‘একা’ কিন্তু ‘একলা’ নয়: পর্দা, নীরবতা ও সুচিত্রা সেনের নিজস্ব ভুবন
পাবনার রমা দাশগুপ্ত থেকে মহানায়িকা সুচিত্রা সেন: অভিনয়, উত্তম-সুচিত্রা জুটি, নীরবতা, স্বাধীনতা ও তাঁর স্থায়ী সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
জীবনী • চলচ্চিত্র • সংস্কৃতি
‘একা’ কিন্তু ‘একলা’ নয়: পর্দা, নীরবতা ও সুচিত্রা সেনের নিজস্ব ভুবন
পর্দায় তিনি ছিলেন লাখো দর্শকের পরিচিত মুখ। পর্দার বাইরে নিজের জীবনের দরজা কতটুকু খুলবেন, সেই সিদ্ধান্তও নিজের কাছেই রেখেছিলেন। দৃশ্যমানতা ও নীরবতার মাঝখানেই তৈরি হয়েছিল সুচিত্রা সেনের অনন্য ভুবন।
সম্পাদকীয় নোট: শ্রীমতী স্মৃতি দত্তের পূর্বপ্রকাশিত লেখার মূল অনুভব, ব্যক্তিগত স্মৃতি ও লেখকসত্তা সংরক্ষণ করে বর্তমান সংস্করণটি নতুন গবেষণা, তথ্যযাচাই এবং ব্যাপক সম্পাদকীয় পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রস্তুত করেছে অভিযাত্রী সম্পাদনা প্যানেল।
সুচিত্রা সেনের কথা লিখতে বসলে কলমে লাগাম পরানো কঠিন। উচ্ছ্বাসহীন হতে চাইলেও হওয়া যায় না। বিরাট ক্যানভাসে তুলি দিয়ে আঁকা একটি স্কেচের মতো তাঁর জীবন। সব রেখা স্পষ্ট নয়, সব রংও আমাদের জানা নয়। তবু পর্দায় তাঁর একবার তাকানো, সামান্য ঘাড় ফিরিয়ে নেওয়া কিংবা সেই ভুবনমোহিনী হাসি আজও কত স্মৃতির দরজা খুলে দেয়।
তিনি যখন পর্দায়, তখন হাজারো দর্শকের চোখ তাঁর দিকে। অথচ নিজের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প জনসাধারণের সামনে তুলে ধরতে তিনি অনাগ্রহী ছিলেন। চলচ্চিত্র থেকে সরে যাওয়ার পরে কয়েক দশক ধরে জনসমক্ষে প্রায় অনুপস্থিত থেকে তিনি নিজের চারপাশে এমন এক নীরবতা নির্মাণ করেছিলেন, যা তাঁকে নিয়ে কৌতূহল কমায়নি; বরং আরও নিবিড় করেছে।
কিন্তু সেই নীরবতাকে কি শুধু রহস্য বলে পড়ব? তাঁকে কি কেবল স্বেচ্ছানির্বাসিত একজন তারকা বলব? নাকি এটিও ছিল নিজের মুখ, সময়, গোপনীয়তা এবং জনপরিসরে উপস্থিত থাকার শর্ত নিজে নির্ধারণ করার বিরল সিদ্ধান্ত? সুচিত্রা সেনের জীবন ও কর্মের দিকে তাকালে এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
জন্মনাম: রমা দাশগুপ্ত
জন্ম: ৬ এপ্রিল ১৯৩১, তৎকালীন বৃহত্তর পাবনা
মৃত্যু: ১৭ জানুয়ারি ২০১৪, কলকাতা
প্রধান কর্মক্ষেত্র: বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্র
চলচ্চিত্রে কাজের সময়: ১৯৫২ থেকে ১৯৭৮
প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র: সাধারণভাবে ১৯৫৩ সালের সাত নম্বর কয়েদি উল্লেখ করা হয়
বিশেষ পরিচিতি: বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়িকা এবং উত্তম-সুচিত্রা জুটির অন্যতম নির্মাতা
সংক্ষেপে সুচিত্রা সেন
পাবনার রমা দাশগুপ্ত
সুচিত্রা সেনের জন্মনাম রমা দাশগুপ্ত। ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল তৎকালীন বৃহত্তর পাবনা অঞ্চলে তাঁর জন্ম। আঞ্চলিক গবেষণা ও প্রতিবেদনে বর্তমান সিরাজগঞ্জের বেলকুচির ভাঙাবাড়িকে তাঁর জন্মস্থান এবং পাবনা শহরকে শৈশব ও বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তাঁর বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত এবং মা ইন্দিরা দেবী। পাবনায় পরিবারের সঙ্গে তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছিল। দেশভাগের সময় পরিবারটি পূর্ববঙ্গ ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে। পরবর্তী জীবন ও কর্মজীবনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে কলকাতা।
