আপনাকে কে পড়ছে? প্রোফাইলিং, দুর্বলতার মানচিত্র ও ম্যানিপুলেশনের অন্ধকার মনস্তত্ত্ব

আচরণ, কথা, ভয় ও ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে কীভাবে মানুষের প্রোফাইল তৈরি হয়? বাণিজ্যিক বিশ্লেষণ থেকে নজরদারি ও মানসিক ম্যানিপুলেশন পর্যন্ত গভীর অনুসন্ধান।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ৪
আপনাকে কে পড়ছে? প্রোফাইলিং, দুর্বলতার মানচিত্র ও ম্যানিপুলেশনের অন্ধকার মনস্তত্ত্ব
সন্ধ্যার আলোয় কাঠের ডেস্কে উল্টো করে রাখা একটি স্মার্টফোনের পাশে স্বচ্ছ কাচে মানুষের মুখাবয়ব ও দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন দৃশ্যের খণ্ডচিত্র যুক্ত হয়েছে; বিন্দু ও সংযোগরেখাগুলো ব্যক্তিগত তথ্য, আচরণ ও অভ্যাস থেকে অদৃশ্য ব্যক্তিচিত্র নির্মাণের ধারণা তুলে ধরছে।

তথ্য, আচরণ ও অদৃশ্য ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব

আপনাকে কে পড়ছে? প্রোফাইলিং, দুর্বলতার মানচিত্র ও ম্যানিপুলেশনের অন্ধকার মনস্তত্ত্ব

পাঠকের জন্য সতর্কতা: এই প্রবন্ধে ব্যক্তিগত তথ্য, আচরণগত পর্যবেক্ষণ, নজরদারি এবং মানুষের দুর্বলতার অপব্যবহার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য কাউকে ম্যানিপুলেট করার পদ্ধতি শেখানো নয়। বরং মানুষকে বোঝার নামে কখন তার স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, সেই সূক্ষ্ম সীমাটি শনাক্ত করা।

Profiling বা প্রোফাইলিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলায় একে শুধু “জীবনালেখ্য” বললে সম্ভবত পুরো অর্থটি ধরা পড়ে না। জীবনালেখ্য শুনলে একজন মানুষের জীবনের বর্ণনা মনে হয়। কিন্তু প্রোফাইলিং সব সময় বর্ণনা নয়। এটি অনেক ক্ষেত্রে তথ্য, আচরণ, পছন্দ, সম্পর্ক, ভয়, অভ্যাস এবং পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত থেকে একটি কার্যকর ব্যক্তিচিত্র নির্মাণের চেষ্টা।

এই ব্যক্তিচিত্র সব সময় আপনার পূর্ণ পরিচয় নয়। বরং অন্য কারও উদ্দেশ্য ও প্রয়োজন অনুযায়ী নির্মিত আপনার একটি নির্বাচিত সংস্করণ।

একটি কোম্পানি জানতে চাইতে পারে আপনি কী কিনবেন। একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান জানতে চাইতে পারে আপনি ঋণ পরিশোধ করবেন কি না। একটি বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম অনুমান করতে পারে কোন বার্তায় আপনি সাড়া দেবেন। একটি নিরাপত্তা সংস্থা জানতে চাইতে পারে আপনার আচরণ কোনো সম্ভাব্য ঝুঁকির সঙ্গে মেলে কি না। আর ব্যক্তিগত সম্পর্কে কেউ জানতে চাইতে পারেন, কোন কথায় আপনি নরম হন, কোন পরিস্থিতিতে ভয় পান এবং কখন আপনার সিদ্ধান্তকে সবচেয়ে সহজে প্রভাবিত করা সম্ভব।

প্রোফাইলিং শুধু আপনাকে শনাক্ত করতে চায় না। এটি অনুমান করতে চায় আপনি পরবর্তী সময়ে কী করবেন, কী গ্রহণ করবেন, কাকে বিশ্বাস করবেন এবং কোথায় আপনার প্রতিরোধ তুলনামূলকভাবে দুর্বল হতে পারে।

ভোক্তা বোঝা, নাকি ভোক্তা তৈরি করা?

সাধারণত প্রোফাইলিং একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে করা হয়। একটি বড় প্রতিষ্ঠান বহু মানুষের আচরণ বিশ্লেষণ করে তার পণ্যের সম্ভাব্য ক্রেতা নির্ধারণ করতে পারে। বয়স, অবস্থান, আয়, আগ্রহ, আগের কেনাকাটা এবং বিজ্ঞাপনের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখে প্রতিষ্ঠানটি অনুমান করতে পারে নতুন পণ্যটির বাজার আছে কি না।

এখানে তৈরি হওয়া ভোক্তা-প্রোফাইল ব্যবসায়িক ঝুঁকি কমায়। কোম্পানি দেখতে পায় সম্ভাব্য ক্রেতা আছেন এবং তাদের আচরণ অনুযায়ী পণ্যটি বাজারে চলতে পারে।

কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন আসে। কোম্পানি কি শুধু বিদ্যমান চাহিদা শনাক্ত করছে, নাকি ভোক্তার ভয়, অভাববোধ ও আকাঙ্ক্ষাকে ব্যবহার করে নতুন চাহিদাও তৈরি করছে?

