রাবির ‘সিস্টেম’ খাবার: কম টাকায় শিক্ষার্থীজীবনের পরিচিত এক স্বস্তি
রাবির স্টেশন বাজারের ‘সিস্টেম’ খাবার, মানিক মিয়ার উদ্যোগ এবং অর্থসংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের কম টাকায় এক বেলা খাবারের গল্প।
ক্যাম্পাস জীবন | বিশেষ প্রতিবেদন
রাবির ‘সিস্টেম’ খাবার: কম টাকায় শিক্ষার্থীজীবনের পরিচিত এক স্বস্তি
ছাত্রজীবনে মাসের সব দিন এক রকম যায় না। কখনো হাতে টাকা থাকে, কখনো মাস শেষ হওয়ার আগেই হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। সেই বাস্তবতায় অল্প টাকায় এক বেলা খাবার পাওয়া অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই বড় স্বস্তি।
লেখক-প্রসঙ্গ
নিবন্ধটি লেখার সময় আব্দুস সবুর (লোটাস) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। লেখাটি তাঁর প্রত্যক্ষ ক্যাম্পাস-অভিজ্ঞতা, স্থানীয় পর্যবেক্ষণ এবং সহশিক্ষার্থীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে রচিত। মূল নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪।
‘সিস্টেম’ খাবার কী?
“সিস্টেম” নামটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই পরিচিত। কিন্তু ক্যাম্পাসের বাইরের কারও কাছে শব্দটি প্রথমে কিছুটা অদ্ভুত লাগতে পারে। এটি কোনো বিশেষ রান্নার পদ্ধতি নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন স্টেশন বাজারের হোটেল মাদারীপুরে পরিবেশিত কম দামের একটি নির্দিষ্ট খাবারের প্রচলিত নাম।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ছয়টি পদ বা “সিক্স আইটেম” থেকে মুখে মুখে খাবারটির নাম “সিস্টেম” হয়ে গেছে। ২০২৪ সালে মূল নিবন্ধটি লেখার সময় এক প্লেট সিস্টেম খাবারের দাম ছিল ২০ টাকা।
ভাতের সঙ্গে অর্ধেক সিদ্ধ ডিম, আলুভর্তা, আলুভাজি, ডাল এবং কয়েক ধরনের ভর্তা বা ভাজি মিলিয়ে খাবারটি পরিবেশন করা হতো। মূল প্রতিবেদনের দুই অংশে সবজির পদের তালিকায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। এক জায়গায় ডালভর্তা, শাকভাজি ও বেগুনভাজির উল্লেখ আছে; অন্য জায়গায় বেগুনভাজি ও শিমভর্তার কথা বলা হয়েছে। সম্ভবত দিন ও উপকরণের প্রাপ্যতা অনুযায়ী সবজির কিছু পদ পরিবর্তিত হতো।
মূল প্রতিবেদনের উভয় বিবরণ মিলিয়ে নিশ্চিতভাবে ভাত, অর্ধেক সিদ্ধ ডিম, আলুভর্তা, আলুভাজি ও ডালের উপস্থিতি পাওয়া যায়। অন্য ভর্তা ও ভাজির পদে দিনভেদে পরিবর্তন থাকতে পারে। তাই একটি অপরিবর্তনীয় মেন্যুর বদলে এটিকে ভাত, ডাল, ডিম এবং কয়েক ধরনের সবজিনির্ভর কম দামের খাবার বলা বেশি নির্ভুল।
খাবারটির নিয়মিত কাঠামো
সিস্টেম খাবারের পেছনের মানুষ
এই খাবারের সঙ্গে ব্যবসায়ী মানিক মিয়ার নাম ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তিনি রাজশাহীর স্থানীয় বাসিন্দা নন। জীবিকার সন্ধানে কুমিল্লার লাকসাম থেকে রাজশাহীতে আসেন। শুরুতে রিকশা চালিয়ে জীবনযাপন করতেন। পরে তিনি খাবারের ব্যবসায় যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে হোটেল মাদারীপুর পরিচালনার দায়িত্ব নেন।
হোটেলটির নামের পেছনেও একটি স্থানীয় ইতিহাস রয়েছে। প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে মানিক মিয়া জানিয়েছেন, দোকানটির আগের মালিকের বাড়ি ছিল মাদারীপুর জেলায়। সেই জেলার নাম অনুসারেই খাবারের দোকানটির নাম রাখা হয়েছিল “হোটেল মাদারীপুর”।
মূল নিবন্ধে বলা হয়েছিল, দীর্ঘদিন ধরে হোটেলটিতে সিস্টেম খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে এবং একসময় এর দাম ছিল মাত্র ছয় টাকা। পরবর্তী প্রকাশিত প্রতিবেদনে মানিক মিয়া প্রায় দুই দশক আগে ছয় টাকায় এই খাবার বিক্রির কথা জানিয়েছেন। তবে হোটেল পরিচালনা ও সিস্টেম খাবার চালুর সুনির্দিষ্ট সময়কাল নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে কিছু পার্থক্য রয়েছে। নিশ্চিত নথি ছাড়া তাই একটি নির্দিষ্ট বছরকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া হয়নি।
চাল, ডাল, ডিম, তেল ও সবজির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেম খাবারের মূল্যও ধাপে ধাপে বেড়েছে। মূল নিবন্ধটি প্রকাশের সময়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে, লেখক খাবারটির দাম ২০ টাকা হিসেবে নথিভুক্ত করেছিলেন।
ছয় টাকা থেকে বিশ টাকা
শিক্ষার্থীরা কেন সেখানে যেতেন?
