকিক ভালোবাসায় বিশ্বাস করেছে। সে বিশ্বাস করেছে, সময় এলে টরভাল্ড তার জন্য সবকিছু ত্যাগ করবেন।
অর্থাৎ নোরা শুধু টরভাল্ডকে একটি অভিনয় দেখায়নি; সে নিজেও সেই অভিনয়ের কিছু অংশ বিশ্বাস করেছে। সে পুতুলের ঘর থেকে পালাতে চায়নি, যতক্ষণ পর্যন্ত না বুঝেছে ঘরটির ভালোবাসা তার কল্পনার মতো সত্য নয়।
এই উপলব্ধি নির্মম। কারণ নোরাকে শুধু স্বামীকে হারাতে হয় না; নিজের বিশ্বাস, নিজের সাজানো সুখ এবং নিজের দীর্ঘদিনের পরিচয়ও ভেঙে ফেলতে হয়। তার চলে যাওয়া তাই হঠাৎ রাগের সিদ্ধান্ত নয়। এটি নিজের জীবন সম্পর্কে একটি ভয়ংকর সত্য চিনে ফেলার পর নেওয়া সিদ্ধান্ত।
শেষ কথোপকথনে কে পুতুল?
নাটকের শেষাংশে নোরা টরভাল্ডকে বসিয়ে কথা বলে। এত দিন টরভাল্ড ব্যাখ্যা করেছেন, নৈতিক শিক্ষা দিয়েছেন এবং নোরার আচরণের অর্থ নির্ধারণ করেছেন। এবার নোরা নিজের জীবন, বিবাহ ও পরিচয়ের অর্থ নিজেই নির্ধারণ করে।
নোরা কথা বলে, টরভাল্ড শোনেন। নোরার উপলব্ধি যেন মুহূর্তের জন্য তাঁর ভাষা কেড়ে নেয়। যে মানুষ এত দিন সংসারের প্রতিটি বিষয়ে চূড়ান্ত কথা বলতেন, তিনি এবার নোরার সিদ্ধান্তের সামনে অসহায় হয়ে পড়েন।
এই দৃশ্যে টরভাল্ডের ভঙ্গির সঙ্গে পুতুলের তুলনা করতেই ইচ্ছা হয়। কিন্তু সে নোরার পুতুল হয়ে যায় বলে নয়। বরং তার পরিচিত নাটকের চিত্রনাট্য প্রথমবারের মতো আর তার হাতে থাকে না। নোরা নিজের সংলাপ নিজে লিখতে শুরু করে। ফলে পরিচালক ভেবেছিল যে মানুষটি নিজেকে, সে আবিষ্কার করে মঞ্চের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
টরভাল্ড সম্পর্কটি বাঁচাতে চান। তাঁর এই আকুতিতে ভালোবাসা আছে, ভয় আছে, আবার সামাজিক অপমানের আশঙ্কাও আছে। শেষ মুহূর্তে তিনি পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা বলেন। কিন্তু সে সম্ভাবনা কতটা সত্য এবং কতটা নোরাকে থামানোর মরিয়া চেষ্টা, নাটক তার নিশ্চিত উত্তর দেয় না।
এই অনিশ্চয়তা টরভাল্ডকে একমাত্রিক চরিত্র হতে দেয় না। তিনি ভেঙে পড়েন, কিন্তু সত্যিই বদলান কি না, আমরা জানি না। নোরা দরজা বন্ধ করে চলে যায়। টরভাল্ডকে সেই বন্ধ দরজার ভেতর দাঁড়িয়ে নিজের জীবন, নিজের পুরুষত্ব এবং নিজের ভালোবাসার অর্থ নতুন করে ভাবতে হয়।
পুতুলের ঘর ভাঙে, পুতুলেরা কি মুক্ত হয়?
