স্মার্ট এনআইডি ও ই-পাসপোর্ট: চিপে কি নাগরিকের সব তথ্য থাকে?

স্মার্ট এনআইডি ও ই-পাসপোর্ট কী, চিপে কোন তথ্য থাকে, ই-গেট কীভাবে কাজ করে এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় কী জানা জরুরি?

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ২
স্মার্ট এনআইডি ও ই-পাসপোর্ট: চিপে কি নাগরিকের সব তথ্য থাকে?
গাঢ় নীল পটভূমিতে এক ব্যক্তির দুই হাতে পরিচয়তথ্যবিহীন চিপযুক্ত স্মার্টকার্ড ও বন্ধ সবুজ ই-পাসপোর্ট।

স্মার্ট পরিচয় ও নিরাপদ ভ্রমণ

স্মার্ট এনআইডি ও ই-পাসপোর্ট: চিপে কি নাগরিকের সব তথ্য থাকে?

চিপযুক্ত পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট পরিচয় যাচাইকে দ্রুত ও নিরাপদ করতে পারে। তবে এগুলো নাগরিকের সব তথ্য বহনকারী সর্বশক্তিমান কার্ড নয়, ভিসার বিকল্পও নয়। প্রযুক্তিটির সুবিধা ও সীমা বুঝতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র, স্মার্টকার্ড, ই-পাসপোর্ট এবং ই-গেটের পার্থক্য জানা প্রয়োজন।

একটি প্রয়োজনীয় ভুল ধারণা

অনেকের ধারণা, স্মার্ট এনআইডি বা ই-পাসপোর্টের চিপে একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত, শিক্ষাগত, আর্থিক, চিকিৎসা ও সরকারি সব তথ্য একসঙ্গে সংরক্ষিত থাকে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। একটি পরিচয়ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় নিবন্ধনে থাকা তথ্য, ভৌত কার্ডের চিপে থাকা তথ্য এবং কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচয় যাচাইয়ের সময় যতটুকু তথ্য দেখতে পারে, এই তিনটি বিষয় এক নয়।

প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিকসেবা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিচয় যাচাইয়ের পদ্ধতিও বদলেছে। আগে কাগজের সনদ, লেমিনেটেড পরিচয়পত্র বা হাতে লেখা পাসপোর্টের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতো। এখন জাতীয় পরিচিতি নম্বর, অনলাইন নিবন্ধন, বায়োমেট্রিক তালিকাভুক্তি, চিপযুক্ত স্মার্টকার্ড এবং ই-পাসপোর্ট পরিচয় যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

এই পরিবর্তন সেবা গ্রহণ সহজ করতে পারে, নথি জাল করা কঠিন করতে পারে এবং পরিচয় যাচাইয়ের সময় কমাতে পারে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত ও বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবহারের কারণে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার নতুন প্রশ্নও তৈরি হয়।

ডিজিটাল পরিচয় বলতে কী বোঝায়?

ডিজিটাল পরিচয় কোনো একটি কার্ডের নাম নয়। এটি এমন একটি বিস্তৃত ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ডিজিটাল পরিবেশে কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করা, তাঁর পরিচয়ের সত্যতা যাচাই করা এবং অনুমোদিত সেবায় প্রয়োজনীয় পরিচয়তথ্য ব্যবহার করা হয়। একটি জাতীয় পরিচিতি নম্বর, অনলাইন হিসাব, বায়োমেট্রিক তথ্য, ডিজিটাল সনদ অথবা নিরাপদ যাচাইব্যবস্থা এই পরিচয়-কাঠামোর অংশ হতে পারে।

চারটি বিষয় এক নয়

১. জাতীয় পরিচিতি নম্বর: একজন নাগরিককে শনাক্ত করার জন্য নির্ধারিত একক নম্বর।

২. জাতীয় পরিচয়পত্র: নির্ধারিত পরিচয়তথ্য ও জাতীয় পরিচিতি নম্বরসহ নাগরিককে দেওয়া পরিচয়পত্র।

