সংস্কৃতি কি শুধু উত্তরাধিকার, নাকি পরিচয় ও ক্ষমতার নির্মাণ?

ভাষা, পোশাক, শ্রেণি, গণমাধ্যম ও ক্ষমতা কীভাবে সংস্কৃতি ও পরিচয় নির্মাণ করে? জানুন Cultural Studies-এর ইতিহাস, ধারণা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ৩
সংস্কৃতি কি শুধু উত্তরাধিকার, নাকি পরিচয় ও ক্ষমতার নির্মাণ?
বই ও নোটবুকের সামনে বসা একজন চিন্তাশীল বাঙালি মানুষ, পেছনে ঐতিহ্য, আধুনিক নগরজীবন, গণমাধ্যম ও জনসমাবেশের দৃশ্য এবং শিরোনাম ‘সংস্কৃতি কি শুধু উত্তরাধিকার, নাকি পরিচয় ও ক্ষমতার নির্মাণ?

দর্শন | সংস্কৃতি অধ্যয়ন

ভাষা, পোশাক ও দৈনন্দিন জীবনের ভেতর সংস্কৃতি কীভাবে আমাদের তৈরি করে?

সংস্কৃতি শুধু পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া উত্তরাধিকার নয়। এটি পরিচয়, অর্থ, ক্ষমতা, প্রতিনিধিত্ব ও পরিবর্তনেরও একটি চলমান ক্ষেত্র।

প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে, সংস্কৃতি বলতে কী বোঝায়। এর পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা খুব সহজে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ সংস্কৃতি শুধু গান, সাহিত্য, পোশাক কিংবা ধর্মীয় আচারের নাম নয়। আমরা কীভাবে কথা বলি, কী খাই, কী পরি, কী বিশ্বাস করি, কোন আচরণকে স্বাভাবিক মনে করি এবং অন্য মানুষের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক তৈরি করি, এসবও সংস্কৃতির অংশ।

বুঝতে সুবিধা হলে নিজেকেই উদাহরণ হিসেবে আনা যায়। আমি একজন মানুষ। বাংলায় কথা বলি। ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলমান। কখনো জিনস ও শার্ট পরি, আবার প্রয়োজন হলে কোট-টাইও পরি। আমি একজন বাঙালি লেখক। লেখার মাধ্যমে মানুষের কাছে নিজের ভাবনা পৌঁছে দিই। সাহিত্য, শিল্প, দর্শন, সামাজিক আচরণ ও নৈতিকতা সম্পর্কে আমার কিছু বিশ্বাস রয়েছে।

কিন্তু এগুলোর কোনো একটি বিষয় একাই আমার সংস্কৃতি নয়। ভাষা, ধর্ম, শিক্ষা, শ্রেণি, পেশা, অঞ্চল, পোশাক, পারিবারিক অভ্যাস, গণমাধ্যম ও ব্যক্তিগত পছন্দ মিলিয়ে আমার সাংস্কৃতিক অবস্থান তৈরি হয়। সেটিও স্থির নয়। সময়, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে বদলায়।

মূল ধারণা

সংস্কৃতি একটি বিস্তৃত ধারণা। এর ভেতরে জীবনযাপন, ভাষা, মূল্যবোধ, পরিচয়, শ্রেণি, ক্ষমতা, প্রতিনিধিত্ব, গ্রহণ, প্রত্যাখ্যান ও প্রতিরোধের অসংখ্য সম্পর্ক অন্তর্ভুক্ত।

সংস্কৃতি অধ্যয়ন আসলে কী দেখে?

সংস্কৃতি অধ্যয়ন বা Cultural Studies শুধু “একটি জাতির সংস্কৃতি কেমন” এই প্রশ্ন করে না। এটি আরও কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে।

১. কোন আচরণকে স্বাভাবিক বলা হচ্ছে?

২. সেই স্বাভাবিকতার সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করছে?

৩. কোন সংস্কৃতিকে মর্যাদাপূর্ণ এবং কোনটিকে নিম্নমানের বলা হচ্ছে?

৪. গণমাধ্যম কার কণ্ঠকে সামনে আনে এবং কাকে নীরব রাখে?

৫. শ্রেণি, লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয়, ধর্ম ও অঞ্চল মানুষের সাংস্কৃতিক অবস্থানকে কীভাবে প্রভাবিত করে?

৬. মানুষ কি কেবল সংস্কৃতি গ্রহণ করে, নাকি নিজেরাও নতুন অর্থ ও সাংস্কৃতিক রূপ তৈরি করে?

