আমরা চাইলেই কি সব বদলাতে পারি?
জন্ম, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হলে ব্যক্তিগত চেষ্টা কতটা জীবন বদলায়? স্বাধীনতা, নিয়তি ও স্টোয়িক দর্শনের বিশ্লেষণ।
জীবন, স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রণের সীমা
আমরা চাইলেই কি সব বদলাতে পারি? অসম জীবনে স্বাধীনতার সীমা কোথায়
মানুষের জীবনে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও পরিশ্রমের গুরুত্ব আছে। কিন্তু আমরা কোথায় জন্ম নেব, কী ধরনের পরিবার ও শৈশব পাব কিংবা নিজের জীবন শুরু করার আগেই কতটা দায় বহন করব, তার কতটুকু সত্যিই আমাদের হাতে?
আমরা প্রায়ই এমনভাবে জীবনকে দেখি, যেন পৃথিবী আমাদের কেন্দ্র করেই ঘুরছে। চারপাশের সব আয়োজন বুঝি আমাকে ঘিরেই চলছে। আমিই প্রধান চরিত্র। আমি যথেষ্ট চেষ্টা করলেই সব পরিবর্তন করতে পারব।
কথাটি শুনতে শক্তিশালী, বিশেষ করে মোটিভেশনাল বক্তৃতার মঞ্চে। কিন্তু বাস্তব জীবন মঞ্চের আলোয় চলে না।
আমরা জন্ম নিই অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে। জীবনের কিছু বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, কিছু বিষয়ে আমরা সীমিত প্রভাব ফেলতে পারি, আর কিছু বিষয় আমাদের ক্ষমতার প্রায় সম্পূর্ণ বাইরে থাকে। সমস্যা হলো, আমরা প্রায়ই এই তিন স্তরকে এক করে ফেলি। তারপর যা কখনোই আমাদের হাতে ছিল না, তার দায়ও নিজের ওপর চাপাই।
জন্মের সঙ্গে পাওয়া বাক্স
আমাদের বাবা-মা, জন্মপরিবার, আত্মীয়তার পরিসর, জন্মস্থান, বংশগত বৈশিষ্ট্য, শারীরিক গঠন, ত্বক ও চোখের স্বাভাবিক রং এবং শৈশবের আর্থসামাজিক পরিবেশ আমরা নিজেরা নির্বাচন করি না। আমাদের নাম, ধর্মীয় পরিচয় ও বসবাসের স্থানও সাধারণত জন্মের পর অন্যদের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয়।
এই তালিকার সবকিছু অবশ্য আজীবন অপরিবর্তনীয় নয়। কেউ নাম বদলাতে পারেন, বিশ্বাস পুনর্বিবেচনা করতে পারেন, অন্য জায়গায় বসবাস শুরু করতে পারেন কিংবা আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারেন। চিকিৎসা, শিক্ষা ও প্রযুক্তির সহায়তায় শারীরিক জীবনের কিছু দিকও পরিবর্তন করা সম্ভব।
কিন্তু তিনি কোন পরিবারে জন্ম নিয়েছেন, কী ধরনের শৈশব পেয়েছেন, কোন সুযোগগুলো তাঁর নাগালের বাইরে ছিল কিংবা জীবনের প্রথম দুই দশক কীভাবে কেটেছে, সেই ইতিহাস বদলানো যায় না।