৩. স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র: উন্নত নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য ও ইলেকট্রনিক চিপযুক্ত ভৌত জাতীয় পরিচয়পত্র।

৪. অনলাইন এনআইডি সেবা: অনলাইন হিসাব নিবন্ধন, পরিচয়পত্রের কপি সংগ্রহ, সংশোধন বা পুনঃইস্যুর আবেদন এবং স্মার্টকার্ডের অবস্থা যাচাইয়ের মতো সরকারি সেবা।

স্মার্ট এনআইডি কী?

স্মার্ট এনআইডি হলো বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ব্যবস্থার চিপযুক্ত পরিচয়পত্র। বাংলাদেশে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর। পুরোনো লেমিনেটেড পরিচয়পত্রের তুলনায় স্মার্টকার্ডে উন্নত নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয় এবং পর্যায়ক্রমে নাগরিকদের মধ্যে বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধনের সময় নাম, জন্মতারিখ, পিতা-মাতার পরিচয়, ঠিকানা, ছবি ও নির্ধারিত বায়োমেট্রিক বৈশিষ্ট্যসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় জাতীয় পরিচয় নিবন্ধনে থাকা সব তথ্য সরাসরি স্মার্টকার্ডের চিপে থাকে, এমন কথা প্রকাশ্য বর্তমান সরকারি প্রযুক্তিগত তালিকা ছাড়া বলা নিরাপদ নয়।

স্মার্টকার্ডের প্রধান কাজ হলো পরিচয় যাচাইকে নির্ভরযোগ্য করা। ব্যাংক হিসাব খোলা, মোবাইল সংযোগ নিবন্ধন, পাসপোর্ট আবেদন, কর-সংক্রান্ত কাজ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবায় এনআইডি পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে সেবাভেদে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়ম, আইনগত ভিত্তি ও যাচাইপদ্ধতি আলাদা।

৩২ ধরনের তথ্য নাকি ৩২টি সেবা?

স্মার্টকার্ড উদ্বোধনের সময় বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৩২ ধরনের নাগরিক-তথ্য এবং বহু সম্ভাব্য সেবায় ব্যবহারের কথা প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু “৩২ ধরনের তথ্য” এবং “৩২টি সেবা” একই দাবি নয়। বর্তমান সরকারি পূর্ণাঙ্গ সেবাতালিকা ছাড়া স্মার্টকার্ডে ঠিক ৩২টি সেবা পাওয়া যায় বলা উচিত নয়।

ই-পাসপোর্ট কী?

ই-পাসপোর্ট বা ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট হলো চিপযুক্ত, যন্ত্রে পাঠযোগ্য আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নথি। এর প্রচ্ছদ বা তথ্যপাতার সঙ্গে যোগাযোগবিহীন ইলেকট্রনিক চিপ যুক্ত থাকে। বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট সেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি। বাংলাদেশের ই-পাসপোর্ট International Civil Aviation Organization (ICAO)-এর প্রযোজ্য মান অনুসরণ করে।

ই-পাসপোর্টের চিপে পাসপোর্টের তথ্যপাতায় থাকা পরিচয়তথ্য, ডিজিটাল ছবি এবং নথিটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা উপাদান থাকে। ইস্যুকারী দেশের ডিজিটাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে সীমান্ত কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা করতে পারে পাসপোর্টটি প্রকৃত কর্তৃপক্ষ ইস্যু করেছে কি না এবং চিপে থাকা তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে কি না।

এটি সাধারণ মেমোরি কার্ডের মতো কোনো উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার নয়। বাংলাদেশের প্রকাশ্য সরকারি প্রযুক্তিগত তালিকা ছাড়া চিপে কোন কোন ঐচ্ছিক বায়োমেট্রিক উপাদান সংরক্ষিত থাকে, সে বিষয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে নির্দিষ্ট দাবি করাও ঠিক নয়।

ই-পাসপোর্ট কী যাচাই করতে সাহায্য করে?

