কফি হাউসের আড্ডা কি সত্যিই হারিয়ে গেছে?

কলকাতার রক, বেকার তরুণের ক্যারাম বোর্ড, College Street ও ভিলাইয়ের সাহিত্যিক আসর ঘুরে স্মৃতি দত্ত খুঁজেছেন বাঙালির আড্ডা আজও বেঁচে আছে কি না।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ৩
কফি হাউসের আড্ডা কি সত্যিই হারিয়ে গেছে?
College Street Coffee House-এর ঐতিহ্যবাহী ভিড়ভরা সভাঘরে চার প্রবীণ বন্ধুর প্রাণবন্ত আড্ডা মুগ্ধ হয়ে দেখছেন শাড়িপরা এক নারী।

কলকাতা, স্মৃতি ও বাঙালির আড্ডা

কফি হাউসের আড্ডা কি সত্যিই হারিয়ে গেছে?

কখনো রাস্তার ধারে ক্যারাম বোর্ড, কখনো উত্তর কলকাতার বাড়ির রক, কখনো College Street-এর জনারণ্য, আবার কখনো ভিলাইয়ের একটি টেবিল। জায়গা বদলায়, মানুষ বদলায়; আড্ডা কি সত্যিই হারিয়ে যায়?

লিখতে বসে প্রথমেই মনে পড়ে মান্না দে-র গাওয়া সেই অবিস্মরণীয় গান, “কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই”। গানটির নাম উচ্চারণ করলেই যেন কয়েকটি হারিয়ে যাওয়া বিকেল, ছড়িয়ে পড়া বন্ধু এবং ফেলে আসা কথোপকথন একসঙ্গে ফিরে আসে।

কিন্তু কফি হাউস কি শুধু College Street-এর একটি ঐতিহাসিক ভবন? আমার মনে হয়, তা নয়। যেখানে কয়েকজন মানুষ নিজেদের সুখ-দুঃখ, সাহিত্য, রাজনীতি, ব্যর্থতা, ভবিষ্যৎ কিংবা একেবারেই অনর্থক কোনো বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেন, সেখানেই একটি ছোট কফি হাউস তৈরি হয়। সেখানে দামি কফির পেয়ালা না থাকলেও চলে। কখনো একটি ক্যারাম বোর্ড, কখনো বাড়ির সামনের বাঁধানো রক, আবার কখনো সাধারণ এক কাপ চা-ই যথেষ্ট।

হয়তো সেই কারণেই গানটি আড্ডার অনুপস্থিতির কথা বললেও আমার মনে বারবার উল্টো প্রশ্ন জাগে। পুরোনো মানুষেরা চলে গেছেন, কিন্তু আড্ডা কি সত্যিই চলে গেছে? নাকি একই জায়গায় নতুন মানুষ এসে পুরোনো কথোপকথনের উত্তরাধিকার বহন করছেন?

বেকার তরুণদের ক্যারাম বোর্ড

একটু আজ কলকাতার কথা বলি। আমার কলেজজীবনে, সেই ষাটের দশকে, কলকাতার পথে কয়েকজন তরুণকে একটি জায়গায় জড়ো হয়ে আড্ডা দিতে প্রায়ই দেখতাম। কোথা থেকে জোগাড় করা কোনো ভাঙা টেবিলে ক্যারাম বোর্ড বসানো হতো। কখনো সেটি পথের খানিকটা জায়গাও আটকে রাখত। রাতে আশপাশের কোনো বাড়ি থেকে বিদ্যুতের তার টেনে এনে একটি বাল্ব জ্বালিয়ে খেলা চলত।

তখন বড্ড রাগ হতো। ভাবতাম, এদের কি কোনো কাজকর্ম নেই? না থাকলে কাজ জোগাড় করে না কেন?