এখানেই “জন্মের সময় প্রদত্ত” এবং “চিরকাল অপরিবর্তনীয়” কথার পার্থক্য। কোনো পরিচয় পরে বদলানো সম্ভব হলেই তার আগের সামাজিক প্রভাব মুছে যায় না। আবার কোনো সীমাবদ্ধতা পুরোপুরি দূর করা না গেলেও তার প্রভাব কিছুটা কমানো অসম্ভব নয়।
ত্বকের রঙের কথাই ধরা যাক। আপনি নিজের স্বাভাবিক ত্বকের রং নির্বাচন করে জন্ম নেননি। অথচ সেই রঙের ভিত্তিতেই অন্য মানুষ আপনার সৌন্দর্য, যোগ্যতা কিংবা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বিচার করতে পারে। কোনো প্রসাধনী সামাজিক বর্ণবৈষম্যের সমস্যাটি সমাধান করতে পারে না। বরং ফর্সা হওয়ার সামাজিক চাপ মানুষকে এমন পণ্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার কিছু উপাদান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মূল সমস্যা তাই শুধু ত্বকের রং নয়; সেই রঙের ওপর সমাজ যে মূল্য আরোপ করে, সেটিও।
সবার শুরুর রেখা এক নয়
কেউ জন্মের পর পারিবারিক সম্পদ, নিরাপদ বাড়ি, ভালো শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগের সুবিধা পান। কারও আগের দুই প্রজন্ম সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য জমি, সঞ্চয়, ব্যবসা, বাড়ি অথবা ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি করে যান।
অন্য কেউ পড়াশোনা শেষ করে হাতে পান কয়েকটি সনদ, সামান্য জমি এবং কয়েক লাখ টাকার পারিবারিক ঋণ। কারও ওপর ঋণের পাশাপাশি পরিবারের চিকিৎসা, ছোট ভাইবোনের পড়াশোনা কিংবা দৈনন্দিন ব্যয়ের দায়িত্ব এসে পড়ে।
প্রথম ব্যক্তিকে ঘৃণা করা ন্যায্য নয়। তিনি জন্মের আগে বসে তাঁর পরিবারের সম্পদের হিসাব তৈরি করেননি। সুবিধা পাওয়া কোনো অপরাধও নয়। কিন্তু সেই সুবিধাকে শুধু নিজের যোগ্যতার ফল মনে করা এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পিছিয়ে থাকাকে অলসতা বা অযোগ্যতা বলে ব্যাখ্যা করা সমস্যাজনক।
ঈর্ষা মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি হতে পারে। তবে ঈর্ষাকে ঘৃণায় পরিণত না করে অসম শুরুর বাস্তবতা বুঝতে ব্যবহার করাই সম্ভবত বেশি সৎ।
ধরুন, পড়াশোনা শেষ করার পর আপনার হাতে তিন কাঠা গ্রামীণ জমি, কিছু শিক্ষাগত সনদ এবং পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার ঋণ রইল। জমির দাম জায়গা, জমির শ্রেণি, রাস্তা, যোগাযোগব্যবস্থা ও স্থানীয় বাজারভেদে বদলাবে। সেটি বিক্রি করেও হয়তো পুরো ঋণ শোধ হবে না। আর জমিটি যদি পরিবারের শেষ নিরাপত্তা হয়, তবে বিক্রি করাই সব সময় বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত হবে না।
প্রশ্ন হলো, এই অবস্থায় আপনি কীভাবে শুরু করবেন?