১. নথিটি অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ ইস্যু করেছে কি না।

২. চিপের তথ্য অননুমোদিতভাবে পরিবর্তিত হয়েছে কি না।

৩. পাসপোর্টের তথ্য ও যাত্রীর পরিচয় সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

৪. স্বয়ংক্রিয় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় পাসপোর্টটি যন্ত্রে যাচাই করা সম্ভব কি না।

বিদেশি কর্তৃপক্ষ কি নাগরিকের সব তথ্য দেখতে পারে?

ই-পাসপোর্ট যাচাই করতে পারা আর বাংলাদেশের সব নাগরিক তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকার পাওয়া এক বিষয় নয়। সীমান্ত কর্তৃপক্ষ পাসপোর্টের চিপ, দৃশ্যমান তথ্য, ডিজিটাল স্বাক্ষর এবং প্রযোজ্য ভ্রমণ নথি পরীক্ষা করতে পারে। এর মাধ্যমে পাসপোর্টটি আসল কি না এবং যাত্রীর পরিচয় নথিটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না যাচাই করা যায়।

ICAO Public Key Directory দেশগুলোর ই-পাসপোর্টের ডিজিটাল সনদ যাচাইয়ে সহায়তা করে। এটি পাসপোর্টধারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের বৈশ্বিক উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার নয়। ফলে ই-পাসপোর্ট থাকার অর্থ কোনো বিদেশি কর্তৃপক্ষ একজন বাংলাদেশি নাগরিকের শিক্ষা, ব্যাংক হিসাব, চিকিৎসা, কর অথবা অন্যান্য সব তথ্য দেখতে পারবে, এমন নয়।

পাসপোর্ট, ভিসা ও ই-গেটের পার্থক্য

পাসপোর্ট

নাগরিকত্ব ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণ-পরিচয়ের নথি। এটি যাত্রীর পরিচয় এবং ইস্যুকারী দেশের তথ্য বহন করে।

ভিসা বা ভ্রমণ অনুমোদন

গন্তব্যদেশের আইনের অধীনে প্রবেশ, অবস্থান অথবা নির্দিষ্ট কার্যক্রমের অনুমতি। ই-পাসপোর্ট নিজে ভিসার প্রয়োজন বাতিল করে না।

ই-গেট

স্বয়ংক্রিয় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, যা ই-পাসপোর্টের চিপ, যাত্রীর মুখমণ্ডল অথবা অন্য অনুমোদিত তথ্য যাচাই করে। পরিচয় বা নথি যাচাই ব্যর্থ হলে যাত্রীকে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার কাছে যেতে হতে পারে।

ই-পাসপোর্ট ই-গেট ব্যবহারের প্রযুক্তিগত সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু শুধু ই-পাসপোর্ট থাকলেই বিশ্বের সব বিমানবন্দরে ই-গেট ব্যবহারের অধিকার পাওয়া যায় না। গন্তব্যদেশের নীতি, বিমানবন্দরের অবকাঠামো, যাত্রীর নাগরিকত্ব, বয়স, ভিসা বা আবাসিক অবস্থানসহ বিভিন্ন শর্ত প্রযোজ্য হতে পারে।

বাংলাদেশেও ই-গেট স্থাপন ও বিভিন্ন সময়ে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিমানবন্দর, আগমন বা বহির্গমন, পরিচালনাগত অবস্থা এবং প্রচলিত ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়াভেদে এর বাস্তব প্রাপ্যতা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই যাত্রীর সব প্রয়োজনীয় নথি সঙ্গে রাখা এবং প্রচলিত ইমিগ্রেশন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকা জরুরি।

ই-পাসপোর্টের আবেদন কীভাবে করা হয়?