১৯৪৭ সালে তিনি দিবানাথ সেনকে বিয়ে করেন। বিয়ের কয়েক বছর পরে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন এবং পরবর্তী সময়ে পরিবার ও অভিনয়জীবন পাশাপাশি পরিচালনা করেন। তাঁদের একমাত্র সন্তান মুনমুন সেন পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
জনপ্রিয়তার কেন্দ্রে পৌঁছেও সুচিত্রা সেন শুধু কারও স্ত্রী, কারও পুত্রবধূ বা কারও মা হয়ে থাকেননি। চলচ্চিত্রে তিনি নিজের আলাদা নাম, কর্মপরিসর এবং কর্তৃত্বপূর্ণ উপস্থিতি নির্মাণ করেছিলেন।
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠিত জীবনীতে তাঁর জন্মস্থান পাবনা হিসেবে উল্লেখিত। আঞ্চলিক অনুসন্ধানে বর্তমান সিরাজগঞ্জের বেলকুচি অঞ্চলের ভাঙাবাড়ি গ্রামকে আরও নির্দিষ্ট জন্মস্থান এবং পাবনা শহরকে বেড়ে ওঠার কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
জন্মস্থানের পরিচয়
রমা থেকে সুচিত্রা
চলচ্চিত্রে প্রবেশের সময় রমা সেন হয়ে ওঠেন সুচিত্রা সেন। ১৯৫২ সালে নির্মিত তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র শেষ কোথায় মুক্তি পায়নি। ১৯৫৩ সালের সাত নম্বর কয়েদি তাঁর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত কাজ হিসেবে সাধারণভাবে উল্লেখিত।
একই বছরে নির্মল দে পরিচালিত সাড়ে চুয়াত্তর-এ উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর উপস্থিতি বাংলা চলচ্চিত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ছবিটি শুধু সফল প্রহসন ছিল না; এর মধ্য দিয়েই দর্শক এমন একটি যুগল উপস্থিতি চিনতে শুরু করেন, যা পরবর্তী দুই দশকে বাংলা জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও আধুনিকতার ভাষা বদলে দেয়।
১৯৫৪ সালের অগ্নিপরীক্ষা এই জুটির রোমান্টিক পরিচয়কে আরও দৃঢ় করে। সে সময় উত্তম কুমারের কর্মজীবনও স্থায়ী সাফল্যের সন্ধানে ছিল। সুচিত্রা ও উত্তমের সম্মিলিত পর্দা-উপস্থিতি দুজনকেই নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
একটি গান, একটি স্মৃতি, আবার পঞ্চদশী হয়ে ওঠা
মূল লেখায় শ্রীমতী স্মৃতি দত্ত লিখেছিলেন, অগ্নিপরীক্ষা-য় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে “গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু” তাঁকে অশীতিপর বয়সেও পঞ্চদশী কিশোরীর অনুভবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
চলচ্চিত্রের ইতিহাস শুধু মুক্তির সাল, পরিচালক কিংবা পুরস্কারের তালিকা দিয়ে তৈরি হয় না। কখনো একটি গান, একটি দৃষ্টি বা আলো-ছায়ায় ধরা মুখ কোনো দর্শকের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে সময় পেরিয়েও তার বয়স বাড়ে না। সুচিত্রা সেনকে নিয়ে আমার অনুভবের একটি বড় অংশ সেই ব্যক্তিগত স্মৃতির ভেতরেই বাস করে।