হোটেল মাদারীপুরের কাছাকাছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি আবাসিক হল রয়েছে। মাদার বখ্শ হল ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি; কিছুটা দূরে শহীদ শামসুজ্জোহা হল ও শহীদ জিয়াউর রহমান হল। এই অবস্থানের কারণে আবাসিক শিক্ষার্থীদের অনেকের জন্য হোটেলটিতে যাওয়া সহজ ছিল।
হলের ডাইনিং বা ক্যান্টিনে সব সময় নিজের পছন্দমতো খাবার পাওয়া যায় না। আবার বাইরের সাধারণ হোটেলে এক বেলা ভাত খেতে গেলে শিক্ষার্থীর সীমিত বাজেটের ওপর চাপ পড়ে। সেই তুলনায় ২০ টাকায় ভাত, ডাল, ডিম এবং কয়েক ধরনের সবজির পদ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থীর কাছে আকর্ষণীয় ছিল।
আগে শুধু রাতে সিস্টেম খাবার পরিবেশন করা হতো বলে মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল। শিক্ষার্থীদের চাহিদার কারণে পরে দুপুরেও খাবারটি পরিবেশনের ব্যবস্থা করা হয় বলে মানিক মিয়া জানিয়েছিলেন।
শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা
মামুন হোসেনের অভিজ্ঞতা
“আমি ক্যাম্পাসে আসার পর প্রথম এক বন্ধুর সঙ্গে মাদারিপুর হোটেলে খেতে গিয়েছিলাম। সেদিন প্রথম সিস্টেম খাবারের নাম শুনি এবং আগ্রহ নিয়ে সেই মেন্যু অর্ডার করি। তারপর খেয়ে বেশ ভালো লাগে। তারপর মাঝে মাঝে ওই হোটেলে গিয়ে রাতে খাওয়া হয়। আবার টাকার সংকট চললে সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয়।”
মূল প্রতিবেদনে পরিচয়: পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এবং মাদার বখ্শ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
ইমরান হোসেনের অভিজ্ঞতা
“ক্যাম্পাসে আসার পর থেকে শুনতাম সিস্টেম খাবার ভালো। কিন্তু শুরুর দিকে দাম শুনে যেতে ইচ্ছে হয়নি। কারণ ২০ টাকায় আসলে এত খাবার আর সেটি খাওয়া যায়, এটি বিশ্বাস হচ্ছিল না। পরে এক বন্ধু জোর করে আমাকে সেখানে নিয়ে যায়। যাওয়ার পর সেখানে প্রথমবার খেয়েই ফ্যান হয়ে যাই। এখন মাঝে মাঝেই এই হোটেলে আসা হয়। আর ২০ টাকায় যে খাবার দেওয়া হয়, সেটি আসলেই অবিশ্বাস্য। এটি আসলেই প্রশংসার দাবিদার।”
মূল প্রতিবেদনে পরিচয়: ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
দুই শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতায় একটি মিল স্পষ্ট। প্রথমে দামের কারণে খাবারের পরিমাণ বা মান নিয়ে তাঁদের সন্দেহ ছিল। পরে বন্ধুদের সঙ্গে গিয়ে খাওয়ার পর তাঁরা খাবারটির নিয়মিত বা মাঝেমধ্যে ফিরে আসা ক্রেতা হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে টাকার সংকটের সময়ে কম দামের এই খাবারের গুরুত্ব আরও বেড়ে যেত।
স্বল্পমূল্যে বৈচিত্র্য, তবে পুষ্টি নিয়ে সংযত ভাষা প্রয়োজন
ভাত, ডাল, ডিম এবং কয়েক ধরনের সবজি থাকায় খাবারটিতে একাধিক খাদ্যশ্রেণির উপস্থিতি ছিল। তবে প্রতিটি পদের পরিমাণ, রান্নায় ব্যবহৃত তেল ও লবণ এবং পরিবেশিত খাবারের মোট পুষ্টিমান বিশ্লেষণ করা হয়নি। তাই খাবারটিকে বৈজ্ঞানিক অর্থে “সুষম” বা “সম্পূর্ণ পুষ্টিকর” না বলে স্বল্পমূল্যের তুলনায় বৈচিত্র্যময় খাবার বলা বেশি নির্ভুল।
একটি খাবারের চেয়ে বেশি কিছু
সিস্টেম খাবারের জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু স্বাদ ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন ব্যয়ের হিসাব। মাসের শেষদিকে হাতে টাকা কমে এলে ২০ টাকায় এক বেলা খেতে পারা অনেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত।
মানিক মিয়ার উদ্যোগটিও তাই শুধু একটি ব্যবসার গল্প নয়। রিকশা চালানো থেকে খাবারের দোকান পরিচালনা পর্যন্ত তাঁর দীর্ঘ জীবনের পরিশ্রম এবং শিক্ষার্থীদের সাধ্যের মধ্যে খাবার রাখার চেষ্টা হোটেলটিকে ক্যাম্পাসের পরিচিত জায়গায় পরিণত করেছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে “সিস্টেম” শুধু ছয় পদের একটি খাবারের নাম ছিল না। এটি ছিল অল্প টাকায় এক বেলা খাওয়ার সুযোগ, বন্ধুর সঙ্গে পরিচিত কোনো হোটেলে বসা এবং অর্থসংকটের দিনে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া।