বাংলাদেশের সরকারি ই-পাসপোর্ট পোর্টাল আবেদনপ্রক্রিয়াকে সাধারণভাবে পাঁচটি ধাপে উপস্থাপন করে:

১. বর্তমান ঠিকানা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিস নির্ধারণ করা।

২. সরকারি পোর্টালে অনলাইনে আবেদন পূরণ করা।

৩. নির্ধারিত পদ্ধতিতে পাসপোর্টের ফি পরিশোধ করা।

৪. প্রয়োজনীয় নথিসহ পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে বায়োমেট্রিক তালিকাভুক্তি সম্পন্ন করা।

৫. প্রক্রিয়া শেষে নির্ধারিত পাসপোর্ট অফিস থেকে ই-পাসপোর্ট সংগ্রহ করা।

আবেদনকারীর বয়স ও অবস্থান অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা ইংরেজি সংস্করণের অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ প্রয়োজন হতে পারে। দেশের ভেতর থেকে ২০ বছরের বেশি বয়সে আবেদন করলে সাধারণভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র আবশ্যক। সরকারি নির্দেশনা পরিবর্তিত হতে পারে বলে আবেদন করার আগে সরকারি পোর্টালের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা উচিত।

পাসপোর্টের পৃষ্ঠাসংখ্যা, মেয়াদ এবং সরবরাহের ধরন অনুযায়ী ফি আলাদা হয়। ফি পরিবর্তনশীল হওয়ায় পুরোনো নিবন্ধ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের পরিবর্তে সরকারি ই-পাসপোর্ট পোর্টালের বর্তমান ফি অনুসরণ করাই নিরাপদ।

স্মার্টকার্ড কি জালিয়াতি অসম্ভব করে?

চিপ, বায়োমেট্রিক তালিকাভুক্তি এবং বহুপদ নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য ভৌত পরিচয়পত্র নকল করা ও অন্যের পরিচয় ব্যবহার করা কঠিন করতে পারে। কিন্তু কোনো পরিচয়ব্যবস্থাকেই সম্পূর্ণ জালিয়াতিমুক্ত বলা যায় না।

পরিচয় জালিয়াতি শুধু কার্ড নকল করে ঘটে না। চুরি করা পরিচয়তথ্য, দুর্বল অনলাইন যাচাই, অননুমোদিত তথ্য শেয়ারিং, প্রতারণামূলক ফোনকল, ভুয়া ওয়েবসাইট অথবা কোনো সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা দুর্বলতাও পরিচয় অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই শক্তিশালী কার্ডের পাশাপাশি নিরাপদ তথ্যব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিও প্রয়োজন।

ব্যক্তিগত ও বায়োমেট্রিক তথ্যের নিরাপত্তা

বায়োমেট্রিক তথ্য সাধারণ পাসওয়ার্ডের মতো নয়। কোনো পাসওয়ার্ড ফাঁস হলে সেটি বদলানো যায়, কিন্তু আঙুলের ছাপ, আইরিস বা মুখাবয়ব সহজে বদলানো সম্ভব নয়। ফলে বায়োমেট্রিক ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও অনেক বেশি।

বাংলাদেশে পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তব উদ্বেগও দেখা গেছে। ২০২৩ সালে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের একটি সরকারি ওয়েবসাইটে বিপুলসংখ্যক নাগরিকের নাম, যোগাযোগের তথ্য ও জাতীয় পরিচয় নম্বর উন্মুক্ত হওয়ার ঘটনা সংবাদ ও নিরাপত্তা গবেষণায় উঠে আসে। ঘটনাটি কেন্দ্রীয় স্মার্টকার্ডের চিপ ভাঙার ঘটনা ছিল না; বরং পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারকারী একটি সংযুক্ত সরকারি ব্যবস্থার নিরাপত্তা দুর্বলতার উদাহরণ।