অর্থাৎ সংস্কৃতি অধ্যয়ন সাংস্কৃতিক বস্তুর তালিকা তৈরি করেই থেমে থাকে না। এটি সংস্কৃতির সঙ্গে ক্ষমতা, প্রতিনিধিত্ব, পরিচয়, অর্থ, প্রতিরোধ ও সামাজিক বৈষম্যের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে।

সংস্কৃতি শুধু উত্তরাধিকার নয়

আমরা প্রায়ই সংস্কৃতিকে পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া একটি সম্পত্তির মতো ভাবি। এই ভাবনায় কিছু সত্য আছে। ভাষা, উৎসব, খাদ্য, পারিবারিক রীতি ও ঐতিহাসিক স্মৃতি উত্তরাধিকার হিসেবেই আসে।

কিন্তু মানুষ সেই উত্তরাধিকার অপরিবর্তিতভাবে বহন করে না। নতুন সময়, প্রযুক্তি, অভিবাসন, শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তার নতুন অর্থ তৈরি করে।

আমি শার্ট পরি না টি-শার্ট পরি, সেটি নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ মনে হতে পারে। কিন্তু পোশাকের মধ্যেও শ্রেণি, পেশা, লিঙ্গ, বাজার, ধর্মীয় বোধ, আধুনিকতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ধারণা কাজ করে। সংস্কৃতি অধ্যয়ন এসব দৈনন্দিন বিষয়কেও বিশ্লেষণের উপযুক্ত বলে মনে করে।

সংস্কৃতি অধ্যয়নের জন্ম কি একটি নির্দিষ্ট বছরে?

আমার মূল লেখায় বলা হয়েছিল, ১৯৫০ সালে ব্রিটেনে Cultural Studies প্রথম সামনে আসে এবং ১৯৬০ সালে পরিচিতি লাভ করে। কথাটি অতিরিক্ত নির্দিষ্ট ছিল। একটি তত্ত্ব বা গবেষণাক্ষেত্র সচরাচর এক বছরে হঠাৎ জন্ম নেয় না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ব্রিটেনে সাহিত্যসমালোচনা, প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা, শ্রমজীবী মানুষের জীবন, গণমাধ্যম ও জনপ্রিয় সংস্কৃতি নিয়ে বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়ে British Cultural Studies-এর বৌদ্ধিক ভিত্তি তৈরি হয়। এই নিবন্ধে মূলত সেই ব্রিটিশ ধারাটিকেই কেন্দ্র করে আলোচনা করা হচ্ছে। এটি সংস্কৃতি বিশ্লেষণের সব বৈশ্বিক ধারার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নয়।

Richard Hoggart-এর The Uses of Literacy ১৯৫৭ সালে, Raymond Williams-এর Culture and Society ১৯৫৮ সালে এবং E. P. Thompson-এর The Making of the English Working Class ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয়। Stuart Hall ও Paddy Whannel-এর The Popular Arts প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে। এসব কাজের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও এগুলো ব্রিটিশ সংস্কৃতি অধ্যয়নের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ।

পরবর্তী সময়ে Stuart Hall এই বৌদ্ধিক ধারাকে Marxism, structuralism, ideology, hegemony, race, media ও representation-এর আলোচনার সঙ্গে আরও বিস্তৃত করেন।

সংশোধিত সিদ্ধান্ত: ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে যুদ্ধোত্তর ব্রিটেনের কয়েকটি বৌদ্ধিক ও সামাজিক ধারার সংযোগে সংস্কৃতি অধ্যয়ন একটি স্বীকৃত কিন্তু শৃঙ্খলাসীমা-অতিক্রমী গবেষণাক্ষেত্র হিসেবে গড়ে ওঠে।

Birmingham Centre কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?

আমার পুরোনো লেখায় বলা হয়েছিল, ১৯৬৪ সালে Stuart Hall University of Birmingham-এ Centre for Contemporary Cultural Studies প্রতিষ্ঠা করেন। এটি সঠিক নয়।

১৯৬৪ সালে Richard Hoggart University of Birmingham-এ Centre for Contemporary Cultural Studies বা CCCS প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রথম পরিচালক হন। Stuart Hall শুরুতে তাঁর সহযোগী হিসেবে কেন্দ্রে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে Hoggart চলে যাওয়ার পর Hall পরিচালক হন এবং ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

CCCS জনপ্রিয় সংস্কৃতি, দৈনন্দিন জীবন, গণমাধ্যম, শ্রেণি, জাতিগত পরিচয় ও ক্ষমতার সম্পর্ককে একাডেমিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। আগে যেখানে তথাকথিত “উচ্চ সংস্কৃতি” বেশি গুরুত্ব পেত, সেখানে Birmingham School চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, যুব-উপসংস্কৃতি, পত্রিকা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসকেও গবেষণার যোগ্য করে তোলে।

এটি কেন শৃঙ্খলাসীমা-অতিক্রমী?