পরে বুঝেছি, কথাটি এত সহজ নয়। তাঁদের অনেকেই কাজের সন্ধান করে করে ব্যর্থ হওয়া তরুণ। বেকারত্ব শুধু অর্থের অভাব তৈরি করে না; বাড়ির ভেতরে একজন মানুষের জায়গাটুকুও কখনো সংকুচিত করে দেয়। পরিবারের চোখে তিনি বোঝা হয়ে ওঠেন, সমাজের চোখে অলস। অথচ কাজ চেয়েও কাজ না পাওয়ার ব্যর্থতা তাঁর নিজের কাছে কতটা অসহনীয়, সেটি বাইরে থেকে বোঝা যায় না।

তাই তাঁদের ওপর শুধু রাগ নয়, সহানুভূতিও প্রয়োজন। রাস্তার ধারের সামান্য জায়গা, ভাঙা টেবিল আর ক্যারাম বোর্ডটিই হয়তো ছিল তাঁদের সাময়িক আশ্রয়। সেই জায়গাটিই তাঁদের আড্ডাখানা, তাঁদের নিজস্ব কফি হাউস।

ক্যারামের গুটি ছুটে যেত এক কোণ থেকে অন্য কোণে। তার সঙ্গে বোধহয় ছুটত চাকরির খবর, ব্যর্থ সাক্ষাৎকারের গল্প, বাড়ির অশান্তি, পাড়ার রাজনীতি, সিনেমা, খেলাধুলা, প্রেম এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন সব পরিকল্পনা, যার অধিকাংশই হয়তো কোনোদিন বাস্তব হয়নি। তবু ওই কথাগুলোই মানুষগুলিকে পরের দিন পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেত।

আড্ডা তাঁদের চাকরি দিতে পারেনি। কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য একা থাকার অপমান থেকে হয়তো মুক্তি দিয়েছিল। যে সমাজ একজন বেকার তরুণকে কাজ দিতে পারে না, সেই সমাজ আবার তাঁর কয়েক ঘণ্টার ক্যারাম খেলাকেও সহজে ক্ষমা করতে চায় না। বয়স বাড়ার পর এই বৈপরীত্যটিই আমার বেশি চোখে পড়ে।

উত্তর কলকাতার রক ছিল পাড়ার কফি হাউস

উত্তর কলকাতায় এমন আড্ডা দক্ষিণ কলকাতার তুলনায় বেশি চোখে পড়ত। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল উত্তর কলকাতার পরিচিত রক বা রোয়াক-সংস্কৃতি।

আজকের বহুতল ফ্ল্যাটের সামনে সেই রক খুব বেশি দেখা যায় না। পুরোনো বাড়ির প্রধান প্রবেশপথের সামনে থাকত চওড়া বাঁধানো একটি উঁচু জায়গা। নিচ থেকে দু-তিনটি সিঁড়ি উঠে সেখানে পৌঁছাতে হতো। বাড়ির লোকজন তো বটেই, পরিচিত পথচারীরাও কখনো সেখানে একটু বসতেন, দুদণ্ড বিশ্রাম নিতেন কিংবা কথায় যোগ দিতেন।

কোনো কোনো বাড়ির রকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে মানুষ জমতেন। সেখানে কফি পাওয়া মুশকিল ছিল, চাও সব সময় নয়। তবে সিগারেটের ধোঁয়া, তর্ক আর গল্পের অভাব ছিল না। শুধু তরুণেরা নন, বয়স পেরিয়ে যাওয়া মানুষও সেই আসরে যোগ দিতেন। পাড়ার খবর থেকে বিশ্বরাজনীতি, ফুটবল থেকে সাহিত্য, নাটক থেকে ব্যক্তিগত সমস্যা, আলোচনার বিষয় কখন কোথায় পৌঁছাবে তার কোনো ঠিক ছিল না।

ক্লাবরুম বা রেস্তোরাঁর চেয়ার-টেবিলে বসে আড্ডা দেওয়ার আনন্দ আলাদা। কিন্তু বাড়ির রকে বসে পথচলতি মানুষকে ডেকে নেওয়া, পরিচিত-অপরিচিতের কথায় মিশে যাওয়া এবং কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন ছাড়াই একটি আসর তৈরি হওয়ার সুখ অন্য রকম।

সেই রক বাড়ির ভেতর ও রাস্তার মাঝামাঝি একটি জায়গা ছিল। পুরোপুরি ব্যক্তিগত নয়, আবার সম্পূর্ণ জনপরিসরও নয়। ফলে সেখানে মানুষ ঘরের খবর যেমন বলতেন, তেমনি বাইরের পৃথিবী নিয়েও তর্ক করতেন। হয়তো এই মাঝামাঝি অবস্থানই রককে এত আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।

আড্ডা কি শুধু সময় নষ্ট?

