বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অব্যবস্থাপনা: প্রস্তুতি কতটা?

বাংলাদেশ দুর্যোগে জীবন রক্ষায় এগিয়েছে, তবু অব্যবস্থাপনা কেন ক্ষতি বাড়ায়? প্রস্তুতি, নগরঝুঁকি, জলবায়ু পরিবর্তন ও করণীয় বিশ্লেষণ।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ১
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অব্যবস্থাপনা: প্রস্তুতি কতটা?
বন্যার পানিতে ডুবে থাকা বাংলাদেশের একটি জনপদে ভাঙা বাঁধের পাশ দিয়ে শিশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় মানুষ।

সম্পাদকীয়

দুর্যোগ প্রাকৃতিক, বিপর্যয় কি আমাদের তৈরি?

ঘূর্ণিঝড়, বন্যা কিংবা ভূমিকম্প ঠেকানো সবসময় সম্ভব নয়। কিন্তু একটি প্রাকৃতিক বিপদ কতটা বড় মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে আমাদের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা, অবকাঠামো ও জবাবদিহির ওপর।

সম্পাদকীয় নোট

নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালে। বর্তমান সংস্করণে লেখকের মূল প্রশ্ন, সমালোচনামূলক অবস্থান ও বক্তব্যের গতিপথ সংরক্ষণ করে পুরোনো ও অস্পষ্ট পরিসংখ্যান পুনর্মূল্যায়ন, প্রমাণহীন সাধারণীকরণ সীমিত এবং বাংলাদেশের দুর্যোগ প্রস্তুতির নথিভুক্ত অর্জন ও অবশিষ্ট ঘাটতি যুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে বড় কোনো বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের পর পরিচিত কিছু দৃশ্য দেখা যায়। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ভিড়, ভেঙে যাওয়া ঘর, ডুবে থাকা ফসলের মাঠ এবং ত্রাণ নিয়ে তৎপরতা। দুর্যোগের পর মানুষের পাশে দাঁড়ানো অবশ্যই জরুরি। তবে প্রতিবার একই ধরনের ক্ষতির পর একটি প্রশ্ন ফিরে আসে: বিপদ আসার আগে আমরা কতটা প্রস্তুত ছিলাম?

ঘূর্ণিঝড় বা অতিবৃষ্টি মানুষের হাতে তৈরি নয়। কিন্তু দুর্বল বাঁধ, দখল হয়ে যাওয়া খাল, অপরিকল্পিত বসতি, অকার্যকর নিকাশিব্যবস্থা, নির্মাণবিধি অমান্য এবং স্থানীয় সতর্কতা উপেক্ষা করা মানুষের সিদ্ধান্তের ফল। প্রকৃতি আঘাত করতে পারে; কিন্তু সেই আঘাত কতটা বড় বিপর্যয়ে পরিণত হবে, সেখানে ব্যবস্থাপনার ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।

প্রাকৃতিক বিপদ আর দুর্যোগ এক বিষয় নয়

ঘূর্ণিঝড়, ভূকম্পন, অতিবৃষ্টি কিংবা খরা একটি প্রাকৃতিক বিপদ। কিন্তু সেই বিপদে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কত মানুষ নিরাপদ আশ্রয় পাবে, সতর্কবার্তা সবার কাছে পৌঁছাবে কি না এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কত দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে, তা সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।

একই মাত্রার প্রাকৃতিক ঘটনা দুটি অঞ্চলে সমান ক্ষতি করে না। যেখানে দারিদ্র্য বেশি, বসতি দুর্বল, স্বাস্থ্যসেবা দূরে, যোগাযোগব্যবস্থা ভঙ্গুর এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ কম, সেখানে ক্ষতির মাত্রা সাধারণত বেশি হয়। তাই একটি বিপদকে দুর্যোগে পরিণত করার পেছনে প্রাকৃতিক শক্তির পাশাপাশি সামাজিক দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনাও কাজ করে।

বাংলাদেশের ঝুঁকি একেক অঞ্চলে একেক রকম

বিস্তৃত বদ্বীপ, অসংখ্য নদী, মৌসুমি বৃষ্টিপাত, ঘনবসতি এবং দীর্ঘ উপকূলরেখার কারণে বাংলাদেশ নিয়মিত নানা ধরনের প্রাকৃতিক বিপদের মুখোমুখি হয়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, খরা, বজ্রপাত, ভূমিধস, শৈত্যপ্রবাহ ও তাপপ্রবাহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জীবন ও জীবিকায় প্রভাব ফেলে।

সব অঞ্চলের ঝুঁকি এক নয়। উপকূলের বাসিন্দাদের জন্য ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা বড় সংকট। নদীতীরের মানুষের জন্য নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতি দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি করে। হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা অল্প সময়ের মধ্যে বছরের প্রধান ফসল নষ্ট করতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলে পাহাড় কাটা, অনিরাপদ বসতি এবং ভারী বৃষ্টি ভূমিধসের ক্ষতি বাড়িয়ে দেয়।