সংস্কৃতি অধ্যয়ন একক কোনো পদ্ধতি বা প্রতিষ্ঠিত সীমানায় আবদ্ধ নয়। এটি সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, গণমাধ্যম ও যোগাযোগ, রাজনীতি, অর্থনীতি, ভূগোল, লিঙ্গ অধ্যয়ন এবং চলচ্চিত্র অধ্যয়ন থেকে প্রশ্ন ও গবেষণাপদ্ধতি গ্রহণ করে।

“Cultural studies is a tendency across disciplines, rather than a discipline itself.”

Toby Miller

Toby Miller-এর ব্যাখ্যায় সংস্কৃতি অধ্যয়ন ব্যক্তিসত্তা কীভাবে গঠিত হয় এবং ক্ষমতার বিভিন্ন বিন্যাসের মধ্যে মানুষ কীভাবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থান অনুভব করে, সে প্রশ্ন নিয়ে কাজ করে।

তাই একে interdisciplinary বা শৃঙ্খলাসীমা-অতিক্রমী বলা যথার্থ। তবে “এর কোনো নিয়ম নেই” অর্থে undisciplined বলা বিভ্রান্তিকর। এর একটিমাত্র বাধ্যতামূলক পদ্ধতি নেই, কিন্তু প্রমাণ, যুক্তি ও গবেষণার দায় অবশ্যই আছে।

নৃবিজ্ঞান কি শুধু মানবদেহ নিয়ে কাজ করে?

মূল লেখায় বলা হয়েছিল, anthropology মানুষের গঠন বা মানবদেহ নিয়ে কাজ করে। এটি নৃবিজ্ঞানের খুব সীমিত ব্যাখ্যা।

Biological anthropology মানুষের জৈবিক বিবর্তন, বৈচিত্র্য ও অভিযোজন নিয়ে কাজ করে। অন্যদিকে cultural বা social anthropology মানুষের সামাজিক জীবন, বিশ্বাস, আত্মীয়তা, প্রতিষ্ঠান, অর্থ তৈরি ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে। ভাষা ও অতীতের বস্তুগত নিদর্শন নিয়েও নৃবিজ্ঞানের স্বতন্ত্র শাখা কাজ করে।

সংস্কৃতি অধ্যয়ন যখন নৃবিজ্ঞান থেকে পদ্ধতি গ্রহণ করে, তখন মানুষের জীবিত অভিজ্ঞতা, সামাজিক আচরণ, পরিচয় এবং দৈনন্দিন জীবনের পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

গণমাধ্যমকে ভেঙে দেখার প্রয়োজন কেন?

মিডিয়া বা গণমাধ্যম বললে শুধু একটি যন্ত্র বোঝায় না। টেলিভিশনের মধ্যেই সংবাদ, নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপন, টক শো, খেলাধুলা, রাজনীতি, অর্থনীতি ও বিনোদনের আলাদা ধরন রয়েছে।

কিন্তু সংস্কৃতি অধ্যয়ন শুধু এগুলোর তালিকা করে না। এটি প্রশ্ন করে, সংবাদ কোন ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে, বিজ্ঞাপন আমাদের আকাঙ্ক্ষা কীভাবে নির্মাণ করে, চলচ্চিত্রে কাদের জীবন স্বাভাবিক বলে দেখানো হয় এবং দর্শক একই বার্তা একইভাবে গ্রহণ করেন কি না।

ধরুন, অভিনেতা Salman Shah-এর ভক্ত কেউ হতে পারেন, আবার নাও হতে পারেন। তাঁকে ঘিরে পোশাক, তারুণ্য, তারকা-সংস্কৃতি ও রোমান্টিক নায়কের যে জনপ্রিয় স্মৃতি তৈরি হয়েছে, সেটিও Film Studies-এর আলোচ্য হতে পারে। এখানে লক্ষ্য হবে তাঁর প্রভাব সম্পর্কে আগেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া নয়; বরং চলচ্চিত্র ও দর্শক কীভাবে সাংস্কৃতিক অর্থ তৈরি করে, তা অনুসন্ধান করা।