সব আড্ডা গঠনমূলক হয় না, যেমন সব আনুষ্ঠানিক সভাও ফলপ্রসূ হয় না। কিন্তু প্রশ্ন, তর্ক, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের বিনিময় হলে আড্ডা হয়ে উঠতে পারে একটি অনানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়। সেখানে পাঠ্যক্রম নেই, কিন্তু মানুষ একে অন্যের কাছ থেকে ভাষা, যুক্তি, স্মৃতি ও জীবন সম্পর্কে শেখে।

আড্ডারও একটি সামাজিক ইতিহাস আছে

বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে আড্ডা বারবার ফিরে এসেছে। বৈঠকখানা, বাড়ির বারান্দা, পাড়ার চায়ের দোকান, রক, সাহিত্যসভা কিংবা কফি হাউস, জায়গা আলাদা হলেও কথোপকথনের এই সংস্কৃতি বহু প্রজন্ম ধরে টিকে আছে।

পুরোনো কলকাতার পারিবারিক বৈঠকখানা, সাহিত্যিকদের আসর, থিয়েটারের মহড়া এবং পাড়ার চায়ের দোকানও আড্ডার পরিসর ছিল। পরে শহুরে ক্যাফে ও Coffee House সেই ধারাকে নতুন রূপ দেয়। তবে আড্ডার প্রাণ ভবন নয়, মানুষ।

আড্ডা নিয়ে কথা বলার সময় একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। সব মানুষের আড্ডায় প্রবেশের সুযোগ সমান ছিল না। পাড়ার চায়ের দোকান বা রকের বহু আড্ডাই প্রধানত পুরুষের পরিসর ছিল। নারীদের নিজস্ব কথোপকথনও ছিল, কিন্তু তার স্থান, সময় ও সামাজিক স্বাধীনতা আলাদা। ফলে আড্ডার স্মৃতি যতই মধুর হোক, তার সামাজিক সীমাকেও অস্বীকার করা ঠিক নয়।

তবু আড্ডার মধ্যে এক ধরনের অঘোষিত গণতন্ত্রও ছিল। বয়স, পেশা ও সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য অতিক্রম করে একই কথার আসরে মানুষ বসতে পারতেন। কোনো তরুণের প্রশ্নে প্রবীণ বিরক্ত হতেন, আবার প্রবীণের অভিজ্ঞতাকে তরুণেরা তর্ক করে উড়িয়ে দিতেন। সব কথা সমান জ্ঞানগর্ভ ছিল না, কিন্তু সব কথা মিলেই একটি সময়ের সামাজিক ভাষা তৈরি করত।

একটি গান, সাত বন্ধু এবং হারিয়ে যাওয়া সময়

মান্না দে-র কণ্ঠে গাওয়া “কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই” গানটির কথা লিখেছেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, সুর করেছেন সুপর্ণকান্তি ঘোষ। গানটি শুধু একটি আড্ডাস্থলকে স্মরণ করে না; এটি সময়ের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া বন্ধুদের সম্মিলিত প্রতিকৃতি।

গানে আমরা পাই নিখিলেশ, মইদুল, ডি’সুজা, রমা রায়, অমল, সুজাতা এবং ঘটনাবর্ণনাকারীকে। তাঁদের কেউ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত, কেউ সাংবাদিকতা করেন, কেউ কবি হতে চেয়েছিলেন, কেউ অভিনয় করতেন। একই টেবিলে বসা মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ এক হয় না। সময় তাঁদের দূরে সরিয়ে দেয়; কারও জীবনে আসে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য, কারও জীবনে অসুস্থতা, বিচ্ছেদ কিংবা অপূর্ণতা।

নিখিলেশ ও মইদুলের নামের সঙ্গে প্যারিস ও ঢাকার উল্লেখ গানটির ভৌগোলিক পরিসরকে কলকাতার বাইরে নিয়ে যায়। বন্ধুত্বের টেবিলটি এক জায়গায় থাকে, কিন্তু মানুষ ছড়িয়ে পড়ে ভিন্ন শহর, পেশা ও পরিণতিতে।

অমলের অপ্রকাশিত কবিতা, রমা রায়ের ভেঙে পড়া জীবন, মইদুলের সংবাদপত্রের কাজ কিংবা নীরব ডি’সুজা, প্রতিটি চরিত্রই যেন কোনো না কোনো অসম্পূর্ণতার প্রতিনিধি। তাঁরা শুধু সাতজন ব্যক্তি নন; তাঁরা সেইসব মানুষের প্রতীক, যাঁদের যৌবনের পরিকল্পনা সময়ের সঙ্গে অন্য পথে চলে যায়।