মোটিভেশনাল উত্তর বনাম বাস্তব হিসাব
তথাকথিত মোটিভেশনাল বক্তা হয়তো বলবেন, “শুরু করে দিন। ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়।”
কিন্তু আপনার বাড়িতে পাওনাদার কড়া নাড়ছেন। কখনো ভুলভাল কথাও বলছেন। পরিবারের বাজার করতে হবে। চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ আছে। চাকরি খোঁজার সময়ও খাবার, পোশাক, আবেদন, যাতায়াত ও যোগাযোগে অর্থ লাগে। আর বাংলাদেশের বাস্তবতায় শিক্ষা, অঞ্চল, পারিবারিক প্রত্যাশা ও সামাজিক মর্যাদাবোধের কারণে সব ধরনের কাজ সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্তও থাকে না।
তবু জীবন থেমে থাকে না। প্রয়োজনও অপেক্ষা করে না।
ধরে নিই, কোনোভাবে আপনি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বেতনের একটি চাকরি পেলেন। প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা ঋণ পরিশোধ করতে পারলেন। সুদ না থাকলেও ৫ লাখ টাকা শোধ করতে ৫০ মাস, অর্থাৎ ৪ বছর ২ মাস লাগবে। ৬ লাখ টাকা হলে লাগবে ৬০ মাস বা ৫ বছর।
এই হিসাবে ঋণের কোনো সুদ নেই, চাকরি টিকে থাকবে, বেতন নিয়মিত পাওয়া যাবে, নতুন ঋণ হবে না এবং বড় কোনো চিকিৎসা বা পারিবারিক জরুরি ব্যয় আসবে না বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। বাস্তবে প্রতি মাসে নিয়মিত ১০ হাজার টাকা আলাদা রাখা সম্ভব না হলে সময় আরও বাড়বে।
এটি সর্বনিম্ন তাত্ত্বিক হিসাব
বাকি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় একটি পরিবার চালানো কাগজে সম্ভব মনে হতে পারে। কিন্তু বাড়িভাড়া, খাদ্য, যাতায়াত, চিকিৎসা, পোশাক, সামাজিক দায়িত্ব ও আকস্মিক ব্যয় যোগ হলে হিসাব আর কাগজের মতো থাকে না।
বাস্তব জীবন সাধারণত এত অনুগত নয়।
একই বয়স মানেই একই সময় নয়
সর্বোচ্চ অনুকূল হিসাবেও ঋণমুক্ত হতে আপনার চার থেকে পাঁচ বছর চলে গেল। আপনি এই সময়েও বেঁচেছেন, কাজ করেছেন, পরিবার চালিয়েছেন এবং দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই এটিকে “প্রকৃত জীবন নয়” বলা ঠিক হবে না। কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণে স্বাধীনভাবে অর্থ ও সময় ব্যয় করার সুযোগটি হয়তো আপনার চার-পাঁচ বছর পরে এসেছে।
এদিকে পারিবারিক সহায়তা পাওয়া আপনার সহকর্মী একই পাঁচ বছরে সঞ্চয় করেছেন, নতুন দক্ষতা শিখেছেন, উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, বাড়ির অগ্রিম দিয়েছেন কিংবা ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। তিনি পাঁচ বছর কাজ করেছেন ভবিষ্যৎ তৈরির জন্য। আপনি একই পাঁচ বছর কাজ করেছেন অতীতের দায় শোধ করতে।
দুজনেই পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু একই পরিমাণ পরিশ্রম তাঁদের একই জায়গায় নিয়ে যায়নি।
পাঁচ বছরের ব্যবধান শুধু পাঁচ বছরের বেতন নয়। এটি সম্ভাব্য সঞ্চয়, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ, সামাজিক যোগাযোগ এবং ভুল করে আবার শুরু করার সুযোগের ব্যবধান। একজন ঝুঁকি নিয়ে নতুন চাকরিতে যেতে পারেন, কারণ কয়েক মাস বেকার থাকলেও তাঁর পরিবার পাশে থাকবে। অন্যজন একটি খারাপ চাকরিও ছাড়তে পারেন না, কারণ পরের মাসের কিস্তি অপেক্ষা করবে না।
তাই কেবল বয়স দেখে মানুষের অগ্রগতি তুলনা করা বিভ্রান্তিকর। দুজনের বয়স একই হতে পারে। কিন্তু জীবন গুছিয়ে নেওয়ার মতো সময় তাঁরা সমান পাননি।
তারপর বিয়ের বয়স নিয়ে সমাজের তাড়া তো আছেই। অথচ বিয়েটাও যদি নিজেকেই শুরু থেকে আয়োজন করতে হয়, তবে “সময় হয়ে গেছে” বলা লোকগুলো সাধারণত বাজেটের অংশ নেয় না।
আমার কথা শুধু অর্থ নিয়ে নয়
এই প্রবন্ধের বিষয় কেবল আর্থিক সংকট নয়। অর্থের উদাহরণটি ব্যবহার করেছি একটি বড় সত্য বোঝাতে:
আমরা চাইলেই সব পরিবর্তন করতে পারি না।
আমরা প্রত্যেকে কিছু প্রদত্ত শর্ত নিয়ে পৃথিবীতে আসি। সেই শর্তগুলোর কিছু পরিবর্তনযোগ্য, কিছু আংশিকভাবে প্রভাবিত করা যায়, আর কিছু আমাদের জীবনের ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে থাকে। এসবের সবকিছু আমাদের বর্তমান কর্মের ফল নয়।
এখানে “কর্মফল” বলতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের জন্মান্তরভিত্তিক তত্ত্ব বোঝাচ্ছি না। আমি বলছি সেই প্রচলিত সামাজিক ধারণার কথা, যেখানে মানুষের বর্তমান সাফল্য বা ব্যর্থতাকে প্রায় পুরোপুরি তার ব্যক্তিগত কাজ, যোগ্যতা বা চরিত্রের ফল বলে ধরে নেওয়া হয়।
“জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো” প্রবাদটি শুনতে সুন্দর। কর্মের গুরুত্ব বোঝাতেও এটি কার্যকর। কিন্তু এর একটি সীমা আছে। ভালো কর্ম জন্মগত বৈষম্যের অস্তিত্ব মুছে দেয় না।
কারও বর্তমান কর্ম কি ঠিক করে দিতে পারে তিনি কোন পরিবারে জন্ম নেবেন? জন্মের সময় তাঁর পরিবার দরিদ্র না ধনী হবে? তিনি কোন সামাজিক শ্রেণি, জাতিগত পরিচয়, বংশ কিংবা গায়ের রং নিয়ে জন্মাবেন?
নিশ্চয়ই নয়।
অথচ জন্মের অনির্বাচিত বৈশিষ্ট্যের জন্যই মানুষ বুলিংয়ের শিকার হন। জন্মসূত্রের দারিদ্র্য একজন শিশুকে ভালো বিদ্যালয়, নিরাপদ পরিবেশ, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগ থেকে দূরে রাখতে পারে। বংশ, পেশা, শ্রেণি, জাতপাত কিংবা গায়ের রং নিয়ে বিয়ে ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাছবিচার করা হয়। বিশ্বের কোনো কোনো সমাজে জন্মগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক অংশগ্রহণও সীমিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশি সমাজেও ফর্সা ত্বককে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা সৌন্দর্য ও বিয়ের প্রচলিত আলোচনায় দৃশ্যমান। এখানে আমি সেই প্রবণতার পরিমাণ মাপছি না; শুধু প্রশ্ন করছি, একজন মানুষ জন্মের আগে নিজের ত্বকের রং নির্বাচন না করেও কেন তার সামাজিক সুবিধা বা অসুবিধা বহন করবেন?
তাহলে সবকিছুকে ব্যক্তিগত কর্মের ফল বলা যায় কীভাবে?
স্বাধীন ইচ্ছা ও নিয়তির মাঝখানে
মানুষের জীবন নিয়ে দুটি বিপরীত ধারণা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে।
একটি হলো স্বাধীন ইচ্ছা বা free will, অর্থাৎ আমরা সিদ্ধান্ত ও কর্মের মাধ্যমে নিজেদের জীবন নির্মাণ করি। অন্যটি নিয়তিবাদ বা determinism, অর্থাৎ আমাদের সিদ্ধান্তসহ ঘটনাগুলো পূর্ববর্তী কারণ, পরিবেশ এবং প্রকৃতির নিয়মের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে।
কিন্তু এই দুই অবস্থানের মাঝখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক অবস্থান আছে। সামঞ্জস্যবাদ বা compatibilism অনুসারে, মানুষের কাজ পূর্ববর্তী কারণ ও পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হলেও অর্থপূর্ণ ব্যক্তিগত নির্বাচন ও নৈতিক দায় সম্ভব হতে পারে। স্বাধীনতা বলতে তখন কারণহীন সিদ্ধান্ত নয়, বরং জবরদস্তি ও বাধার অনুপস্থিতিতে নিজের কারণ, মূল্যবোধ ও ইচ্ছা অনুসারে কাজ করার সামর্থ্য বোঝানো হয়।
আমি আমার সব পরিস্থিতি নির্বাচন করি না। কিন্তু কোনো কোনো পরিস্থিতিতে কী করব, তার কিছু নির্বাচন আমার থাকে। আবার সেই নির্বাচনের পরিসরও সবার জন্য সমান নয়। ক্ষুধার্ত মানুষের “পছন্দ” এবং আর্থিকভাবে নিরাপদ মানুষের “পছন্দ” একই স্বাধীনতার প্রকাশ নয়।
অতএব স্বাধীনতা আছে কি নেই, শুধু এই প্রশ্নটিই যথেষ্ট নয়। আরও সৎ প্রশ্ন হতে পারে: কোন পরিস্থিতিতে, কতটুকু এবং কী মূল্য দিয়ে একজন মানুষ নির্বাচন করতে পারেন?