Marxism কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সংস্কৃতি অধ্যয়নের ইতিহাসে Marxism গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শ্রেণি, উৎপাদন, শ্রম, মতাদর্শ ও ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণের ভাষা দিয়েছে। কিন্তু সংস্কৃতি অধ্যয়ন শুধু অর্থনীতি দিয়ে সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করেনি।

Stuart Hall সংস্কৃতিকে অর্থনীতির নিছক প্রতিফলন হিসেবে দেখেননি। তাঁর আলোচনায় সংস্কৃতি এমন একটি সক্রিয় ক্ষেত্র, যেখানে ক্ষমতা সম্মতি তৈরি করে, মতাদর্শ কাজ করে এবং মানুষ প্রচলিত অর্থ গ্রহণের পাশাপাশি তার সঙ্গে দর-কষাকষি বা প্রতিরোধও করতে পারে।

শ্রেণিভেদ মানুষের জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক সুযোগে পার্থক্য তৈরি করে। কিন্তু মানুষের সাংস্কৃতিক অবস্থান শুধু শ্রেণি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয়, ধর্ম, অঞ্চল, ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত agency বা সক্রিয় ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।

Frankfurt School-এর সংযোগ

সংস্কৃতি অধ্যয়ন বুঝতে Frankfurt School সম্পর্কে জানা সহায়ক, কিন্তু Frankfurt School ও Birmingham Cultural Studies একই প্রতিষ্ঠান বা অভিন্ন তাত্ত্বিক ধারা নয়।

Frankfurt School বলতে মূলত জার্মানির Institute for Social Research-এর সঙ্গে যুক্ত Critical Theory-এর ধারাকে বোঝানো হয়। Max Horkheimer, Theodor W. Adorno, Herbert Marcuse ও Erich Fromm এই ধারার গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক। Walter Benjamin প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত সদস্য না হলেও এর বিস্তৃত বৌদ্ধিক পরিসর ও সংশ্লিষ্ট চিন্তকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

পুরোনো লেখায় Max Horkheimer-এর নাম ভুলভাবে “Max Hochheimer” লেখা হয়েছিল।

Adorno ও Horkheimer তাঁদের Dialectic of Enlightenment গ্রন্থের “The Culture Industry: Enlightenment as Mass Deception” অধ্যায়ে দেখান, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় চলচ্চিত্র, রেডিও ও সাময়িকীর মতো সাংস্কৃতিক পণ্য শিল্পোৎপাদনের মতো মাননির্ধারিত ও বাণিজ্যিক হয়ে উঠতে পারে।

গণসংস্কৃতি, পুঁজিবাদ ও মতাদর্শ বিশ্লেষণে Frankfurt School একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্ববর্তী ও সমান্তরাল তাত্ত্বিক ধারা। তবে Birmingham tradition জনপ্রিয় সংস্কৃতির দর্শককে সব সময় নিষ্ক্রিয় মনে করেনি। মানুষ সাংস্কৃতিক বার্তা গ্রহণের পাশাপাশি সেটির অর্থ বদলাতে, দর-কষাকষি করতে এবং প্রতিরোধও করতে পারে।

Leavisism-এর সঙ্গে সম্পর্ক

মূল লেখায় বলা হয়েছিল, Richard Hoggart ও Raymond Williams পরবর্তী সময়ে Leavisism অনুসরণ করেন। বক্তব্যটি অতিরিক্ত সরল।

F. R. Leavis সাহিত্যিক গুণমান, নৈতিক গুরুত্ব ও মনোযোগী পাঠের ওপর জোর দিয়েছিলেন। Hoggart ও Williams-এর প্রাথমিক বৌদ্ধিক গঠনে এই সাহিত্যিক ধারার প্রভাব ছিল। কিন্তু তাঁরা শুধু Leavisism অনুসরণ করেননি।

তাঁদের কাজ উচ্চসাহিত্যকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক ধারণা থেকে সরে শ্রমজীবী মানুষের জীবন, ভাষা, অভিজ্ঞতা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিকে বিশ্লেষণের কেন্দ্রে আনে। অর্থাৎ এখানে প্রভাব যেমন আছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ বিচ্ছেদও আছে।