সুজাতার জীবনকে বাইরে থেকে অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল বলে শোনা যায়। কিন্তু তাঁর নিজের কণ্ঠ আমরা শুনি না। ফলে তিনি সত্যিই কেমন আছেন, তা নিশ্চিত নয়। সম্পদকে সুখের সমার্থক ধরে নেওয়ার এই প্রবণতাটিও আজ গানটি নতুনভাবে শোনার সময় ভাবায়।

গানটির সবচেয়ে গভীর অনুভূতি হয়তো এই যে মানুষ চলে যায়, কিন্তু আড্ডার জায়গা পুরোপুরি শূন্য থাকে না। পুরোনো বন্ধুদের জায়গায় নতুন মানুষ আসে। একই টেবিল নতুন কথোপকথনে আবার পূর্ণ হয়। আড্ডা তাই একই সঙ্গে ক্ষণস্থায়ী ও দীর্ঘজীবী।

গানটির জন্ম নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত আছে। তবে নির্ভরযোগ্যভাবে জানা যায়, এটি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা এবং সুপর্ণকান্তি ঘোষের সুরে মান্না দে গেয়েছিলেন। সুরকারের স্মৃতিচারণভিত্তিক প্রতিবেদনে গানটির সৃষ্টির সঙ্গে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও তরুণ সুপর্ণকান্তি ঘোষের প্রত্যক্ষ সঙ্গীত-সম্পর্কের কথা উঠে আসে।

Albert Hall থেকে College Street Coffee House

College Street Coffee House-এর ভবনটির ইতিহাস Albert Hall-এর সঙ্গে যুক্ত। Indian Coffee House-এর নিজস্ব ইতিহাস অনুযায়ী, Albert Hall প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৭৬ সালের এপ্রিলে। পরে Coffee Board ১৯৪২ সালে সেখানে একটি coffee joint চালু করে। ১৯৪৭ সালে জায়গাটির নাম হয় Coffee House।

১৯৫৮ সালে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ Coffee House বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। Presidency College এবং Calcutta University-এর শিক্ষকদের আবেদনের পর একই বছর এটি আবার চালু হয়। সেই ফিরে আসা শুধু একটি রেস্তোরাঁকে রক্ষা করেনি; কলকাতার দীর্ঘ আড্ডা-ঐতিহ্যের একটি কেন্দ্রকেও টিকিয়ে রেখেছিল।

জায়গাটি College Street Coffee House নামে পরিচিত হলেও এর ঠিকানা Bankim Chatterjee Street-এ। বহু কবি, কথাসাহিত্যিক, সম্পাদক, শিক্ষক, গবেষক, চলচ্চিত্রকার ও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মীর পদচারণায় এটি কলকাতার বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পরিসর হয়ে উঠেছে।

কোনো সাহিত্য, শিল্প বা আন্দোলনের জন্ম এককভাবে একটি ঘরের ভেতর হয়েছে বলে দাবি করা কঠিন। কিন্তু কিছু জায়গা মানুষের দেখা হওয়া, মতের সংঘর্ষ, পরিকল্পনা এবং সৃষ্টির জন্য পরিবেশ তৈরি করে। College Street Coffee House তেমনই একটি জায়গা। এটি সব সৃষ্টির জন্মস্থান নয়; বহু সৃষ্টিশীল মানুষের স্মৃতি, বিতর্ক ও বন্ধুত্বের সাক্ষী।

তবে এত ইতিহাস জানা থাকলেও বাস্তবে প্রথমবার সেখানে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা কাগজের ইতিহাসের মতো নয়। সেটি শব্দ, ভিড়, বিস্ময় এবং নিজের ভেতরের বহুদিনের একটি ছবির সঙ্গে বাস্তবের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা।

আমার দেখা College Street Coffee House

আমি কলকাতার মানুষ হয়েও জীবনের দীর্ঘ সময় ভিলাই, ছত্তিশগড়ে কাটিয়েছি। আশ্চর্যের বিষয়, এত বছরেও College Street Coffee House দেখা হয়নি। অথচ “কফি হাউস” কথাটি শুনলেই মনের মধ্যে যে জায়গাটির ছবি ভেসে উঠত, সেটি ছিল এই Coffee House-ই।