ধরুন, আপনার অনলাইন আচরণ দেখে অনুমান করা হলো, আপনি নিজের চেহারা নিয়ে সন্তুষ্ট নন। প্রথমে আপনাকে এমন কনটেন্ট দেখানো হলো, যা আপনার অসন্তুষ্টিকে আরও দৃশ্যমান করে। এরপর সেই অসন্তুষ্টির সমাধান হিসেবে কোনো পণ্য সামনে আনা হলো।

পণ্যটি হয়তো কার্যকর। বিজ্ঞাপনটিও সরাসরি মিথ্যা নয়। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়ায় আপনার একটি নিরাপত্তাহীনতা শনাক্ত করা হয়েছে, তারপর সেটিকে ক্রয়-সিদ্ধান্তের দরজায় পরিণত করা হয়েছে।

এই জায়গায় বাজার গবেষণা এবং মানসিক দুর্বলতার বাণিজ্যিক ব্যবহার একে অন্যের খুব কাছে চলে আসে।

অনলাইনে আমরা কী রেখে যাচ্ছি?

অনলাইন তথ্য চুরি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হই। পাসওয়ার্ড, ব্যক্তিগত ছবি কিংবা ব্যাংকিং তথ্য হারানোর ভয় করি। কিন্তু আমাদের ব্যক্তিচিত্র তৈরির জন্য সব সময় বড় ধরনের তথ্যচুরির প্রয়োজন হয় না।

আমরা প্রতিদিন স্বেচ্ছায় অসংখ্য সংকেত রেখে যাচ্ছি। কোন ভিডিও কতক্ষণ দেখলাম, কোন পোস্টে থামলাম, কোথায় গেলাম, কোন বিষয়ে খুঁজলাম, কোন বিজ্ঞাপন এড়িয়ে গেলাম, রাতে কখন অনলাইনে থাকি এবং কোন মানুষটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করি, এসব তথ্য আলাদা অবস্থায় তুচ্ছ মনে হতে পারে।

কিন্তু বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলো একত্র হলে একটি অদৃশ্য জীবনচিত্র তৈরি হতে পারে।

ব্যক্তিগত তথ্যের বাজারও সব সময় এমন নয় যে একটি কোম্পানি আপনার নাম-ঠিকানাসহ পূর্ণ ফাইল আরেকটি কোম্পানির হাতে তুলে দিল। মোবাইল অ্যাপ, বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্ক, তৃতীয় পক্ষের অনুসরণকারী প্রযুক্তি এবং data broker বা তথ্য-মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ, সংযুক্ত ও পুনঃব্যবহার হতে পারে।

সংবেদনশীল অবস্থানতথ্য থেকে একজন মানুষ কোথায় চিকিৎসা নিতে যান, কোথায় প্রার্থনা করেন, কোন রাজনৈতিক সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন কিংবা কোন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত যাতায়াত করেন, সে সম্পর্কে অনুমান তৈরি করা সম্ভব।

আমরা হয়তো ভাবি, “আমার তথ্য দিয়ে কী হবে?” কিন্তু আপনার একক তথ্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার আচরণের পুনরাবৃত্ত ধারা। একজন মানুষ কোথায় গেলেন, সেটি একটি ঘটনা। তিনি প্রতি সপ্তাহে কোথায় যান, কার সঙ্গে যান এবং যাওয়ার পর কী খোঁজেন, সেটি একটি ব্যক্তিচিত্র।

একটি তথ্য হয়তো তেমন শক্তিশালী নয়। কিন্তু বহু ছোট তথ্যের সংযোগ এমন একটি ব্যক্তিচিত্র তৈরি করতে পারে, যা মানুষটি নিজের সম্পর্কেও কখনো সচেতনভাবে লিখে রাখেননি।

ব্যক্তিচিত্র কি মানুষটির ভবিষ্যৎ জানে?