সময়ের সঙ্গে খাবারের দাম ও পদ বদলাতে পারে। কিন্তু কম টাকায় শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার পরিবেশনের যে গল্প মানিক মিয়া ও হোটেল মাদারীপুর তৈরি করেছে, তা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থীর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে।
হালনাগাদ, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সিস্টেম খাবারের দাম ২৫ টাকা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে ভাত, অর্ধেক ডিম, পটলভাজি, আলুভর্তা, শাকভাজি ও আলুভাজির সঙ্গে ডাল পরিবেশনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই তথ্যের স্বাধীন সরেজমিন যাচাই অভিযাত্রী করেনি। মূল নিবন্ধে উল্লেখিত ২০ টাকার মূল্য ২০২৪ সালের পরিস্থিতি নির্দেশ করে।
১. আব্দুস সবুর (লোটাস)। “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রিয় সিস্টেম খাবার: অল্প টাকায় পুষ্টিকর ও সুস্বাদু খাবারের গল্প।” প্রথম প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪; পুরোনো অভিযাত্রী সংস্করণ, Wayback Machine-এ সংরক্ষিত।
২. কামরুল হাসান অভি। “রাবিতে ‘সিস্টেম’ খাওয়া যায় ২০ টাকায়।” ঢাকা মেইল, ২০ জুন ২০২২। খাবারের প্রচলিত নাম, মেন্যু, মূল্য, হোটেলের অবস্থান এবং মানিক মিয়ার বক্তব্যসংবলিত প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি পড়ুন
৩. প্রথম আলো। “ডাইনিংয়ে খাবারের দাম আবার বাড়ল, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ।” ৯ জানুয়ারি ২০২৪। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের খাবারের মূল্যবৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়াবিষয়ক প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি পড়ুন
৪. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। “Residence Hall।” বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ও ডরমিটরির সরকারি তালিকা। সরকারি তালিকা দেখুন
৫. সৈয়দ মাহিন। “২৫ টাকায় রাবি শিক্ষার্থীদের প্রিয় খাবার মানিক মামার ‘সিস্টেম’।” এশিয়া পোস্ট, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। বর্তমান মূল্য ও পরিবেশনার হালনাগাদ সংবাদপ্রতিবেদন। হালনাগাদ প্রতিবেদন
মূল লেখক: আব্দুস সবুর (লোটাস)
মূল শিরোনাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রিয় সিস্টেম খাবার: অল্প টাকায় পুষ্টিকর ও সুস্বাদু খাবারের গল্প
প্রথম প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪
মূল লেখার প্রেক্ষাপট: লেখক তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন
বর্তমান সংস্করণ: মূল লেখকের প্রত্যক্ষ ক্যাম্পাস-অভিজ্ঞতা, সাক্ষাৎকার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সংরক্ষণ করে তথ্য যাচাই ও সম্পাদকীয় পরিমার্জনের মাধ্যমে প্রস্তুত হালনাগাদকৃত সংস্করণ
গবেষণা, তথ্য যাচাই ও সম্পাদনা: অভিযাত্রী সম্পাদনা প্যানেল
কপিরাইট মালিক: অভিযাত্রী
সম্পাদকীয় স্বচ্ছতা: বর্তমান সংস্করণে সাক্ষাৎকারদাতাদের পরিচয় ও বক্তব্য পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। মেন্যুর পরস্পরবিরোধী তালিকা থেকে নতুন কোনো পদ অনুমান করে যোগ করা হয়নি। পুষ্টি-সংক্রান্ত ভাষা সীমিত করা, অস্পষ্ট সময়রেখা ব্যাখ্যা করা এবং ২০২৬ সালের মূল্যকে পৃথক সংবাদভিত্তিক হালনাগাদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেষ কথা
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
লেখকত্ব ও প্রকাশনা-ইতিহাস
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0