সম্প্রতি কলকাতা ভ্রমণে সেই বহুদিনের ইচ্ছা পূরণের সুযোগ এলো। College Street-এর Coffee House-এ প্রথমবার প্রবেশ করলাম।

বাইরে থেকে প্রবেশদ্বারটি দেখে প্রথমে খুব চমক লাগেনি। কিছুটা দ্বিধা নিয়েই মনে হয়েছিল, “ও, এই নাকি সেই Coffee House!” এত বছরের কল্পনায় জায়গাটি যেন আরও নাটকীয় কোনো প্রবেশদ্বার নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করতেই আমার ভাবনা বদলে গেল। মনে হলো, এ যেন সমুদ্র। চারদিকে মানুষের কথার গর্জন। পুরীর সাগরতীরে দাঁড়িয়ে ঢেউয়ের যে একটানা শব্দ শুনেছিলাম, সেই স্মৃতি ফিরে এলো। এখানে জলের ঢেউ নেই; আছে অগণিত কণ্ঠের ওঠানামা। কোথাও তর্ক, কোথাও হাসি, কোথাও গল্প, কোথাও গভীর মনোযোগে কারও কথা শোনা।

এত বড় সভাঘর, অথচ একটি টেবিলও খালি নেই। তরুণ-তরুণী, প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া, ছাত্র, পরিবার, বন্ধুবান্ধব, নানা বয়স ও পরিচয়ের মানুষে ভরা পুরো জায়গা। মনে হলো, একটি শহরের ক্ষুদ্র সংস্করণ যেন এই এক ঘরের মধ্যে বসে আছে।

আমি ও আমার সঙ্গী দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম, কখন একটি টেবিল খালি হবে। শুধু আমরা নই, আরও অনেকে একই অপেক্ষায়। একটু পরে আমার সঙ্গী বলল, “চলো, ওপরতলায় গিয়ে দেখি জায়গা পাওয়া যায় কি না।”

ওপরে গিয়েও দেখি, কোনো টেবিল খালি নেই। কিন্তু সেখানেই চোখে পড়ল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। সামনের একটি টেবিলে বসে আছেন প্রায় আশি বছরের চারজন টগবগে যুবক। বয়সের হিসাবে তাঁরা বৃদ্ধ, কিন্তু তাঁদের কথায়, হাত নেড়ে তর্ক করার ভঙ্গিতে, হাসিতে এবং উচ্ছ্বাসে বার্ধক্যের চিহ্ন নেই। সামনে সামান্য খাবার, আর তার চেয়ে অনেক বেশি কথা।

তাঁদের দেখে মনে হলো, Coffee House মানুষকে বয়স ভুলিয়ে দেয় না; বরং বয়সের নিচে লুকিয়ে থাকা তরুণ মানুষটিকে আবার সামনে নিয়ে আসে।

শুধু নবজীবনের মানুষ নয়, যাঁরা জীবনের বিদায়বেলার দিকে অনেকটা এগিয়ে গেছেন, তাঁরাও এখানে আসেন। হয়তো পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে, হয়তো পরিচিত কোনো তর্ক আবার শুরু করতে, অথবা শুধু কয়েক ঘণ্টার জন্য সময়কে একটু ধীরে চলতে দিতে।

Coffee House-এর টেবিলে বয়সের হিসাব থাকে না। সেখানে আশি বছরের মানুষও আবার টগবগে যুবক হয়ে উঠতে পারেন।

এতদিন Coffee House-কে আমি গান, গল্প ও অন্যের স্মৃতির ভেতর দিয়ে চিনেছিলাম। সেদিন প্রথম বুঝলাম, জায়গাটির আসল আকর্ষণ তার দেয়াল, চেয়ার বা খাবারে সীমাবদ্ধ নয়। আকর্ষণটি তৈরি হয় বহু মানুষের একসঙ্গে কথা বলার শব্দে। একজন উঠে গেলে আরেকজন বসেন। একটি তর্ক শেষ হলে অন্য টেবিলে আরেকটি তর্ক শুরু হয়।

হয়তো সেই কারণেই Coffee House-এর আড্ডা কখনো সম্পূর্ণ শেষ হয় না। শেষ হয় শুধু নির্দিষ্ট কয়েকজন মানুষের একসঙ্গে বসার সময়।