প্রোফাইলিং নাটকীয় শোনায়। সিনেমার মতো মনে হয়। যেন কয়েকটি তথ্য দিলেই কোনো ব্যবস্থা বলে দিতে পারবে মানুষটি পরবর্তী সময়ে কী করবেন।

বাস্তবতা এত সরল নয়।

অতীতের আচরণ ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আচরণ সম্পর্কে কিছু ধারণা দিতে পারে। কিন্তু সম্ভাবনা নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়। মানুষ নতুন তথ্য পেয়ে সিদ্ধান্ত বদলান। সম্পর্ক বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়, ভয় বদলায়, কখনো মানুষ নিজেকেও বদলে ফেলেন।

ফলে তৈরি হওয়া ব্যক্তিচিত্রটি একটি কার্যকর অনুমানভিত্তিক মডেল, মানুষটি নিজে নন।

সমস্যা শুরু হয় যখন অনুমানকে সত্য, সম্ভাবনাকে চরিত্র এবং আচরণের পুনরাবৃত্ত ধারাকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

কোনো ব্যক্তি উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছেন মানেই তিনি অপরাধী নন। বারবার একটি নির্দিষ্ট জায়গায় যাওয়া মানেই তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লেখা পড়া মানেই সক্রিয় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নয়।

প্রোফাইলিং মানুষের সম্ভাব্য আচরণ অনুমান করতে পারে। মানুষের উদ্দেশ্য পড়ে ফেলতে পারে না।

একটি ব্যক্তিচিত্র ভুল হলে শুধু বিজ্ঞাপন ভুল হতে পারে না। ভুল ব্যক্তিচিত্র কখনো নির্দোষ মানুষকে সন্দেহভাজন, অযোগ্য, অবিশ্বস্ত কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবেও উপস্থাপন করতে পারে।

নিরাপত্তা সংস্থা কি আগে থেকেই সব জানে?

নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে প্রোফাইলিংয়ের ব্যবহার নিয়ে বহু নাটকীয় ধারণা আছে। মনে করা হয়, কয়েকজন মানুষ কোনো পরিকল্পনা শুরু করলেই শক্তিশালী দেশের গোয়েন্দা সংস্থা তাদের সম্পর্কে জেনে যাবে এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই নিরাপত্তা বাহিনী পৌঁছে যাবে।

কখনো গোয়েন্দা তথ্য, আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, মানবসূত্র, প্রকাশ্য অনলাইন কার্যক্রম এবং চলাচলের পুনরাবৃত্ত ধারা একত্র করে বাস্তব হুমকি আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

কিন্তু কোনো সংস্থা সর্বজ্ঞ নয়। তথ্যের ঘাটতি, ভুল ব্যাখ্যা, সমন্বয়ের দুর্বলতা, ভুল সংকেত এবং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা থাকে। কোনো ব্যবস্থা কাউকে সন্দেহজনক হিসেবে শনাক্ত করলেই সেই মানুষ অপরাধী হয়ে যান না।

আচরণ দেখে ক্ষতিকর উদ্দেশ্য শনাক্ত করার প্রযুক্তি নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা হয়েছে। মানুষের চাপ, অস্বস্তি ও শারীরিক সংকেত থেকে অপরাধমূলক অভিপ্রায় বোঝার দাবি আকর্ষণীয়। কিন্তু উদ্বিগ্ন হওয়া আর সহিংস উদ্দেশ্য থাকা এক নয়। একই লক্ষণ ভয়, অসুস্থতা, সাংস্কৃতিক পার্থক্য কিংবা কর্তৃপক্ষের সামনে অস্বস্তি থেকেও আসতে পারে।

তাই নিরাপত্তার নামে প্রোফাইলিং ব্যবহার করলে প্রশ্ন শুধু প্রযুক্তিটি কত শক্তিশালী, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, ব্যবস্থা ভুল করলে ক্ষতি কার হবে?

বাংলাদেশ, নজরদারি এবং প্রমাণের সীমা

বাংলাদেশে রাজনৈতিক কর্মসূচি, জনসমাবেশ কিংবা আন্দোলনের নির্দিষ্ট স্থানে আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি দেখে মনে হতে পারে, কর্তৃপক্ষ মানুষের পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য চলাচল সম্পর্কে আগে থেকেই জানত।

কখনো সেটি প্রকাশ্য ঘোষণা, মানবসূত্র, মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্য, যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষণ কিংবা সাধারণ প্রশাসনিক প্রস্তুতির ফল হতে পারে। প্রযুক্তিগত প্রোফাইলিং তার একটি সম্ভাব্য অংশ হতে পারে, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো গোপন সফটওয়্যার সক্রিয় থাকার দাবি প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়।

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার সমন্বিত ভূমিকা এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে জাতিসংঘের অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিবেদন নির্দিষ্ট অপ্রকাশিত প্রোফাইলিং সফটওয়্যারের ব্যবহার প্রমাণ করে না।

এখানে আমার নিজের জ্ঞানের সীমাও স্বীকার করা প্রয়োজন। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার পদ্ধতি সম্পর্কে আমার ধারণা এখনো প্রাথমিক ও উপরিতলের। যেটি আমি জানি না, সেটিকে নাটকীয়ভাবে ঘোষণা করলে লেখাটি আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু সত্যের কাছাকাছি নাও থাকতে পারে।

তাই আরও উপযোগী প্রশ্ন হলো:

১. কোন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে?

২. আইনি ভিত্তি কী?