তাঁর হাসিটি সহজাত ছিল কি না, ক্যামেরা কতটা নির্মাণ করেছিল, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলতে পারে। কিন্তু দর্শকের কাছে সেই হাসি শুধু সৌন্দর্য ছিল না। কখনো তা আত্মবিশ্বাস, কখনো সংকোচ, কখনো প্রত্যাখ্যান, আবার কখনো অপ্রাপ্যতার ভাষা হয়ে উঠেছিল।
উত্তম-সুচিত্রা: জুটির চেয়েও বড় এক সাংস্কৃতিক ভাষা
উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন প্রায় ৩০টি চলচ্চিত্রে একসঙ্গে অভিনয় করেন। অগ্নিপরীক্ষা, শাপমোচন, সাগরিকা, হারানো সুর, ইন্দ্রাণী, চাওয়া পাওয়া, সপ্তপদী ও বিপাশা-র মতো চলচ্চিত্র তাঁদের যুগল পরিচয়কে বাংলা চলচ্চিত্রের স্থায়ী সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে পরিণত করে।
তাঁদের রোমান্টিকতা শুধু সংলাপে তৈরি হয়নি। পাশাপাশি হাঁটা, সামান্য বিরতি, অভিমানী দৃষ্টি, দূরত্ব বজায় রেখে কাছে আসা এবং ক্যামেরার সামনে দুই মুখের ছন্দ সেই রোমান্টিকতাকে নির্মাণ করেছে। দর্শক তাঁদের চরিত্রের প্রেমে পড়েছে, আবার চরিত্রগুলোর মধ্যে অভিনেতা দুজনকেও কল্পনা করেছে।
তাঁদের পোশাক, চুলের ধরন, ছবি তোলার ভঙ্গি এবং একে অপরের দিকে তাকানোর ধরনও দর্শকের রুচিতে প্রভাব ফেলেছিল। এভাবেই একটি চলচ্চিত্রজুটি পর্দার সীমা ছাড়িয়ে দৈনন্দিন জীবনের সৌন্দর্যবোধ ও রোমান্টিক কল্পনার অংশ হয়ে ওঠে।
উত্তম-সুচিত্রা জুটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অসামান্য। কিন্তু সুচিত্রা সেনের শিল্পীসত্তাকে শুধু এই জুটির মধ্যে সীমিত করলে দীপ জ্বেলে যাই, উত্তর ফাল্গুনী, সাত পাকে বাঁধা, Mamta ও Aandhi-র স্বতন্ত্র অভিনয় অনুধাবন করা যায় না।
জুটির ভেতরেও স্বতন্ত্র দুই শিল্পী
গ্ল্যামারের আড়ালে অভিনয়ের সংযম
সুচিত্রা সেনের গ্ল্যামার নিয়ে আলোচনা কখনো শেষ হবে না। তাঁর পোশাক, হাসি, দৃষ্টি, মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার ভঙ্গি এবং ক্যামেরার সামনে নিজের উপস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাঁকে সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করেছিল। কিন্তু গ্ল্যামারই তাঁর অভিনয়ের একমাত্র ভাষা নয়।
অনেক দৃশ্যে উচ্চকণ্ঠ আবেগের বদলে চোখ, বিরতি ও নীরবতা ব্যবহার করেছেন তিনি। সংলাপ বলার আগে বা পরে সামান্য থেমে যাওয়া চরিত্রের অপ্রকাশিত সংকটকে দৃশ্যমান করত। তাঁর মুখের নিবিড় শট বা close-up-এ এই সংযম বিশেষভাবে কার্যকর হয়েছে।
১৯৫৯ সালের দীপ জ্বেলে যাই-এ রাধা মিত্র এমন একজন সেবিকা, যিনি চলচ্চিত্রের কাহিনিতে রোগীর আরোগ্যের জন্য আবেগঘন ভূমিকা পালন করতে গিয়ে নিজেই মানসিক ভাঙনের দিকে এগিয়ে যান। চরিত্রটির ভেতরের বিপর্যয় সুচিত্রা মুখের আলো-অন্ধকার, নীরবতা ও সংযত অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে নির্মাণ করেন।
১৯৬৩ সালের উত্তর ফাল্গুনী-তে তিনি পান্নাবাঈ ও সুপর্ণার দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন। এক চরিত্রে সমাজের অবজ্ঞার মুখোমুখি এক বাইজি-মা, অন্য চরিত্রে তাঁর শিক্ষিত আইনজীবী কন্যা। মাতৃত্ব, সামাজিক সম্মান, আত্মত্যাগ ও পরিচয়ের এই দ্বৈততা তাঁকে জুটিনির্ভর রোমান্টিক নায়িকার সীমানা থেকে বহু দূরে নিয়ে যায়।
