ছোটগল্প: পাঁচ আসনের আকাশযান
সময় ফুরোনোর আগে একটি পরীক্ষাধীন সিরাম হাসপাতালে পৌঁছাতে পাঁচ যাত্রীকে ভরসা করতে হয় সংকেতহীন এক আকাশযান ও অমীমাংসিত স্মৃতির ওপর।
মানুষের জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব কি কয়েকজনের মধ্যে ভাগ হয়ে থাকে, নাকি সংকটের শেষ মুহূর্তে একজনকেই চালকের আসনে বসতে হয়?
প্রশ্নটি তখনো আমার মাথায় আসেনি।
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম দুটি মাটির ঘরের মাঝখানের সরু উঠানে। একটি ঘরের দেয়ালে নতুন মাটির প্রলেপ। অন্যটির গায়ে পুরোনো ফাটল, যার ভেতর সন্ধ্যার ছায়া জমছিল। উঠানের এক পাশে বাঁশঝাড়। অন্য পাশে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া একটি কড়ইগাছ। তার শেকড় মাটির ওপরে এমনভাবে ছড়িয়ে ছিল, যেন বহু বছর ধরে বাড়িটিকে নিচে চেপে ধরে রেখেছে।
আমরা সেখানে অস্থায়ীভাবে উঠেছিলাম।
সামনের ঘরে বাড়ির প্রবীণ মালিক দম্পতি থাকতেন। পেছনের ঘরটি আমাদের দেওয়া হয়েছিল। বাবা তখন মহানগরের একটি হাসপাতালে। তাঁর শরীরে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ প্রচলিত চিকিৎসায় থামছিল না।
চিকিৎসকেরা আশা ছেড়ে দিতে বলেননি।
আশার কথাও বলেননি।
মা সকাল থেকে বাইরে। কোথায় গেছেন, যাওয়ার আগে স্পষ্ট করে বলেননি। শুধু বলে গিয়েছিলেন, বাবা রাতে কিছু খেতে চাইলে যেন পাতলা ভাত তৈরি থাকে। তিনি ফিরেই মহানগরের উদ্দেশে রওনা হবেন।
মাটির ঘরের এক কোণে একটি আধুনিক বৈদ্যুতিক রান্নার যন্ত্র রাখা ছিল।
ঘরটির কোনো কিছুর সঙ্গে যন্ত্রটির মিল নেই। চকচকে ধাতব শরীর, কালো ঢাকনা এবং সামনের দিকে ছোট একটি নিয়ন্ত্রণপর্দা। নিচের অংশে ধুলোয় আধমোছা একটি চিহ্ন।
আমি ঝুঁকে দেখলাম।
চিহ্নটি আগে কোথাও দেখেছি বলে মনে হলো। অক্ষর নয়, আবার নিছক নকশাও নয়। পাশাপাশি বসানো কয়েকটি রেখা এবং তাদের মাঝখানে ছোট একটি বৃত্ত।
কোথায় দেখেছি, মনে পড়ল না।
যন্ত্রের ভেতরে চাল ও জল ঢেলে সেটি চালু করলাম।
প্রথমে মৃদু গুঞ্জন উঠল। তারপর জলের গায়ে ছোট ছোট বুদ্বুদ দেখা দিল। চালগুলো ধীরে ঘুরতে শুরু করল। সামনের লাল বাতিটি একবার জ্বলে নিভে আবার স্থির হয়ে রইল।
আমি মাটির মেঝেতে বসে যন্ত্রটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
বাবা হাসপাতালে।
মা অজানা কোথাও ছুটছেন।
আর আমি চাল ও জল গরম করছি।
কাজটি খুব ছোট মনে হচ্ছিল। কিন্তু কিছু না করার চেয়ে ছোট কিছু করা ভালো। অন্তত পরে নিজেকে বলতে পারব, আমি পুরো সময় বসে ছিলাম না।
কিছুক্ষণ পর ঢাকনা কাঁপতে শুরু করল।
ভেতরে জল উপচে পড়ার মতো শব্দ হচ্ছে। লাল বাতিটি ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে মাটির দেয়ালে কেঁপে উঠছে। একসময় পোড়া ধাতুর গন্ধ পেলাম।
যন্ত্রটি নষ্ট হলে বাড়ির মালিককে কী বলব?