২০২৫ সালে নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তদন্তে এনআইডি যাচাইসেবা ব্যবহারকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তৃতীয় পক্ষকে তথ্য দেওয়ার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়। এ ধরনের ঘটনা দেখায়, পরিচয়ব্যবস্থার নিরাপত্তা শুধু কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের ওপর নির্ভর করে না। যেসব প্রতিষ্ঠান তথ্য যাচাই বা ব্যবহারের অনুমতি পায়, তাদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্য ব্যবহারের সীমাও গুরুত্বপূর্ণ।

নিজের তথ্য সুরক্ষায় যা করবেন

১. শুধু সরকারি ওয়েবসাইটে এনআইডি বা পাসপোর্টের তথ্য দিন।

২. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের সম্পূর্ণ ছবি প্রকাশ করবেন না।

৩. অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে এককালীন পাসওয়ার্ড, পরিচয় নম্বর বা জন্মতারিখ দেবেন না।

৪. ওয়েবসাইটের ঠিকানা যাচাই না করে পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য লিখবেন না।

৫. পরিচয়পত্র হারিয়ে গেলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন।

আইন কী বলছে?

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধনসংক্রান্ত আইনে জাতীয় পরিচিতি নম্বর, পরিচয় নিবন্ধন, তথ্য সংরক্ষণ, গোপনীয়তা, তথ্য যাচাই এবং অননুমোদিত প্রবেশ বা প্রকাশের বিষয়ে বিধান রয়েছে। তবে আইন প্রকাশ, আইন কার্যকর হওয়ার প্রজ্ঞাপন এবং বাস্তবে সেবা পরিচালনাকারী বর্তমান কর্তৃপক্ষকে একই বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। নাগরিকসেবার ক্ষেত্রে বর্তমানে সরকারি নির্বাচন কমিশন ও এনআইডি পোর্টালের কার্যকর নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।

ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ ব্যক্তিগত তথ্যের আইনসম্মত প্রক্রিয়াকরণ, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের একটি কাঠামো দিয়েছে। তবে আইনটির কিছু অভিযোগ, প্রশাসনিক জরিমানা ও প্রতিকারসংক্রান্ত বিধান পরবর্তী কার্যকরীকরণ প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। তাই শুধু আইন থাকলেই তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না; বাস্তব প্রয়োগ, নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিও প্রয়োজন।

প্রযুক্তি সুবিধা দেয়, কিন্তু সীমাহীন ক্ষমতা নয়

স্মার্ট এনআইডি ও ই-পাসপোর্ট পরিচয় যাচাই, নথির নিরাপত্তা এবং নাগরিকসেবা উন্নত করতে সাহায্য করে। তবে এগুলো নাগরিকের সব তথ্য বহনকারী কার্ড নয়। ই-পাসপোর্ট ভিসার বিকল্প নয় এবং শুধু চিপযুক্ত পাসপোর্ট থাকলেই বিশ্বের সব ই-গেট ব্যবহার করা যায় না।

এই প্রযুক্তির প্রকৃত সুফল নির্ভর করে তথ্যের নির্ভুলতা, নিরাপদ অবকাঠামো, প্রয়োজনসীমিত তথ্য ব্যবহার, কার্যকর গোপনীয়তা সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির ওপর। পরিচয় যাচাই যত সহজ হবে, সেই পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য রক্ষার দায়িত্বও তত বেশি গুরুত্ব দিয়ে পালন করতে হবে।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, ই-পাসপোর্ট অনলাইন নিবন্ধন পোর্টাল। “Country Signing Certificate Authority: Overview.” বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট চালু, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ এবং ডিজিটাল সনদব্যবস্থা সম্পর্কিত সরকারি তথ্য।
https://www.epassport.gov.bd/landing/cscaসরকারি উৎস দেখুন

২. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, ই-পাসপোর্ট অনলাইন নিবন্ধন পোর্টাল। “5 Steps to Your e-Passport.” সর্বশেষ হালনাগাদ: ৩ জুন ২০২৬।
https://www.epassport.gov.bd/instructions/five-step-to-your-epassportআবেদনের ধাপ দেখুন