একই বছরের সাত পাকে বাঁধা-য় অর্চনার চরিত্রে তিনি দাম্পত্য, শ্রেণিগত অসমতা, মাতৃপ্রভাব এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সংঘাতকে ধারণ করেন। এই অভিনয়ের জন্য তিনি মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর রৌপ্য সম্মান, Silver Prize for Best Actress, অর্জন করেন।
নির্বাচিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের সময়রেখা
১৯৫৩: সাত নম্বর কয়েদি, সাড়ে চুয়াত্তর
১৯৫৪: অগ্নিপরীক্ষা
১৯৫৫: Devdas, শাপমোচন, সবার উপরে
১৯৫৬: সাগরিকা
১৯৫৭: হারানো সুর, পথে হলো দেরী, Musafir
১৯৫৮: রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত, ইন্দ্রাণী
১৯৫৯: দীপ জ্বেলে যাই, চাওয়া পাওয়া
১৯৬১: সপ্তপদী
১৯৬২: বিপাশা
১৯৬৩: সাত পাকে বাঁধা, উত্তর ফাল্গুনী
১৯৬৬: Mamta
১৯৬৭: গৃহদাহ
১৯৬৯: কমললতা
১৯৭১: আলো আমার আলো
১৯৭৪: দেবী চৌধুরাণী
১৯৭৫: Aandhi, প্রিয় বান্ধবী
১৯৭৬: দত্তা
১৯৭৮: প্রণয় পাশা
হিন্দি চলচ্চিত্রে সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি
সুচিত্রা সেনের হিন্দি চলচ্চিত্রের সংখ্যা বাংলা ছবির তুলনায় কম, কিন্তু কয়েকটি চরিত্র তাঁর সর্বভারতীয় পরিচয় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৫ সালে বিমল রায়ের Devdas-এ তিনি পার্বতীর ভূমিকায় দিলীপ কুমারের বিপরীতে অভিনয় করেন।
এরপর Musafir, Champakali, Bombai Ka Babu এবং Mamta-র মতো চলচ্চিত্রে কাজ করেন। Mamta ছিল তাঁর বাংলা উত্তর ফাল্গুনী-র হিন্দি পুনর্নির্মাণ।
গুলজার পরিচালিত ১৯৭৫ সালের Aandhi-তে আরতি দেবীর ভূমিকায় তিনি রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও জনজীবনের দ্বন্দ্বকে সংযত শক্তিতে ধারণ করেন। চরিত্রটির সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাদৃশ্য নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক থাকলেও চলচ্চিত্রটি তাঁর সরাসরি জীবনী ছিল না।
স্বাধীন সিদ্ধান্তের সুচিত্রা
জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও সুচিত্রা সেন চলচ্চিত্র নির্বাচন, কাজের সময় এবং পর্দায় উপস্থিতির শর্ত সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তাঁকে নিয়ে প্রচলিত বহু গল্পের মধ্যে কিছু নির্ভরযোগ্য সংবাদবিবরণ ও স্মৃতিচারণে অনুসরণ করা যায়, আবার অনেক গল্পের মূল উৎস অস্পষ্ট।
ষাটের দশকে সত্যজিৎ রায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবী চৌধুরাণী অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। নামভূমিকায় সুচিত্রা সেনকে নেওয়ার কথা ছিল। শুটিংয়ের সময় অন্য চলচ্চিত্রে কাজ না করা এবং প্রয়োজনীয় তারিখ সংরক্ষণ নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় তিনি প্রস্তাবটি গ্রহণ করেননি। সত্যজিৎ রায়ও পরে প্রকল্পটি আর নির্মাণ করেননি।
সুচিত্রা সেন অবশ্য ১৯৭৪ সালে দীনেন গুপ্ত পরিচালিত দেবী চৌধুরাণী-তে নামভূমিকায় অভিনয় করেন। আলোচিত ঘটনাটি শুধু একজন খ্যাতিমান পরিচালকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের গল্প নয়; নিজের সময় ও কর্মপরিধির শর্ত নির্ধারণে একজন তারকার অবস্থানও প্রকাশ করে।