৩. কার অনুমোদনে হচ্ছে?

৪. কতদিন তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে?

৫. কার সঙ্গে ভাগ করা হচ্ছে?

৬. ভুল ব্যক্তিচিত্র তৈরি হলে নাগরিক কীভাবে প্রতিকার পাবেন?

নিরাপত্তা প্রয়োজন। কিন্তু নিরাপত্তার নামে নাগরিককে অদৃশ্য সন্দেহের তালিকায় রেখে আপিলের পথ বন্ধ করা নিরাপত্তা নয়। সেটি জবাবদিহিহীন ক্ষমতা।

রাষ্ট্র থেকে এবার ব্যক্তিগত সম্পর্কে

এতক্ষণ বড় কোম্পানি, তথ্য-মধ্যস্থতাকারী এবং নিরাপত্তা সংস্থার কথা বললাম। কিন্তু প্রোফাইলিং শুধু বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়।

আমরা প্রতিদিন একে অন্যের ব্যক্তিচিত্র তৈরি করি।

কে কোন কথায় রেগে যান, কার সামনে অস্বস্তি বোধ করেন, কোন প্রশংসায় নরম হন, কোন অপমান ভুলতে পারেন না, কখন একা বোধ করেন, কার স্বীকৃতি চান এবং কোন সম্পর্ক হারানোর ভয় বেশি, এসব আমরা লক্ষ্য করি।

অনেক সময় এটি সম্পর্ক বোঝার স্বাভাবিক অংশ। কাছের মানুষের ভয় জানলে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া যায়। তার পছন্দ জানলে উপযুক্ত উপহার দেওয়া যায়। কোন কথায় কষ্ট পান জানলে সেই ভাষা এড়িয়ে চলা যায়।

কিন্তু একই জ্ঞান উল্টো দিকেও ব্যবহার করা সম্ভব।

কোন মুহূর্তে তিনি দুর্বল থাকেন, কোন প্রশংসায় সিদ্ধান্ত বদলান এবং কোন ভয় দেখালে আপনাকে আঁকড়ে ধরবেন, সেটিও তার মানসিক ব্যক্তিচিত্রের অংশ হতে পারে।

একজন মানুষকে বোঝা এবং তাকে ব্যবহার করা বাইরে থেকে একই পর্যবেক্ষণ দিয়ে শুরু হতে পারে। পার্থক্যটি তৈরি হয় সেই জ্ঞান ব্যবহারের উদ্দেশ্যে।

১. আচরণের পুনরাবৃত্ত ধারা পর্যবেক্ষণ

একজন মানুষের আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে কিছু পুনরাবৃত্ত ধারা ধরা পড়তে পারে। তিনি কখন স্বচ্ছন্দ, কোন বিষয়ে প্রতিরক্ষামূলক, কার উপস্থিতিতে কণ্ঠ বদলে যায় এবং কোন পরিস্থিতিতে দ্রুত সম্মতি দেন, এগুলো পর্যবেক্ষণযোগ্য।

ধরুন, মি. ক সাধারণত সংযত। কিন্তু মিসেস খ-এর উপস্থিতিতে তিনি দৃশ্যত অস্বস্তি ও আনন্দের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখান। তাদের মধ্যে কোনো অমীমাংসিত সম্পর্ক, আকর্ষণ, ভয় অথবা ক্ষমতার সমীকরণ থাকতে পারে।

একজন পর্যবেক্ষক বুঝতে পারেন, দুজনকে স্বচ্ছন্দ পরিবেশে বসালে পুরোনো বিরোধ নিয়ে আলাপের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এটি মধ্যস্থতা হতে পারে।

কিন্তু পর্যবেক্ষক যদি জানেন, মি. ক ওই মুহূর্তে তুলনামূলকভাবে বেশি সম্মতিপ্রবণ, তারপর সেই সময় নিজের স্বার্থের কোনো সিদ্ধান্ত আদায় করেন, তাহলে একই জ্ঞান ম্যানিপুলেশনে পরিণত হয়।

সাহায্য এবং ম্যানিপুলেশনের পার্থক্য শুধু ফলাফলে নয়। পার্থক্য হলো, অন্য মানুষটি জানেন কি না কী আলোচনা হচ্ছে এবং চাপমুক্তভাবে “না” বলার বাস্তব সুযোগ তার আছে কি না।

কারও আনন্দ, শোক, একাকিত্ব কিংবা ভয়কে সিদ্ধান্ত আদায়ের “সঠিক সময়” হিসেবে বেছে নেওয়া নৈতিক আলোচনার ভাষা নয়। এটি মানুষের সাময়িক মানসিক অবস্থাকে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত করা।