A Doll’s House নাটকে নোরা নিঃসন্দেহে পুতুলসুলভ অবস্থানে বন্দী। কিন্তু সে নিষ্ক্রিয় পুতুল নয়। গোপন সিদ্ধান্ত, অভিনয়, মিথ্যা, আত্মত্যাগ এবং সীমিত প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে সে নিজের একটি অদৃশ্য জীবন তৈরি করেছে।
তবু গোপনে নিয়ম ভাঙা স্বাধীনতা নয়। লুকিয়ে ম্যাকারুন খাওয়া, গোপনে ঋণ নেওয়া কিংবা স্বামীকে কৌশলে প্রভাবিত করতে পারা একজন পূর্ণ মানুষের স্বাধীনতা হতে পারে না। নিজের পরিচয়, নৈতিক বিচার এবং ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণ করার অধিকার অর্জন করাই নোরার প্রকৃত মুক্তির শুরু।
অন্যদিকে টরভাল্ড সংসারের দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রক হলেও নিজেও সম্পূর্ণ স্বাধীন নন। সামাজিক মর্যাদা, পুরুষত্বের নির্দিষ্ট ধারণা, নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাস এবং সুখী দাম্পত্যের বাহ্যিক অভিনয় তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করে।
তাই টরভাল্ডকে শুধু নোরার হাতের পুতুল বলা যথেষ্ট নয়। তিনি সমাজের পুতুল, আবার সেই সামাজিক ব্যবস্থার একজন সক্রিয় পরিচালকও। তিনি নিজে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা, অথচ সেই বাঁধনকেই স্বাভাবিক ভেবে নোরার হাতে আরেকটি সুতো পরিয়ে দেন।
শেষ কথা
সম্ভবত এ কারণেই A Doll’s House শুধু একটি অসুখী দাম্পত্যের গল্প নয়। এটি এমন একটি সমাজের নাটক, যেখানে নিয়ন্ত্রণকারী এবং নিয়ন্ত্রিত উভয়েই নির্ধারিত ভূমিকার মধ্যে আটকে যায়।
পার্থক্য শুধু এই যে, নোরা শেষ পর্যন্ত নিজের ভূমিকাটি চিনতে পারে এবং সেই অভিনয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সাহস দেখায়। টরভাল্ডের ট্র্যাজেডি হলো, ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও তিনি নিজের অদৃশ্য সুতোগুলো কতটা চিনতে পারবেন, তার কোনো নিশ্চিত উত্তর আমাদের কাছে নেই।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
১. Ibsen, Henrik. A Doll’s House. Translated by R. Farquharson Sharp. Project Gutenberg, eBook No. 2542; মূল প্রকাশ ১৮৭৯, Project Gutenberg eBook প্রকাশ ১ মার্চ ২০০১, সর্বশেষ হালনাগাদ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। মূল নাটকের চরিত্র, সংলাপ ও ঘটনাক্রম যাচাইয়ে ব্যবহৃত। https://www.gutenberg.org/ebooks/2542 Project Gutenberg-এ মূল নাটক পড়ুন
২. Askarzadeh Torghabeh, Rajabali. “Stylistic Analysis of Characters in Henrik Ibsen’s A Doll’s House: Masculinity and Supremacy vs. Femininity and Helplessness.” Journal of Research in Applied Linguistics, Vol. 10, No. 2, Fall 2019, pp. 91–105. টরভাল্ডের আদুরে সম্বোধন, অসম ক্ষমতা এবং নোরার কৌশলগত পুতুলসুলভ আচরণ বিশ্লেষণে ব্যবহৃত। গবেষণাপত্রটি পড়ুন
৩. Insenga, Claudia. A Doll’s House: Gender Performativity, Quest for Identity and Production Shifts Over Time. Master’s Thesis, Harvard University Division of Continuing Education, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২। লিঙ্গভূমিকা, সামাজিক অভিনয় ও পরিচয়ের সংকটের বিস্তৃত পাঠে ব্যবহৃত। Harvard DASH-এ গবেষণাটি দেখুন
৪. Alamri, Dawla S., and Njood M. Alkhalagi. “A Doll’s House Tarantella: The Power of Transformation.” International Journal of Humanities and Social Science Invention, Vol. 11, Issue 4, Series 1, April 2022, pp. 58–64. তারানতেলার নাট্যিক ও রূপান্তরমূলক ভূমিকা বোঝার সহায়ক গবেষণা। গবেষণাপত্রটি পড়ুন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0