অমিতাভ চৌধুরীর স্মৃতিচারণের ভিত্তিতে প্রকাশিত সংবাদবিবরণে রাজ কাপুরের একটি চলচ্চিত্রের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কথাও পাওয়া যায়। সেই বয়ান অনুযায়ী, প্রস্তাব দেওয়ার নাটকীয় ভঙ্গি সুচিত্রার পছন্দ হয়নি। মূল স্মৃতিচারণের পূর্ণ পাঠ পরীক্ষা ছাড়া তাঁর নামে প্রচলিত দীর্ঘ সংলাপ হুবহু পুনরাবৃত্তি না করাই নিরাপদ।
সুচিত্রা সেনকে ঘিরে বহু আকর্ষণীয় ঘটনা জীবনী, স্মৃতিচারণ ও সংবাদে ছড়িয়ে আছে। প্রত্যক্ষ স্মৃতির মূল্য থাকলেও বই, সাক্ষাৎকার, পৃষ্ঠা ও প্রেক্ষাপট শনাক্ত না করে সেসব ঘটনাকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য বা হুবহু উদ্ধৃতি হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
স্মৃতিচারণ ও প্রতিষ্ঠিত তথ্য এক নয়
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় সম্মান
১৯৬৩ সালে অজয় কর পরিচালিত সাত পাকে বাঁধা-য় অর্চনা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সুচিত্রা সেন মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর রৌপ্য সম্মান, Silver Prize for Best Actress, লাভ করেন।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অভিনয়ের পুরস্কার পাওয়া প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী হিসেবে এই অর্জনটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। পুরস্কারটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না; বাংলা চলচ্চিত্রের অভিনয়কে আন্তর্জাতিক পরিসরে দৃশ্যমান করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী প্রদান করে। ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে বঙ্গবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করে; তিনি সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি।
দাদাসাহেব ফালকে সম্মানকে কেন্দ্র করে তাঁর নাম আলোচিত হলেও জনসমক্ষে এসে সম্মান গ্রহণে তিনি সম্মত হননি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ঘটনাটির প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশিত বিবরণ একরূপ নয়।
তাঁর অভিনয়ের উত্তরাধিকার শুধু স্মৃতিতে নয়, চলচ্চিত্র সংরক্ষণেও নতুন জীবন পাচ্ছে। ভারত সরকারের National Film Heritage Mission-এর অধীনে সাত পাকে বাঁধা ডিজিটালভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
২০২৬ সালে পুনরুদ্ধার করা সাত পাকে বাঁধা আবার মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। যে উৎসব ১৯৬৩ সালে সুচিত্রা সেনকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছিল, তেষট্টি বছর পরে সেই পরিসরেই চলচ্চিত্রটির নতুনভাবে ফিরে আসা তাঁর অভিনয়-উত্তরাধিকারের তাৎপর্যকে আবার সামনে আনে।
তেষট্টি বছর পর মস্কোয় প্রত্যাবর্তন
ক্যামেরার বাইরে তাঁর নির্বাচিত জীবন
১৯৭৮ সালের প্রণয় পাশা সুচিত্রা সেনের শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র। এরপর তিনি অভিনয় থেকে সরে যান এবং জনসমক্ষে উপস্থিতি প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। কয়েক দশক ধরে সাক্ষাৎকার, পুরস্কার অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্রজগতের আনুষ্ঠানিকতা এবং ক্যামেরা থেকে দূরে ছিলেন।