২. কথা বলার ধরন: ইঙ্গিত, চূড়ান্ত পরিচয় নয়

মানুষের কথা এবং বন্দুকের গুলি ফিরে আসে না, এমন একটি প্রবাদসুলভ সতর্কতা আছে। কথা বলার সময় তাই নিজের ভাষা সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে অন্য মানুষের শব্দচয়ন, বাচনভঙ্গি, কণ্ঠের পরিবর্তন, বিরতি এবং কথা বলার গতি কিছু সংকেত দিতে পারে। কেউ কোন শব্দ বারবার ব্যবহার করছেন, কোন প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছেন এবং কোন বিষয়ে হঠাৎ প্রতিরক্ষামূলক হচ্ছেন, তা পর্যবেক্ষণ করা যায়।

কিন্তু কয়েকটি শব্দ শুনেই একজন মানুষ কোন শ্রেণির, কতটা সৎ কিংবা তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ব কেমন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

ভাষাগত দক্ষতা, শিক্ষা, ক্লান্তি, উদ্বেগ, সামাজিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক ভিন্নতা এবং সামনে থাকা ব্যক্তির ক্ষমতা, সবই কথার ধরন বদলে দিতে পারে।

প্রোফাইলিংয়ের বিপদ হলো, পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া ইঙ্গিতকে আমরা খুব দ্রুত মানুষের চূড়ান্ত পরিচয়ে পরিণত করি। “তিনি কথা বলতে গিয়ে থেমেছেন”, এটি পর্যবেক্ষণ। “তিনি মিথ্যা বলছেন”, এটি ব্যাখ্যা। দুটি এক নয়।

প্রশংসা: স্বীকৃতি, নাকি বিনিয়োগ?

আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে হতাশ। কিন্তু সবাই সবার কাছে হতাশার কথা বলেন না। মানুষ সাধারণত বিশ্বস্ত মনে করা ব্যক্তিদের কাছেই ভয়, ব্যর্থতা ও অপূর্ণতার কথা প্রকাশ করেন।

কেউ যদি বুঝে ফেলেন আরেকজন মানুষ স্বীকৃতির অভাবে ভুগছেন, তাহলে সেই তথ্য দুইভাবে ব্যবহার করতে পারেন।

তিনি সৎভাবে মানুষটির কাজের ভালো দিক স্বীকার করতে পারেন। এতে আত্মবিশ্বাস বাড়তে পারে এবং সম্পর্ক গভীর হতে পারে।

আবার অতিরঞ্জিত প্রশংসা দিয়ে দ্রুত আস্থা তৈরি করে পরে নিজের পক্ষে সিদ্ধান্ত চাইতে পারেন। তখন প্রশংসা আর প্রশংসা থাকে না। এটি আগাম বিনিয়োগ হয়ে যায়।

প্রকৃত প্রশংসা মানুষের কাজকে স্বীকৃতি দেয়। ম্যানিপুলেটিভ প্রশংসা প্রথমে মানুষটির আত্মমূল্য বাড়ায়, তারপর সেই আত্মমূল্যের বিনিময়ে আনুগত্য বা সিদ্ধান্ত আদায় করতে চায়।

প্রশংসার পর কেউ কিছু চাইছেন বলেই তিনি ম্যানিপুলেটর নন। পুনরাবৃত্ত আচরণটি দেখতে হবে। প্রশংসা কি সত্যভিত্তিক? যেটি চাওয়া হচ্ছে সেটি কি স্পষ্ট? মানুষটি কি অপরাধবোধ ছাড়া “না” বলতে পারেন? না বলার পরও সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে কি?

উত্তরগুলোই বলে দেবে, এটি সম্পর্ক, নাকি পরিকল্পিত প্রভাব।

৩. আবেগগত উদ্দীপক: পরিচয়ের ক্ষত

আবেগগত উদ্দীপক বলতে এমন কোনো কথা, স্মৃতি কিংবা পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়, যা মানুষের মধ্যে তীব্র আবেগগত প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

পুরুষের উপার্জনক্ষমতা নিয়ে অপমান একটি পরিচিত উদাহরণ। আমাদের সমাজ বহু পুরুষকে শিখিয়েছে, তার মূল্য প্রধানত আয়, দায়িত্ব বহন এবং পরিবারের প্রয়োজন পূরণের সামর্থ্যে।

ফলে কাউকে বলা হলো, “তোমার রাগ শুধু পরিবারের ওপর, কিন্তু আয় করতে পারো না”, এই বাক্য শুধু কাজের সমালোচনা থাকে না। এটি তার সামাজিকভাবে নির্মিত পুরুষত্ব, আত্মসম্মান এবং পরিবারের ভেতরের অবস্থানের ওপর আঘাত হয়ে উঠতে পারে।

সব পুরুষ একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না। কেউ প্রতিবাদ করবেন, কেউ চুপ থাকবেন, কেউ কাজের প্রেরণা অনুভব করবেন, আবার কেউ গভীর লজ্জা কিংবা মানসিক সংকটে পড়তে পারেন।