স্টোয়িক দর্শনের সীমারেখা
এই জটিলতার মধ্যে প্রাচীন স্টোয়িক দর্শন একটি ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। বিশেষত Epictetus-এর Enchiridion শুরু হয় একটি মৌলিক পার্থক্য দিয়ে: কিছু বিষয় আমাদের ওপর নির্ভরশীল, কিছু নয়।
আমাদের বিচার, আকাঙ্ক্ষা, বিরাগ ও নিজের সচেতন কর্ম আমাদের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে শরীর, সম্পদ, খ্যাতি, পদ এবং অন্য মানুষের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি আমাদের ওপর নির্ভরশীল নয়।
এখানে “নিয়ন্ত্রণ” শব্দটিও সতর্কভাবে বোঝা দরকার। Epictetus-এর বক্তব্য এমন নয় যে আমরা মনের প্রতিটি অনুভূতি মুহূর্তেই বন্ধ করতে পারি। কষ্ট, ভয়, রাগ বা অপমানের প্রাথমিক অনুভূতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসতে পারে। আমরা বুলিংয়ের শিকার হয়ে কষ্ট না পাওয়ার সুইচ টিপতে পারি না।
তবে সেই অনুভূতির পরে আমরা কী বিচার গড়ে তুলছি, কোন মূল্যবোধ ধরে রাখছি এবং কী কর্ম বেছে নিচ্ছি, সেখানে আমাদের কিছু কর্তৃত্ব থাকতে পারে।
এই “কিছু” শব্দটিই গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রহণ করা মানে অন্যায় মেনে নেওয়া নয়
ধরুন, গায়ের রং বা পারিবারিক পরিচয়ের কারণে আপনি সামাজিক অবিচারের শিকার হলেন। অন্য ব্যক্তির আচরণ আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই। সমাজের দীর্ঘদিনের বৈষম্যও আপনি একা রাতারাতি বদলে দিতে পারবেন না।
কিন্তু তাই বলে অন্যায় নীরবে সহ্য করাই স্টোয়িক অনুশীলন নয়। নিজের ভেতরের স্থিতি রক্ষা করা এবং বাইরের অন্যায় বদলানোর চেষ্টা পরস্পরের বিপরীত নয়। বরং স্থিরতা কখনো কখনো দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।
আপনি প্রতিবাদ করতে পারেন, নিরাপদ সীমা তৈরি করতে পারেন, সহায়তা চাইতে পারেন এবং সম্মিলিত পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারেন। এসব কাজের ফল আপনি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। কিন্তু চেষ্টা, সততা ও নৈতিক অবস্থান আপনার কর্মের অংশ।
অন্যের অবজ্ঞা আপনার মানবিক মূল্য নির্ধারণ করে না। কিন্তু এই সত্য জানলেই বৈষম্যের বাস্তব ক্ষতি অদৃশ্য হয়ে যায় না। আত্মসম্মান রক্ষা এবং অন্যায়ের কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা পাশাপাশি চলতে পারে।
প্রচেষ্টা আমাদের, ফলাফল পুরোপুরি নয়