কিন্তু জনসমক্ষে অনুপস্থিতি মানেই তিনি চারপাশের জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। দীর্ঘদিনের পরিচিত ও জীবনীকার গোপালকৃষ্ণ রায়ের স্মৃতিতে সীমিত বন্ধুমহলে যোগাযোগ রাখা, পরিচিত এলাকায় হাঁটতে বের হওয়া, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং রসবোধে ভরা এক ভিন্ন সুচিত্রার আভাস পাওয়া যায়।
পরবর্তী জীবনে রামকৃষ্ণ ভাবধারা ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথাও বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত সাধনার বিস্তারিত বিষয়ে তিনি নিজে জনসমক্ষে খুব কমই বলেছেন। তাই তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনকে নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি না করে সংযত থাকা প্রয়োজন।
তাঁর অন্তরালকে শুধু রহস্য বা খেয়াল হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। চলচ্চিত্রশিল্প একজন তারকার মুখকে জনসম্পদে পরিণত করতে চায়। দর্শকও প্রিয় শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন জানতে চান। সুচিত্রা সেন সেই দাবির সামনে নিজের সীমানা টেনে দিয়েছিলেন।
কখন ক্যামেরার সামনে থাকবেন, কখন থাকবেন না, কোন অনুষ্ঠানে যাবেন এবং জীবনের কতটুকু অন্যকে জানতে দেবেন, সে সিদ্ধান্ত তিনি নিজের কাছেই রেখেছিলেন। বিশেষত একজন নারী তারকার বয়স, চেহারা ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অবিরাম বিচার চলা শিল্পে তাঁর এই সিদ্ধান্তকে নিজের দৃশ্যমানতার ওপর নিয়ন্ত্রণ হিসেবেও পড়া যায়।
‘একা’ কিন্তু ‘একলা’ নয়
সুচিত্রা সেন জনসমক্ষে একা হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু একলা ছিলেন কি? তাঁর চারপাশে পরিবার, নির্বাচিত কয়েকজন বন্ধু, আধ্যাত্মিক অনুশীলনের পরিসর এবং অসংখ্য চরিত্রের দীর্ঘ সঙ্গ ছিল।
পর্দায় তিনি কখনো তাপসী, কখনো রিনা ব্রাউন, কখনো রাধা, কখনো অর্চনা, কখনো পান্নাবাঈ ও সুপর্ণা, কখনো আরতি দেবী। বাস্তবের সুচিত্রা ক্যামেরা থেকে দূরে গেছেন, কিন্তু চলচ্চিত্রের সুচিত্রা দর্শকের স্মৃতি থেকে সরে যাননি।
তাঁর নীরবতার সব ব্যাখ্যা আমাদের জানা নেই। হয়তো জানার প্রয়োজনও নেই। কিছু দরজা বন্ধ থাকার অধিকার তাদের ভেতরে থাকা মানুষেরই।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
জীবনের শেষ কয়েক দশক সুচিত্রা সেন কলকাতায় ব্যক্তিগত পরিসরে কাটান। নির্বাচিত কয়েকজনের বাইরে তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ খুব কম মানুষেরই হয়েছিল।
শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতায় সুচিত্রা সেনের মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁকে ঘিরে কৌতূহল শেষ হয়নি। তবে ব্যক্তিগত জীবনের অজানা দরজা ভাঙার চেষ্টা না করে তাঁর চলচ্চিত্র, অভিনয়ের ভাষা এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাকে সম্মান করাই সম্ভবত তাঁকে স্মরণ করার অধিক মর্যাদাপূর্ণ পথ।