কিন্তু কারও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ব্যক্তিচিত্র তৈরি করে যদি জানা যায়, অর্থনৈতিক ব্যর্থতার ভয় তার সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা, তাহলে সেই জায়গায় আঘাত করে কাজ আদায় করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।

ফল পাওয়া এবং কাজটি নৈতিক হওয়া এক বিষয় নয়।

অপমান কখনো মানুষকে সাময়িকভাবে নড়াতে পারে। কিন্তু সেই গতি লজ্জা, ক্ষোভ এবং আত্মঅবিশ্বাসের ওপর দাঁড়ানো। এতে কাজ হতে পারে, সম্পর্কও ভেঙে যেতে পারে।

কাউকে অলসতা থেকে বের করতে হলে তার আচরণ, বাধা, দায়িত্ব ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে কথা বলা যায়। মানুষটির সম্পূর্ণ মূল্যকে উপার্জনের সঙ্গে বেঁধে আঘাত করা প্রয়োজন নেই।

কোনো ব্যক্তি নিজের ক্ষতি করার কথা বললে সেটিকে নাটক, অলসতা কিংবা ম্যানিপুলেশন ধরে উপেক্ষা করা নিরাপদ নয়। নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিন এবং প্রয়োজন হলে স্থানীয় জরুরি সেবা, বিশ্বস্ত অভিভাবক বা যোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য-পেশাজীবীর সহায়তা নিন।

৪. দুর্বলতার শোষণ: ভয় যখন নিয়ন্ত্রণের দরজা

কারও ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, একাকিত্ব ও দুর্বলতা বোঝা গেলে তার মানসিক জগতের একটি মানচিত্র পাওয়া যায়। সেই মানচিত্র দিয়ে মানুষটির পাশে দাঁড়ানোও সম্ভব, আবার তার সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করাও সম্ভব।

বিষয়টি অনেকটা কোনো ব্যবস্থার দুর্বলতা শনাক্ত করার মতো। কিন্তু মানুষ কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থা নয় এবং মানুষের দুর্বলতাও কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, যা আবিষ্কার করলেই সেখানে প্রবেশের অধিকার পাওয়া যায়।

আমার এক বন্ধু সাঁতার জানেন না। একদিন তাকে নৌকায় উঠতে উৎসাহিত করেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল, তিনি ধীরে ধীরে ভয়টি অতিক্রম করুন।

কিন্তু একই পরিস্থিতি অন্যভাবে ব্যবহার করা যেত।

মাঝনদীতে গিয়ে যদি বলা হতো, “আজ নদীর স্রোত সুবিধাজনক মনে হচ্ছে না। গতকাল এখানেই নৌকা ডুবেছে”, তাহলে তার ভয় তীব্র হতে পারত। এরপর যদি বলতাম, “আমি আছি, চিন্তা করো না”, তাহলে প্রথমে ভয় বাড়িয়ে নিজেকেই একমাত্র নিরাপত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হতো।

বাস্তবে হয়তো আমি নিজেকেও বাঁচাতে পারতাম না। অথচ বন্ধুটি ভাবতে পারতেন, আমি তার একমাত্র নির্ভরতা।

আমি বরং তাকে বলেছিলাম, সতর্ক থাকা জরুরি। কিন্তু আশপাশে আরও নৌকা চলছে এবং যাত্রীদের সবাই সাঁতার জানেন, এমনও নয়। অর্থাৎ ঝুঁকি অস্বীকার করিনি, আবার ভয়কে নিজের ক্ষমতায়ও পরিণত করিনি।

সাহস দেওয়ার ভাষা ঝুঁকিকে বাস্তব মাত্রায় রাখে এবং মানুষের স্বাধীনতা বাড়ায়। ম্যানিপুলেশনের ভাষা প্রথমে ভয় বাড়ায়, তারপর নিজের উপস্থিতিকে মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে উপস্থাপন করে।

সহায়তা ও ম্যানিপুলেশনের পাতলা রেখা

মানুষের আচরণ বুঝতে চাওয়া নিজে অন্ধকার নয়। শিক্ষক শিক্ষার্থীকে বোঝার চেষ্টা করেন। চিকিৎসক রোগীর ভয় বুঝতে চান। বন্ধু বন্ধুর সীমাবদ্ধতা জানেন। পরিবার কাছের মানুষের সংবেদনশীল জায়গাগুলো জানে।

প্রশ্ন হলো, জানা তথ্য দিয়ে কী করা হচ্ছে?