College Street থেকে ভিলাই

College Street-এর সেই আড্ডা দেখে আমার নিজের বর্তমান আড্ডার কথাও মনে পড়ে। বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্থার আমরা ভিলাইয়ের একটি Coffee House-এ মিলিত হই। এক কোণের একটি টেবিল দখল করে চা, কফি আর সামান্য খাবার নিয়ে বসি।

আমরা বলি সাহিত্যচর্চা করতে যাচ্ছি। সাহিত্যচর্চা হয়ও। তবে আড্ডা হয় তার দশ গুণ। আর হয়তো সেখানেই Coffee House নামটির সার্থকতা।

আমাদের দলে থাকেন সমর, দুলাল, প্রকাশ, শুভেন্দু, পল্লব, দীপক, দেবনাথ, বাণী, গোবিন্দ, সোমালি এবং আমি, স্মৃতি। দেবনাথ অনেকটা নির্বাক শ্রোতা। তবে আড্ডায় নির্বাক শ্রোতারও আলাদা গুরুত্ব আছে। সবাই কথা বললে কথাগুলো শুনবে কে?

দুই-তিন ঘণ্টা ধরে আমরা নরক গুলজার করি। সাহিত্য, গান, পুরোনো দিনের স্মৃতি, নতুন লেখা, পরিচিত মানুষের গল্প, সমাজ, সংসার এবং কখনো কোনো অর্থই নেই এমন বিষয় নিয়েও আলোচনা চলতে থাকে। কাউকে সংবর্ধনা দেওয়ার উপলক্ষ এলে গান হয়, কখনো নৈশভোজও যোগ হয়।

এই আড্ডার মানুষগুলিও একদিন ছড়িয়ে যাবেন। কেউ হয়তো অন্য শহরে থাকবেন, কেউ অসুস্থ হবেন, কেউ আসতে পারবেন না। নতুন মানুষ এসে আমাদের পরিচিত টেবিলটিতে বসবেন। তাঁরা হয়তো আমাদের নামও জানবেন না।

তাতে কি আড্ডা শেষ হয়ে যাবে?

আমার মনে হয়, যাবে না। কারণ আড্ডা কোনো নির্দিষ্ট মানুষের স্থায়ী সম্পত্তি নয়। আমরা কিছু সময়ের জন্য তার অংশ হয়ে উঠি। তারপর আমাদের জায়গা অন্য কেউ নেন। College Street-এর বিশাল সভাঘর এবং ভিলাইয়ের আমাদের ছোট টেবিলের মধ্যে দূরত্ব অনেক। তবু তাদের ভেতরে একটি মিল আছে। মানুষ সেখানে শুধু খাবার বা পানীয়ের জন্য যান না। যান অন্য মানুষের কাছে বসতে, কথা বলতে এবং নিজের সময়ের কিছু অংশ ভাগ করে নিতে।

আড্ডা হারায় না, তার মানুষ বদলে যায়

একটি Coffee House-এর টেবিলে কত মানুষ আসেন, কতজন চলে যান। কারও স্বপ্ন পূরণ হয়, কারও হয় না। কেউ বহু বছর পর ফিরে আসেন, কেউ আর কোনোদিন আসেন না। পুরোনো একটি দল ভেঙে যায়, তার জায়গায় নতুন আরেকটি দল বসে।

স্থানটি থেকে যায়, কিন্তু তার ভেতরের মানুষ ও গল্প বদলে যেতে থাকে। হয়তো এ কারণেই Coffee House-কে শুধু রেস্তোরাঁ বলা যায় না। এটি মানুষের দেখা হওয়া, দূরে চলে যাওয়া, আবার ফিরে আসা এবং কথার মধ্যে বেঁচে থাকার এক দীর্ঘ মহাকাব্য।

কলকাতার রক, রাস্তার ক্যারাম বোর্ড, College Street-এর জনারণ্য কিংবা ভিলাইয়ের আমাদের ছোট টেবিল, যেখানে মানুষ কথার ভেতর দিয়ে একে অন্যের কাছে পৌঁছান, সেখানেই একটি কফি হাউস জন্ম নেয়। আড্ডা হারায় না; বদলে যায় শুধু তার মানুষ।