ঢাকা এবং দ্রুত বর্ধনশীল অন্য শহরগুলোর সংকট আবার ভিন্ন। সেখানে জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের ঝুঁকির সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ যুক্ত হয়েছে। খাল ও জলাধার সংকুচিত হলে অতিবৃষ্টির পানি বের হওয়ার পথ কমে যায়। সংকীর্ণ সড়ক, ঘনবসতি, দুর্বল ভবন এবং পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থানের অভাব জরুরি উদ্ধারকাজকেও কঠিন করে তোলে।

ভূমিকম্পের সুনির্দিষ্ট সময় নির্ভুলভাবে বলে দেওয়া যায় না। তাই ভূমিকম্প মোকাবেলায় সবচেয়ে কার্যকর প্রস্তুতি হলো নিরাপদ নির্মাণ, ভবনবিধির যথাযথ প্রয়োগ, উদ্ধার সক্ষমতা তৈরি, হাসপাতাল ও জরুরি সেবা সচল রাখা এবং মানুষের করণীয় সম্পর্কে নিয়মিত অনুশীলন।

বাংলাদেশের অর্জন অস্বীকার করা যাবে না

আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করতে হলে অর্জনগুলোও স্বীকার করতে হবে। পুরো ব্যবস্থাকে ব্যর্থ বলা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি কয়েকটি সাফল্য দেখিয়ে সব ঘাটতি আড়াল করাও ঠিক নয়।

বিগত কয়েক দশকে ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতা, আশ্রয়কেন্দ্র, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে নেওয়া, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এবং জনসচেতনতায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৭০ সালের তুলনায় ঘূর্ণিঝড়জনিত মৃত্যু ব্যাপকভাবে কমে আসা প্রমাণ করে, প্রস্তুতি ও সংগঠিত উদ্যোগ মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে।

এই অর্জন শুধু কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা সরকারের নয়। স্থানীয় মানুষ, স্বেচ্ছাসেবক, আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাস সংস্থা, রেড ক্রিসেন্ট, সংবাদমাধ্যম, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের ধারাবাহিক অংশগ্রহণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে মানুষের মৃত্যু কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে দুর্যোগের অন্যান্য ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু, মাছের ঘের, বিদ্যালয়, সড়ক, বাঁধ, পানির উৎস এবং স্থানীয় বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হলে একটি পরিবারকে বছরের পর বছর তার মূল্য দিতে হতে পারে।

দুর্যোগের ক্ষতি শুধু জিডিপির সংখ্যা নয়

একটি পরিবার জমি হারালে, কৃষক ফসল হারালে, জেলে নৌকা হারালে কিংবা কোনো শিশুর বিদ্যালয় দীর্ঘদিন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলে ক্ষতি শুধু টাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তার প্রভাব আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, ঋণ এবং ভবিষ্যৎ সুযোগের ওপর ছড়িয়ে পড়ে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশে গড়ে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়। একই মূল্যায়নের একটি গুরুতর বন্যা পরিস্থিতিতে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন সর্বোচ্চ প্রায় ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার ঝুঁকি দেখানো হয়েছে। প্রথমটি গড় বার্ষিক ক্ষতির হিসাব, আর দ্বিতীয়টি গুরুতর পরিস্থিতির সম্ভাব্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব।

ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের সময় ভাঙা ঘর ও নষ্ট ফসলের আর্থিক মূল্য ছাড়াও কর্মহীনতা, ঋণ, অসুস্থতা, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, বাস্তুচ্যুতি এবং নারী ও কিশোরীদের ওপর বাড়তি পরিচর্যা ও নিরাপত্তার চাপ বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রস্তুতির চেয়ে প্রতিক্রিয়া কেন বেশি দৃশ্যমান

আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি পরিচিত প্রবণতা হলো, বিপদ ঘটে যাওয়ার পর ত্রাণ ও জরুরি সহায়তার তৎপরতা দ্রুত দৃশ্যমান হয়। কিন্তু একই মাত্রার আগ্রহ ঝুঁকি শনাক্ত করা, দুর্বল বাঁধ মেরামত, জলাধার রক্ষা, ভবন পরীক্ষা কিংবা স্থানীয় প্রস্তুতিতে সবসময় দেখা যায় না।

ত্রাণ প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা ঝুঁকি হ্রাসের বিকল্প নয়। একটি বাঁধ ভেঙে গেলে মেরামত করতে হবে। একই সঙ্গে জানতে হবে, বাঁধটি কেন দুর্বল হয়েছিল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হয়েছে কি না, স্থানীয় মানুষ আগে কোনো সতর্কতা দিয়েছিল কি না এবং একই ঘটনা পুনরায় ঠেকাতে কী পরিবর্তন আনা হয়েছে।