১. সহায়তা স্বাধীনতা বাড়ায়: মানুষটিকে তথ্য, সময়, নিরাপত্তা ও বিকল্প দেয়।

২. ম্যানিপুলেশন স্বাধীনতা সংকুচিত করে: ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ বা নির্ভরতা ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।

৩. সহায়তা “না” গ্রহণ করে: মতভেদ হলেও সম্পর্কের মর্যাদা বজায় রাখে।

৪. ম্যানিপুলেশন “না”কে সমস্যা মনে করে: যতক্ষণ না কাঙ্ক্ষিত উত্তর পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ নতুন আবেগগত চাপ তৈরি করে।

সব ম্যানিপুলেশন সচেতন পরিকল্পনা থেকে আসে না। মানুষ কখনো পরিবার ও সমাজ থেকে শেখা কৌশল অচেতনভাবে পুনরাবৃত্তি করেন। তবু উদ্দেশ্য অচেতন হলেই ক্ষতি অদৃশ্য হয়ে যায় না।

আমরা নিজেরাও কি মানুষের ব্যক্তিচিত্র তৈরি করি?

বড় কোম্পানি ও রাষ্ট্র নিয়ে কথা বলা সহজ। নিজের দিকে তাকানো কঠিন।

আমরাও মানুষের ব্যক্তিচিত্র তৈরি করি। কে সহজে রাজি হন, কার আত্মসম্মান কোথায়, কার সঙ্গে কী ভাষায় কথা বললে সুবিধা হবে, কাকে কতটুকু সত্য বলা দরকার এবং কার সামনে কোন মুখটি দেখাতে হবে, এসব আমরা শিখি।

একজন শিক্ষক জানেন, কোন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে ভয় পান। একজন ব্যবস্থাপক জানেন, কোন কর্মী চাকরি হারানোর ভয়ে প্রতিবাদ করবেন না। পরিবারের কেউ জানেন, কার মধ্যে লোকলজ্জার ভয় বেশি। সম্পর্কের একজন জানেন, অন্যজন পরিত্যক্ত হওয়ার ভয় বহন করেন।

এই জ্ঞান দায়িত্ব তৈরি করে। অধিকার নয়।

দুর্বলতা জানার পর সেই মানুষকে আরও নিরাপদ করা যায়। আবার একই দুর্বলতা ব্যবহার করে তাকে আরও নির্ভরশীলও করা যায়।

তাই প্রশ্ন শুধু কে আমাদের ব্যক্তিচিত্র তৈরি করছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কাদের মানসিক ব্যক্তিচিত্র তৈরি করেছি এবং সেই জ্ঞান দিয়ে কী করছি?

মানুষের দুর্বলতা জানা আপনাকে শক্তিশালী করতে পারে। সেই শক্তি কীভাবে ব্যবহার করেন, সেটিই আপনার নৈতিক ব্যক্তিচিত্র তৈরি করে।

প্রোফাইলিংয়ের নৈতিক পরীক্ষা

প্রোফাইলিং নিজে সম্পূর্ণ ভালো বা সম্পূর্ণ অন্ধকার নয়। একই প্রক্রিয়া প্রতারণা শনাক্ত করতে পারে, উপযোগী সেবা দিতে পারে, চিকিৎসায় ঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করতে পারে কিংবা নিরাপত্তা পরিকল্পনায় সহায়তা করতে পারে।

আবার একই প্রক্রিয়া বৈষম্য, গোপন নজরদারি, রাজনৈতিক দমন, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত ম্যানিপুলেশনে ব্যবহৃত হতে পারে।

পার্থক্য বোঝার জন্য কয়েকটি প্রশ্ন করা যায়:

১. সংশ্লিষ্ট মানুষটি জানেন কি তার তথ্য সংগ্রহ বা আচরণ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে?

২. তথ্যটি যে উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা হচ্ছে কি?

৩. প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে কি?

৪. ব্যক্তিচিত্র ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ আছে কি?

৫. ব্যক্তিচিত্র ব্যবহার করে কারও অধিকার, সুযোগ বা স্বাধীনতা সীমিত করা হচ্ছে কি?

৬. মানুষটি চাপ, ভয় ও অপরাধবোধ ছাড়া “না” বলতে পারেন কি?

প্রোফাইলিংয়ের অন্ধকার দিক প্রযুক্তির ভেতরে একা থাকে না। সেটি থাকে ক্ষমতার অসমতায়। ব্যক্তিচিত্র নির্মাতা জানেন তিনি কী দেখছেন এবং কী অনুমান করছেন। কিন্তু যার ব্যক্তিচিত্র তৈরি হচ্ছে, তিনি হয়তো জানেনই না কোন অদৃশ্য সংস্করণটি তার হয়ে সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছে।

মানুষ ব্যক্তিচিত্রের চেয়ে বড়

প্রোফাইলিং শুধু নাম, ঠিকানা, পরিচয়, ভালোলাগা, মন্দলাগা, ভোক্তার ধরন এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততায় সীমাবদ্ধ নয়। এর বিবেচ্য উপাদান আরও বিস্তৃত হতে পারে।