পারিবারিক সমর্থনের অভাবে কর্মজীবনের শুরুতেই আপনি এমন বাধার মুখোমুখি হতে পারেন, যা আপনার সহকর্মীদের ছিল না। ফলে তাঁরা কয়েক ধাপ এগিয়ে যেতে পারেন।
এই ব্যবধান অস্বীকার করা আত্মপ্রবঞ্চনা। আবার ব্যবধানটিকে নিজের স্থায়ী পরিচয় বানিয়ে ফেলাও ক্ষতিকর।
আপনি নিজের শেখা, সততা, শৃঙ্খলা, কাজের মান এবং সিদ্ধান্তে মনোযোগ দিতে পারেন। কিন্তু পদোন্নতি, বেতন, সামাজিক স্বীকৃতি কিংবা চাকরির নিরাপত্তা শুধু আপনার শ্রমের ওপর নির্ভর করে না। প্রতিষ্ঠানের নীতি, অর্থনীতি, ব্যবস্থাপকের সিদ্ধান্ত, যোগাযোগের সুযোগ এবং আকস্মিক ঘটনাও ফল নির্ধারণ করে।
প্রচেষ্টা আমাদের হতে পারে। ফলাফল পুরোপুরি নয়।
এই বোঝাপড়া সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং ব্যর্থতার পুরো নৈতিক দায় নিজের ওপর চাপানো থেকে রক্ষা করে। একই সঙ্গে “আমার হাতে কিছুই নেই” বলে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার অজুহাতও কমায়।
Epictetus-এর দ্বিবিভাগকে আধুনিক জীবনে প্রয়োগের সুবিধার জন্য আমরা একটি তৃতীয় ব্যবহারিক স্তরও কল্পনা করতে পারি: কিছু বিষয় প্রধানত আমার ওপর নির্ভরশীল, কিছু বিষয়কে আমি প্রভাবিত করতে পারি কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, আর কিছু বিষয় আমার নির্বাচনের বাইরে। এটি Epictetus-এর সরাসরি তিন-বৃত্ত তত্ত্ব নয়; তাঁর মূল পার্থক্যের একটি আধুনিক ব্যবহারিক সম্প্রসারণ।
১. যা প্রধানত আমার ওপর নির্ভরশীল
আমার সচেতন সিদ্ধান্ত, মূল্যবোধ, শেখার চেষ্টা, সততা, কথা বলার ধরন এবং নির্বাচিত কর্ম।
২. যা আমি প্রভাবিত করতে পারি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না
সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ, সামাজিক উদ্যোগ, জনমত, পেশাগত অগ্রগতি এবং সম্মিলিত পরিবর্তন।
৩. যা আমার নির্বাচনের বাইরে
আমার জন্ম, অতীত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যের স্বাধীন সিদ্ধান্ত এবং ইতিমধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনা।
তিনটি ব্যবহারিক স্তর
প্রথম স্তরে দায়িত্ব নিতে হয়। দ্বিতীয় স্তরে চেষ্টা ও সহযোগিতা প্রয়োজন। তৃতীয় স্তরে বাস্তবতা স্বীকার করতে হয়। কিন্তু তিন ক্ষেত্রের কোনোটিতেই নিজেকে প্রতারণা করার প্রয়োজন নেই।
একটি জনপ্রিয় উক্তির সামনে দাঁড়িয়ে
“We are not given a good life or a bad life. We are given a life. It's up to us to make it good or bad.”