দুর্যোগের পর সহায়তা বিতরণের ছবি সহজেই দৃশ্যমান হয়। কিন্তু নিকাশিনালা পরিষ্কার রাখা, ভবনবিধি প্রয়োগ, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত করা কিংবা আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহারযোগ্য রাখার কাজ সাধারণত তেমন দৃশ্যমান নয়। অথচ এই কম দৃশ্যমান কাজগুলোই অনেক সময় মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় বেশি কার্যকর।

সমস্যা শুধু প্রশাসনের কোনো একটি স্তরে সীমাবদ্ধ নয়। পানি, ভূমি, স্থানীয় সরকার, নগর উন্নয়ন, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশের মতো বিভিন্ন খাতের সিদ্ধান্ত দুর্যোগঝুঁকিকে প্রভাবিত করে। এক প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা অন্য প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের সঙ্গে না মিললে জাতীয় নীতি থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না।

প্রশাসনের সঙ্গে বিশেষজ্ঞতার সমন্বয় প্রয়োজন

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শুধু ত্রাণের হিসাব কিংবা প্রশাসনিক নির্দেশনার বিষয় নয়। এটি আবহাওয়াবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, প্রকৌশল, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি, নগরপরিকল্পনা, যোগাযোগ এবং সামাজিক বিজ্ঞানের সমন্বিত ক্ষেত্র।

প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়কারী ভূমিকা প্রয়োজনীয়। তবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে বিষয়বিশেষজ্ঞ, গবেষক, প্রকৌশলী, আবহাওয়াবিদ, চিকিৎসক, স্থানীয় সরকার, স্বেচ্ছাসেবক এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে সিদ্ধান্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি হচ্ছে। গবেষণা, স্থানীয় ঝুঁকি নিরূপণ, তথ্য বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নে এই দক্ষতা কীভাবে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তা পর্যালোচনা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে শুধু ডিগ্রি থাকাই যথেষ্ট নয়। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পেশাগত মান এবং সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে বিশেষজ্ঞতার উপস্থিতিও প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।

জলবায়ু পরিবর্তন পুরোনো ঝুঁকিকে আরও জটিল করছে

বৈশ্বিক নিঃসরণে তুলনামূলকভাবে সীমিত অবদান রেখেও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুতর ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি, অনিয়মিত বর্ষা, তাপপ্রবাহ, নদীভাঙন এবং ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতিকর প্রভাব মানুষের জীবিকা ও বসতিকে নতুন চাপের মধ্যে ফেলছে।

জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু উপকূলের সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাপপ্রবাহ শহরের শ্রমিক, শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষের স্বাস্থ্য এবং কর্মক্ষমতায় প্রভাব ফেলে। অনিয়মিত বৃষ্টি কৃষি উৎপাদনকে অনিশ্চিত করে। নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা অনেক মানুষকে স্থানান্তরে বাধ্য করতে পারে।

ফলে জলবায়ু অভিযোজনকে আলাদা কোনো পরিবেশ প্রকল্প হিসেবে না দেখে কৃষি, পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, সামাজিক সুরক্ষা ও নগরায়ণ পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।

কোন কাজগুলো এখন অগ্রাধিকার পাবে

১. ঝুঁকিসচেতন উন্নয়ন: সড়ক, সেতু, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, আবাসন ও শিল্পপ্রকল্প অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার বন্যা, ভূমিকম্প, তাপ, ভূমিধস ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বিবেচনা করতে হবে।

২. ভবনবিধির বাস্তব প্রয়োগ: শুধু বিধি প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। নিয়মিত পরিদর্শন, স্বচ্ছ অনুমোদন এবং নিয়মভঙ্গের কার্যকর প্রতিকার প্রয়োজন।

৩. সতর্কবার্তার শেষ প্রান্ত নিশ্চিত করা: সতর্কবার্তা প্রচার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং দুর্গম এলাকার মানুষ বার্তাটি বুঝেছে ও নিরাপদে সরে যেতে পেরেছে কি না, তা দেখতে হবে।

৪. স্থানীয় সরকারকে সক্ষম করা: স্থানীয় ঝুঁকি মানচিত্র, প্রশিক্ষিত জনবল, জরুরি অর্থ, উদ্ধার সরঞ্জাম এবং সময়োপযোগী তথ্য দিতে হবে।

৫. স্বচ্ছ ক্ষয়ক্ষতি ও সহায়তাতথ্য: কারা ক্ষতিগ্রস্ত, কী পরিমাণ সহায়তা বরাদ্দ হয়েছে এবং কারা সহায়তা পেয়েছে, এসব তথ্য প্রকাশযোগ্য ও যাচাইযোগ্য হওয়া দরকার।