৩. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, ই-পাসপোর্ট অনলাইন নিবন্ধন পোর্টাল। “ই-পাসপোর্ট ফরম পূরণের নির্দেশাবলী।” সর্বশেষ হালনাগাদ: ৩ আগস্ট ২০২৬।
https://www.epassport.gov.bd/instructions/instructionsসরকারি নির্দেশনা দেখুন

৪. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, ই-পাসপোর্ট অনলাইন নিবন্ধন পোর্টাল। “e-Passport Fees and Payment Options.” সর্বশেষ হালনাগাদ: ১১ জুলাই ২০২৬।
https://www.epassport.gov.bd/instructions/passport-feesবর্তমান ফি দেখুন

৫. বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। Bangladesh NID Application System. নতুন নিবন্ধন, অনলাইন হিসাব, সংশোধন, পুনঃইস্যু ও পরিচয়পত্রের কপি সংগ্রহের সরকারি পোর্টাল।
https://services.nidw.gov.bd/nid-pub/সরকারি এনআইডি পোর্টাল দেখুন

৬. বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। “স্মার্ট কার্ড স্ট্যাটাস।” জাতীয় পরিচয়পত্র বা ফরম নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে স্মার্টকার্ডের বর্তমান অবস্থা যাচাইয়ের সরকারি সেবা।
https://services.nidw.gov.bd/nid-pub/card-statusস্মার্টকার্ডের অবস্থা দেখুন

৭. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। “জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০২৩।” ২০২৩ সনের ৪০ নং আইন, প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩।
http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-details-1458.htmlআইনের পাঠ দেখুন

৮. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। “ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬।” ২০২৬ সনের ৬৩ নং আইন, প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬।
http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-details-1692.htmlআইনের পাঠ দেখুন

৯. International Civil Aviation Organization (ICAO). “ICAO PKD: ePassport Basics.” ই-পাসপোর্টের চিপ, ডিজিটাল স্বাক্ষর ও আন্তর্জাতিক সনদ যাচাইব্যবস্থার ব্যাখ্যা।
https://www.icao.int/icao-pkd/epassport-basicsICAO-এর ব্যাখ্যা দেখুন

১০. International Civil Aviation Organization (ICAO). Doc 9303: Machine Readable Travel Documents. বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ, চিপের তথ্যকাঠামো ও ভ্রমণ নথির নিরাপত্তাব্যবস্থার আন্তর্জাতিক মান।
https://www.icao.int/publications/doc-series/doc-9303ICAO Doc 9303 দেখুন

১১. ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। “Border Control Management (E-Gate).” সর্বশেষ হালনাগাদ: ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪।
https://dip.gov.bd/site/page/aa4eb835-1ba6-421d-8481-f648f39d7a55/সরকারি তথ্য দেখুন

১২. Lorenzo Franceschi-Bicchierai. “Bangladesh Government Website Leaks Citizens’ Personal Data.” TechCrunch, 7 July 2023.
https://techcrunch.com/2023/07/07/bangladesh-government-website-leaks-citizens-personal-data/প্রতিবেদন দেখুন

১৩. The Business Standard. “NID Data Leak: EC Finds Primary Evidence Against 5 Institutions.” 10 February 2025.
https://www.tbsnews.net/bangladesh/nid-data-leak-ec-finds-primary-evidence-against-5-institutions-1065496প্রতিবেদন দেখুন

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
আব্দুস সবুর (লোটাস) আমি আব্দুস সবুর, লেখালেখিতে লোটাস নামে পরিচিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছি। অর্থনীতি, শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, ক্রীড়া ও সম্পাদকীয় বিষয়ে লেখালেখির অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। অভিযাত্রীর সহ-সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে আমি লেখা পর্যালোচনা, সম্পাদকীয় সমন্বয় এবং প্রকাশনার মাননিয়ন্ত্রণে যুক্ত আছি।