প্রকাশনা ও সম্পাদনা নোট

মূল লেখক: শ্রীমতী স্মৃতি দত্ত

প্রথম প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩, পুরোনো Ovizatri

বর্তমান সংস্করণ: গবেষণাসমৃদ্ধ হালনাগাদকৃত পুনঃপ্রকাশ

মূল ব্যক্তিগত স্মৃতি: লেখিকার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা

গবেষণা, তথ্য যাচাই ও সম্পাদনা: অভিযাত্রী সম্পাদনা প্যানেল

বর্তমান সংস্করণের কপিরাইট: অভিযাত্রী

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

১. প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস: Indian Coffee House। About Us। Albert Hall, ১৯৪২ সালে Coffee Board-এর উদ্যোগ, ১৯৪৭ সালে নামকরণ এবং ১৯৫৮ সালে পুনরায় চালুর তথ্য। https://indiancoffeehouse.in/about-usপ্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস পড়ুন

২. College Street শাখার সাংস্কৃতিক পরিচয়: Indian Coffee House। Kolkata Main Branch। Coffee House-এর অবস্থান, পরিচিত দর্শনার্থী এবং সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক আড্ডার তথ্য। https://www.indiancoffeehouse.in/our-branchs/main-branchশাখার তথ্য দেখুন

৩. গানের প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য: Saregama। Coffee Houser Sei Addata Aaj Aar Nei। কণ্ঠ: Manna Dey; গীতিকার: Gauriprasanna Mazumder; সুরকার: Suparnakanti Ghosh। https://sww1.saregama.com/song/coffee-houser-sei-addata-aaj-aar-nei_4947গানের তথ্য দেখুন

৪. গানটির সৃষ্টিপ্রক্রিয়া: Indian Express Bangla। “‘মান্নাকাকা বলেছিলেন, এ কিরকম গান?’ কফি হাউস নিয়ে আড্ডায় সুপর্ণকান্তি”। ১ মে ২০১৯। সুরকার সুপর্ণকান্তি ঘোষের স্মৃতিচারণভিত্তিক প্রতিবেদন। https://bengali.indianexpress.com/general-news/manna-dey-100-years-coffee-houser-adda-making-suparnakanti-ghosh-97692/প্রতিবেদনটি পড়ুন

৫. কলকাতার ঐতিহাসিক আড্ডা-সংস্কৃতির সহায়ক পাঠ: অতুল সুর। “কলকাতার আড্ডা ও মেয়ে মজলিস”। ৩০০ বছরের কলকাতা: পটভূমি ও ইতিকথা। বৈঠকখানা, পারিবারিক আসর ও চায়ের দোকানের আড্ডা সম্পর্কে ঐতিহাসিক আলোচনা। https://www.ebanglalibrary.com/lessons/%E0%A6%95%E0%A6%B2%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%86%E0%A6%A1%E0%A7%8D%E0%A6%A1%E0%A6%BE-%E0%A6%93-%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A7%87-%E0%A6%AE%E0%A6%9C%E0%A6%B2/সহায়ক পাঠটি পড়ুন

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
শ্রীমতী স্মৃতি দত্ত আমি স্মৃতি দত্ত। আদালতের পেশাগত জগৎ থেকে সাহিত্য ও সংগীতের সৃজনশীল পরিসর পর্যন্ত আমার পথচলা বিস্তৃত। পেশায় অ্যাডভোকেট হলেও লেখালেখিই আমার ভাবনা, অনুভূতি ও পর্যবেক্ষণ প্রকাশের সবচেয়ে আপন মাধ্যম। ছোটগল্প, অণুগল্প, জীবনী, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও ভ্রমণ নিয়ে লিখতে ভালোবাসি। কখনো একজন স্মরণীয় মানুষের জীবন আমাকে আকর্ষণ করে, কখনো একটি চলচ্চিত্র, আবার কখনো সংসারের খুব সাধারণ একটি সম্পর্কের মধ্যেই আমি গল্প খুঁজে পাই। আমি বঙ্গীয় সাহিত্যের সদস্য এবং কীবোর্ড বাজাতে ভালোবাসি। পাশাপাশি অ্যামওয়ে-সংশ্লিষ্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছি। আমার লেখা বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যাল ও টি.ভি শো’ এবং ‘লেনিন সাহেবের সাথে দেখা’। মানুষের জীবন, সময় ও স্মৃতির ভেতরে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো সহজ ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চাই।