৬. প্রকৃতিনির্ভর সুরক্ষা: জলাভূমি, নদী, খাল, বন, পাহাড় ও উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনীকে খালি জমি হিসেবে না দেখে প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে রক্ষা করতে হবে।

৭. স্বাধীন মূল্যায়ন ও জবাবদিহি: প্রতিটি বড় দুর্যোগের পর কী কাজ করেছে, কোথায় ব্যর্থতা ছিল এবং পরবর্তী সময়ে কী সংশোধন আনা হয়েছে, তার স্বাধীন ও প্রকাশযোগ্য মূল্যায়ন প্রয়োজন।

শেষ কথা

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার গল্প একই সঙ্গে সাফল্য ও অসম্পূর্ণতার। ঘূর্ণিঝড়ে মানুষের মৃত্যু কমানো বড় অর্জন। কিন্তু উন্নয়ন পরিকল্পনায় ঝুঁকি উপেক্ষা, জলাভূমি দখল, দুর্বল অবকাঠামো, স্থানীয় সক্ষমতার ঘাটতি এবং বিপদ ঘটে যাওয়ার পর অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াকেন্দ্রিকতা সেই অর্জনকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলে।

প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রকৃতির একটি আঘাত কতটা বড় মানবিক বিপর্যয় হয়ে উঠবে, সেই ফলাফল অনেকাংশে আমাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। দুর্যোগের পর সহায়তা প্রয়োজন, তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি কমানো, মানুষকে প্রস্তুত করা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা।

লেখক ও প্রকাশনা তথ্য

মূল লেখক: আব্দুস সবুর

মূল শিরোনাম: দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অব্যবস্থাপনা

প্রথম প্রকাশ: ২২ মে ২০২৩, দ্য ব্যাকস্পেস জার্নাল

বর্তমান সংস্করণ: অভিযাত্রীর জন্য তথ্য-হালনাগাদ ও গভীরভাবে সম্পাদিত পুনঃপ্রকাশ

গবেষণা, তথ্য যাচাই ও সম্পাদনা: অভিযাত্রী সম্পাদনা প্যানেল

নিবন্ধটির বর্তমান প্রকাশনা-অধিকার: অভিযাত্রী

অধিকার-ঘোষণা: ব্যবহৃত প্রতিবেদন, তথ্য ও সংশ্লিষ্ট তৃতীয় পক্ষের মেধাস্বত্ব নিজ নিজ অধিকারীর।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

১. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। Bangladesh Disaster-related Statistics 2021: Climate Change and Natural Disaster Perspectives. পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিবেশ ও দুর্যোগ পরিসংখ্যান

২. World Bank Group. Bangladesh Country Climate and Development Report. অক্টোবর ২০২২। জলবায়ু ঝুঁকি, অর্থনৈতিক প্রভাব, কৃষি, বাস্তুচ্যুতি ও অভিযোজন বিনিয়োগের মূল্যায়ন।
World Bank Open Knowledge Repository

৩. United Nations Office for Disaster Risk Reduction. Disaster Risk Reduction in Bangladesh: Status Report 2020. বাংলাদেশের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের অগ্রগতি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও অবশিষ্ট চ্যালেঞ্জ।
https://www.undrr.org/media/48524/downloadUNDRR Bangladesh Status Report

৪. United Nations Office for Disaster Risk Reduction. “Bridging National Strategy and Local Action: Bangladesh’s Success in Vertical DRR Integration.” ৩০ মে ২০২৫। স্থানীয় অংশগ্রহণ, আগাম সতর্কতা ও কমিউনিটি-কেন্দ্রিক প্রস্তুতির মূল্যায়ন।
UNDRR Case Study

৫. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। Implementation of the Sendai Framework for Disaster Risk Reduction in Bangladesh: National Voluntary Report. অক্টোবর ২০২২।
https://sendaiframework-mtr.undrr.org/media/85313/downloadSendai Framework Midterm Review

৬. Bündnis Entwicklung Hilft and IFHV. WorldRiskReport. দুর্যোগঝুঁকি, exposure, vulnerability, coping capacity ও adaptive capacity মূল্যায়নের পদ্ধতি এবং প্রতিবেদনসমূহ।
WorldRiskReport Archive and Methodology

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
আব্দুস সবুর (লোটাস) আমি আব্দুস সবুর, লেখালেখিতে লোটাস নামে পরিচিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছি। অর্থনীতি, শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, ক্রীড়া ও সম্পাদকীয় বিষয়ে লেখালেখির অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। অভিযাত্রীর সহ-সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে আমি লেখা পর্যালোচনা, সম্পাদকীয় সমন্বয় এবং প্রকাশনার মাননিয়ন্ত্রণে যুক্ত আছি।