সুচিত্রা সেনকে ঘিরে মুগ্ধতা এখনো শেষ হয়নি। শেষ হওয়ার কথাও নয়। তবে তাঁর রহস্যের দরজা ভাঙাই আমাদের একমাত্র কাজ নয়। পর্দায় একজন নারী কীভাবে নিজের উপস্থিতিকে শক্তিতে রূপ দেন, জনপ্রিয় জুটির মধ্যেও কীভাবে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠেন এবং খ্যাতির কেন্দ্র থেকে সরে গিয়েও নিজের পরিচয়ের ওপর অধিকার রাখেন, সুচিত্রা সেনের জীবন সেই প্রশ্নগুলো আমাদের সামনে রেখে যায়। তিনি ‘একা’ হয়েছিলেন, কিন্তু ‘একলা’ ছিলেন কি না, তার সম্পূর্ণ উত্তর হয়তো তাঁর কাছেই থেকে গেছে।
১. Suhrid Sankar Chattopadhyay, Frontline
“Suchitra Sen: Reclusive Legend.” ২২ জানুয়ারি ২০১৪। সুচিত্রা সেনের কর্মজীবন, উত্তম-সুচিত্রা জুটি, জনজীবন থেকে সরে যাওয়া এবং বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর সাংস্কৃতিক প্রভাব।
Frontline-এ উৎসটি দেখুন ২. Cinemaazi
“Suchitra Sen: Artists.” জন্ম, চলচ্চিত্রে প্রবেশ, উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র, উত্তম কুমারের সঙ্গে কাজ, আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননার প্রামাণ্য পরিচিতি।
Cinemaazi-তে সুচিত্রা সেনের প্রোফাইল দেখুন ৩. The Hindu
“Mamata Remembers Suchitra Sen on Her Birthday.” ৬ এপ্রিল ২০১৫। জন্ম, মৃত্যু, বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্র এবং বঙ্গবিভূষণ সম্পর্কিত তথ্য।
The Hindu-তে উৎসটি দেখুন ৪. Press Trust of India, Business Standard
“Suchitra Said ‘No’ to Satyajit Ray, Raj Kapoor.” ১৭ জানুয়ারি ২০১৪। সত্যজিৎ রায়ের পরিকল্পিত দেবী চৌধুরাণী এবং রাজ কাপুরের প্রস্তাবের বিবরণ।
Business Standard-এ প্রতিবেদনটি দেখুন ৫. The Indian Express
“When Suchitra Sen Refused to Work with Raj Kapoor.” ৬ এপ্রিল ২০২৩। অমিতাভ চৌধুরীর স্মৃতিচারণের ভিত্তিতে রাজ কাপুরের প্রস্তাব ও সঞ্জীব কুমারের সঙ্গে বন্ধুত্বের বিবরণ।
The Indian Express-এ উৎসটি দেখুন ৬. Padma Awards, Government of India
১৯৭২ সালের Padma Awards record। সুচিত্রা সেনের পদ্মশ্রী সম্মান সম্পর্কিত সরকারি পুরস্কার-তথ্য।
সরকারি Padma Awards database দেখুন ৭. The Telegraph
“‘Saat Pake Bandha’ Does a Full Circle.” ২০ এপ্রিল ২০২৬। ১৯৬৩ সালের মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পুরস্কার এবং National Film Heritage Mission-এর অধীন চলচ্চিত্রটির পুনরুদ্ধার ও পুনঃপ্রদর্শন।
The Telegraph-এ প্রতিবেদনটি দেখুন ৮. The Daily Star
“Suchitra Sen: How a Girl from Pabna Became South Asia’s Biggest Superstar.” ১৮ জানুয়ারি ২০২৪। পাবনা থেকে চলচ্চিত্রে যাত্রা, অভিনয় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
The Daily Star-এ উৎসটি দেখুন ৯. United News of Bangladesh
“Suchitra Sen Birth Anniversary: Remembering the Journey from Pabna to Cinematic Greatness.” ৬ এপ্রিল ২০২৬। অভিনয়রীতি, নির্বাচিত চলচ্চিত্র এবং সুচিত্রা সেনের সাংস্কৃতিক প্রভাব।
UNB-তে উৎসটি দেখুন ১০. IANS, reproduced by DNA India
“Of Kisses, Whims and Pleasant Memories: Biographer Recalls Times with Suchitra Sen.” ১৭ জানুয়ারি ২০১৪। জীবনীকার গোপালকৃষ্ণ রায়ের স্মৃতিতে সুচিত্রা সেনের সীমিত বন্ধুমহল, দৈনন্দিনতা ও রসবোধ।
প্রতিবেদনটি দেখুন শেষকথা
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0