Ward Foley
উক্তিটি অনুপ্রেরণাদায়ী। এতে ব্যক্তিগত দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য আছে: আমাদের হাতে যতটুকু সিদ্ধান্ত থাকে, সেটুকু ব্যবহার না করার দায় অন্যের ওপর চাপানো যায় না।
কিন্তু উক্তিটির সীমাও আছে। আমরা সবাই শুধু একটি নিরপেক্ষ “জীবন” পাই না। কেউ নিরাপত্তা, শিক্ষা, সম্পদ ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে জন্ম নেন। কেউ জন্মের পর থেকেই ক্ষুধা, সহিংসতা, বৈষম্য, ঋণ বা রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। একজনের ভুল সিদ্ধান্ত সাময়িক ক্ষতি করে; অন্যজনের একই ভুল তাকে বহু বছর পিছিয়ে দিতে পারে।
তাই জীবনকে ভালো বা মন্দ করার ক্ষমতা আছে বললেই সেই ক্ষমতা সবার সমান হয়ে যায় না। ব্যক্তিগত দায়িত্ব সত্য। অসম সুযোগও সত্য। একটি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটিকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই।
আমরা চাইলেই সব পরিবর্তন করতে পারি না। এই স্বীকৃতি হতাশাবাদ নয়। বরং এটি মোটিভেশনাল অপরাধবোধ থেকে মুক্তির একটি পথ। জীবনের প্রতিটি ব্যর্থতা ব্যক্তিগত অলসতা বা চরিত্রের ত্রুটির প্রমাণ নয়।
আবার সবকিছু নিয়তি বলে ছেড়ে দেওয়াও সৎ নয়। আমাদের হাতে অতি সামান্য হলেও কিছু সিদ্ধান্ত থাকে। কখনো সেই সামান্য অংশই একটি জীবনকে পুরোপুরি নয়, কিন্তু অর্থপূর্ণভাবে বদলে দিতে পারে।
সবকিছু আমার হাতে নয়। কিন্তু যা আমার হাতে আছে, সেটুকুর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই। স্বাধীনতা হয়তো সবকিছু বদলে দেওয়ার ক্ষমতা নয়; বরং নিজের সীমা জেনেও পরবর্তী সৎ সিদ্ধান্তটি নেওয়ার সামর্থ্য।
১. প্রাথমিক দার্শনিক গ্রন্থ: Epictetus। The Enchiridion, Chapter 1। অনুবাদ: Elizabeth Carter। The Internet Classics Archive, Massachusetts Institute of Technology। গ্রন্থটি পড়ুন
২. প্রাথমিক গ্রন্থের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্করণ: Epictetus। The Enchiridion। University of Colorado Boulder। PDF সংস্করণ দেখুন
৩. দার্শনিক রেফারেন্স: McKenna, Michael and Coates, D. Justin। Compatibilism। Stanford Encyclopedia of Philosophy। https://plato.stanford.edu/entries/compatibilism/রেফারেন্সটি পড়ুন
৪. বাংলাদেশের আন্তঃপ্রজন্ম শিক্ষাগত গতিশীলতা: Olivieri, Sergio; Razzu, Giovanni; and Wambile, Ayago। Converging Paths: Intergenerational Educational Mobility and the Decline of Gender and Geographic Gaps in Bangladesh। World Bank Policy Research Working Paper 11386, 19 May 2026। গবেষণাটি পড়ুন
৫. ত্বক ফর্সাকারী পণ্যের জনস্বাস্থ্যঝুঁকি: World Health Organization। Elimination of Mercury-containing Skin-lightening Products। WHO-এর তথ্য দেখুন
৬. ত্বক ফর্সাকরণের সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রেক্ষাপট: International League of Dermatological Societies। Movement for Safe Skin: Challenging Harmful Skin-lightening Practices। প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য দেখুন
৭. উদ্ধৃতির attribution: Foley, Ward। “We are not given a good life or a bad life. We are given a life. It's up to us to make it good or bad.” Ward Foley-এর লেখক-পরিচিতি ও AMC Support memorial-এ উক্তিটি তাঁর নামে নথিভুক্ত। উক্তিটির প্রথম প্রকাশের মূল বই বা বক্তৃতা এখনো শনাক্ত করা যায়নি। লেখক-পরিচিতি দেখুন
সবকিছু নয়, পরবর্তী সৎ সিদ্ধান্তটি
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0