যে বইগুলো ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল

১. Richard Hoggart, The Uses of Literacy (১৯৫৭): শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও যুদ্ধোত্তর বাণিজ্যিক গণসংস্কৃতির পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে।

২. Raymond Williams, Culture and Society (১৯৫৮): শিল্পায়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে আধুনিক culture ধারণার বিকাশ অনুসরণ করে।

৩. Raymond Williams, The Long Revolution (১৯৬১): সংস্কৃতি, শিক্ষা, গণতন্ত্র ও যোগাযোগের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করে।

৪. E. P. Thompson, The Making of the English Working Class (১৯৬৩): শ্রমিক শ্রেণিকে স্থির একটি শ্রেণিবিভাগের বদলে ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বোঝায়।

৫. Stuart Hall ও Paddy Whannel, The Popular Arts (১৯৬৪): জনপ্রিয় শিল্প ও গণমাধ্যমকে গুরুত্বসহকারে বিশ্লেষণের একটি পথ নির্মাণ করে।

শুধু একটি বা দুটি বই দিয়ে সংস্কৃতি অধ্যয়নের পুরো ভিত্তি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। Hoggart, Williams, Thompson ও Hall-এর কাজ পারস্পরিক আলোচনা, মতভেদ ও সংশোধনের মধ্য দিয়েই ক্ষেত্রটি গড়ে তুলেছে।

Feminism ও নতুন প্রশ্ন

আমার মূল লেখায় Feminism-এর নাম ছিল, কিন্তু এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা হয়নি। পরবর্তী সংস্কৃতি অধ্যয়ন দেখিয়েছে, শ্রেণি দিয়ে সংস্কৃতির সব বৈষম্য বোঝা যায় না।

নারী এবং সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক করা জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা একই সংস্কৃতির মধ্যে সমান নয়। Feminist Cultural Studies বিশেষভাবে দেখিয়েছে, জনপ্রিয় সংস্কৃতি, পত্রিকা, ফ্যাশন, সংগীত ও যুব-উপসংস্কৃতির বিশ্লেষণে নারীদের অভিজ্ঞতা উপেক্ষিত হলে গবেষণার ফল অসম্পূর্ণ থাকে।

এখানে প্রশ্ন ওঠে:

পরিবারে কার শ্রম অদৃশ্য থাকে?

বিজ্ঞাপনে নারী ও পুরুষকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়?

জাতীয় সংস্কৃতির নামে কার ইতিহাস বাদ পড়ে?

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে কোন পরিচয়কে স্বাভাবিক এবং কোন পরিচয়কে অপর হিসেবে নির্মাণ করা হয়?

অর্থাৎ সংস্কৃতি অধ্যয়ন শুধু সংস্কৃতি কী, তা জানতে চায় না। সংস্কৃতির ভেতরে ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে এবং সেই ক্ষমতা কীভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ে, সেটিও বুঝতে চায়।

সংস্কৃতি কি ধরে রাখতে হয়, না বদলাতে দিতে হয়?

এই জায়গায় এসে আমার পুরোনো লেখার অস্বস্তিটি এখনো রয়ে যায়। বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের কিছু আলোচনা এমনভাবে চলে, যেন সংস্কৃতি একটি তালাবদ্ধ বাক্স। কেউ পোশাক বদলাল, নতুন শব্দ ব্যবহার করল কিংবা বিদেশি কোনো শিল্পরীতি গ্রহণ করলেই সংস্কৃতি শেষ হয়ে যাবে।

বাস্তবতা এত সরল নয়। সংস্কৃতি রাতারাতি তৈরি হয় না, আবার একটি পোশাক বা একটি বিদেশি শব্দে রাতারাতি শেষও হয়ে যায় না। মানুষের পুনরাবৃত্ত অভ্যাস, প্রতিষ্ঠান, স্মৃতি, উৎপাদন, যোগাযোগ ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি তৈরি হয়। পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু ধারাবাহিকতা থাকে, আবার ধারাবাহিকতার ভেতরেও পরিবর্তন ঘটে।

তবে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী বলেই প্রতিটি পরিবর্তন সমানভাবে গ্রহণযোগ্য, এমন নয়। সেই পরিবর্তনে মানুষের সম্মতি, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষিত হচ্ছে কি না, ক্ষমতার অসমতা কাজ করছে কি না, ক্ষতি হচ্ছে কি না এবং মানুষ নিজে নতুন অর্থ তৈরি করতে পারছে কি না, তা দেখতে হবে।

তাই প্রশ্ন করতে হবে:

এই পরিবর্তনের পেছনে কার ক্ষমতা কাজ করছে?