মানুষ কখন কথা বলেন, কখন নীরব হন, কোন প্রশ্ন এড়িয়ে যান, কোথায় যান, কী কিনতে চান, কাকে বিশ্বাস করেন, কোন প্রশংসায় নরম হন এবং কোন ভয় তার সিদ্ধান্তকে বদলে দেয়, এসব একত্র হলে একটি শক্তিশালী মানচিত্র তৈরি হতে পারে।

কিন্তু মানচিত্র ভূমি নয়। ব্যক্তিচিত্র মানুষ নয়।

ব্যক্তিচিত্র অতীতের আচরণধারা ধরে। মানুষ নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ব্যক্তিচিত্র সম্ভাবনা অনুমান করে। মানুষ সেই সম্ভাবনার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন। ব্যক্তিচিত্র দুর্বলতা শনাক্ত করে। মানুষ সেই দুর্বলতার সঙ্গে বেঁচেও স্বাধীন থাকতে পারেন।

একজন মানুষকে বোঝার চেষ্টা এবং তাকে ব্যবহার করার চেষ্টা একই পর্যবেক্ষণ দিয়ে শুরু হতে পারে। পার্থক্যটি বোঝা যায় তখন, যখন মানুষটি “না” বলেন। আপনি কি তার স্বাধীনতা সম্মান করেন, নাকি তার মানসিক ব্যক্তিচিত্র ব্যবহার করে সেই “না” বদলে দিতে চান?

নৈতিকতা বিবর্জিত প্রোফাইলিং করতে দেওয়া এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কেও কারও মানসিক মানচিত্র তৈরি করে দুর্বলতা ব্যবহার করা, দুটো বিষয়েই আমাদের সোচ্চার থাকা জরুরি।

প্রতিষ্ঠান যেন আমাদের অজ্ঞাতে ব্যক্তিচিত্র তৈরি করে অধিকার সীমিত করতে না পারে। একই সঙ্গে আমরা যেন বোঝাপড়ার নামে অন্য মানুষের ভয়, আস্থা, কষ্ট ও নিরাপত্তাহীনতাকে নিজেদের ক্ষমতায় পরিণত না করি।

কারণ আপনার হাতে থাকা অন্য মানুষের মানচিত্রটি শেষ পর্যন্ত তার চেয়ে বেশি আপনার পরিচয় প্রকাশ করে।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

১. European Union। “General Data Protection Regulation, Article 4: Definitions.” ব্যক্তিগত তথ্য, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং স্বয়ংক্রিয় প্রোফাইলিংয়ের সংজ্ঞা। GDPR Article 4

২. European Union। “GDPR Recital 71: Profiling and Automated Decision-Making.” গুরুত্বপূর্ণ স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তে মানবীয় পর্যালোচনা, ব্যাখ্যা চাওয়ার অধিকার, আপত্তির সুযোগ এবং বৈষম্য প্রতিরোধের সুরক্ষাব্যবস্থা। GDPR Recital 71

৩. Federal Trade Commission। “FTC Takes Action Against Mobilewalla for Collecting and Selling Sensitive Location Data.” বিজ্ঞাপন নিলাম ও তৃতীয় পক্ষের উৎস থেকে সংবেদনশীল অবস্থানতথ্য সংগ্রহ ও বিক্রির অভিযোগ, ৩ ডিসেম্বর ২০২৪। Federal Trade Commission

৪. Federal Trade Commission। “FTC Order Prohibits Data Broker X-Mode Social and Outlogic from Selling Sensitive Location Data.” সম্মতি ছাড়া সুনির্দিষ্ট অবস্থানতথ্য বিক্রি এবং সংবেদনশীল স্থান শনাক্তের ঝুঁকি, ৯ জানুয়ারি ২০২৪। Federal Trade Commission

৫. United Nations Office of the High Commissioner for Human Rights। “Human Rights Violations and Abuses Related to the Protests of July and August 2024 in Bangladesh.” আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার ভূমিকা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে স্বাধীন অনুসন্ধান প্রতিবেদন, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। OHCHR

৬. Al-Rodhan, Nayef। “Behavioral Profiling and the Biometrics of Intent.” আচরণ ও শারীরিক সংকেত থেকে ক্ষতিকর উদ্দেশ্য অনুমানের প্রযুক্তি, সীমাবদ্ধতা এবং ভুলভাবে উদ্দেশ্য পড়ার নৈতিক ঝুঁকি। Harvard International Review

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান মোঃ মেহেদি হাসান (কলম নাম: মি. বিকেল)—লেখক, ব্লগার, শিক্ষক এবং ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। • শিক্ষা: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। • প্রকাশনা: প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে’ (রকমারি.কম-এ উপলব্ধ)। • অন্যান্য: ‘দ্য ব্যাকস্পেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০২৩ থেকে মাইক্রোসফট ডেভেলপার প্রোগ্রামে যুক্ত। যেকোনো প্রশ্ন বা যৌথ কাজের আগ্রহে যোগাযোগ করুন: admin@oviyatri.com অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!