কে লাভবান হচ্ছে এবং কে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?

কার অভিজ্ঞতা বা ইতিহাস হারিয়ে যাচ্ছে?

মানুষ নতুন সংস্কৃতিকে নিজের মতো করে গ্রহণ করছে, নাকি বাজার ও প্রতিষ্ঠান তা চাপিয়ে দিচ্ছে?

পরিশেষ

একটি জীবন্ত সংস্কৃতির একমাত্র বৈধ ব্যাখ্যা বা নিয়ন্ত্রণ কোনো ব্যক্তি, শ্রেণি কিংবা প্রতিষ্ঠান এককভাবে দাবি করতে পারে না। আবার অতীতের সবকিছু অপ্রয়োজনীয় বলে বাদ দেওয়াও সমান সরলীকরণ।

আমার শরীরে শার্টের জায়গায় টি-শার্ট উঠলেই আমি সংস্কৃতিহীন হয়ে যাই না। প্রশ্নটি শুধু পোশাক বদলেছে কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের অর্থ কী, এর পেছনে কোন ইতিহাস ও ক্ষমতা কাজ করছে এবং আমি সেটিকে কীভাবে গ্রহণ করছি।

সংস্কৃতি অধ্যয়ন সম্ভবত এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাদের সংস্কৃতির একটি চূড়ান্ত সংজ্ঞা মুখস্থ করায় না। বরং নিজের পরিচিত জীবনকে অপরিচিত প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।

আমরা সংস্কৃতিকে বহন করছি, নাকি সংস্কৃতিও প্রতিদিন আমাদের নতুন করে তৈরি করছে?

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

১. University of Birmingham. “Richard Hoggart.” Richard Hoggart, The Uses of Literacy এবং CCCS প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। মূল উৎস দেখুন প্রবেশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬।

২. Habib, Sadia. “Centre for Contemporary Cultural Studies.” Encyclopaedia Britannica. মূল উৎস দেখুন প্রবেশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬।

৩. Connell, Kieran and Matthew Hilton. “The Working Practices of Birmingham’s Centre for Contemporary Cultural Studies.” Social History, Vol. 40, No. 3, 2015, pp. 287–311. গবেষণাপত্র দেখুন প্রবেশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬।

৪. Hall, Stuart. Cultural Studies 1983: A Theoretical History. Edited by Jennifer Daryl Slack and Lawrence Grossberg, Duke University Press, 2016. প্রকাশকের তথ্য দেখুন প্রবেশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬।

৫. Storey, John. Cultural Theory and Popular Culture: An Introduction. Routledge. অধ্যায়: “Culturalism into Cultural Studies.” অধ্যায়ের সহায়ক উপকরণ দেখুন প্রবেশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬।

৬. Miller, Toby. “What It Is and What It Isn’t: Introducing Cultural Studies.” In A Companion to Cultural Studies, edited by Toby Miller, Blackwell. সহায়ক পাঠ দেখুন প্রবেশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬।

৭. Horkheimer, Max and Theodor W. Adorno. Dialectic of Enlightenment: Philosophical Fragments. Edited by Gunzelin Schmid Noerr, translated by Edmund Jephcott, Stanford University Press, 2002. মূল রচনা প্রথম প্রকাশিত ১৯৪৪/১৯৪৭। “The Culture Industry” অধ্যায়ের উন্মুক্ত পাঠ দেখুন প্রবেশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬।

৮. OpenStax. “The Four-Field Approach.” Introduction to Anthropology. পাঠ্য দেখুন প্রবেশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬।

৯. McRobbie, Angela. Feminism, Young Women, and Cultural Studies: Birmingham Essays from 1975 Onwards. Goldsmiths Press, 2024. প্রকাশকের তথ্য দেখুন প্রবেশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান মোঃ মেহেদি হাসান (কলম নাম: মি. বিকেল)—লেখক, ব্লগার, শিক্ষক এবং ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। • শিক্ষা: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। • প্রকাশনা: প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে’ (রকমারি.কম-এ উপলব্ধ)। • অন্যান্য: ‘দ্য ব্যাকস্পেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০২৩ থেকে মাইক্রোসফট ডেভেলপার প্রোগ্রামে যুক্ত। যেকোনো প্রশ্ন বা যৌথ কাজের আগ্রহে যোগাযোগ করুন: [email protected] অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!