আমি দ্রুত সংযোগ বন্ধ করে দিলাম।
গুঞ্জন থেমে গেল। ঢাকনাও শান্ত হলো। কিন্তু লাল বাতিটি সঙ্গে সঙ্গে নিভল না। কয়েক মুহূর্ত দেয়ালের ওপর অস্থির আলো ছড়িয়ে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেল।
ঢাকনা তুলে দেখলাম, চাল পুরোপুরি সিদ্ধ হয়নি। জলও শুকায়নি।
কাঁচা আর রান্নার মাঝখানে সবকিছু থেমে আছে।
মা ফিরলেন সন্ধ্যা সাতটা চৌদ্দ মিনিটে।
তাঁর শাড়ির নিচের দিকে কাদা। চোখে ক্লান্তি। কিন্তু হাঁটার ভঙ্গিতে এমন স্থিরতা, দেখে মনে হলো যে কাজের জন্য বেরিয়েছিলেন, সেটি অন্তত অসম্পূর্ণ রেখে আসেননি।
আমি যন্ত্রটির দিকে দেখিয়ে বললাম, “চাল আর জল দিয়ে রেখেছিলাম। কাজ কিছুটা এগিয়েছে।”
মা ঢাকনা তুলে একবার দেখলেন।
কিছু বললেন না।
হাতের পুরোনো কাপড়ের ব্যাগটি বিছানায় রেখে ভেতর থেকে একটি স্বচ্ছ তাপরোধী বাক্স বের করলেন। বাক্সের মধ্যে ছোট একটি কাচের শিশি। ভেতরের তরল বর্ণহীন। কিন্তু আলো পড়লে তার মধ্যে সূক্ষ্ম নীল রেখা দেখা যায়।
“এটা কী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
মা প্রথমে দরজার দিকে তাকালেন। তারপর নিচু কণ্ঠে বললেন, “তোমার বাবার হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে।”
“ওষুধ?”
“এখনো ওষুধ বলা যাচ্ছে না।”
“তাহলে?”
“পরীক্ষাধীন একটি সিরাম।”
আমি শিশিটির দিকে তাকিয়ে রইলাম।
“কোথায় পেলে?”
মা জানালার বাইরে উত্তর দিকে তাকালেন।
সেখানে ধানখেত, বাঁশঝাড় এবং বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি ইটভাটা ছাড়া আর কিছু নেই।
“গবেষণাকেন্দ্র থেকে।”
“কোন গবেষণাকেন্দ্র?”
“ওই দিকেই।”
আমি আবার বাইরে তাকালাম।
“ওখানে তো কোনো ভবন নেই।”
মা এবার আমার দিকে তাকালেন।
এটুকুই বললেন।
সংগ্রহের পর সিরামটি সীমিত সময় কার্যকর থাকবে। রাতের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারলে আর ব্যবহার করা যাবে না।
আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম।
মহানগর এখান থেকে কয়েক ঘণ্টার পথ। গ্রামের রাস্তা পেরিয়ে মূল সড়কে পৌঁছাতেই অনেক সময় লাগবে। তবু বিষয়টিকে তখনো অসম্ভব মনে হয়নি।
একটি বাস পেলেই হবে।
আমি তখনো জানতাম না, সেদিন রাতের কোনো বাসই আমাদের গন্তব্যকে নিজের গন্তব্য বলে মেনে নেবে না।
আধা ঘণ্টার মধ্যে আমার ছোট ভাই নিলয় এল।
তার সঙ্গে দুজন বন্ধু, তৃষা ও আদিব। তারা নিলয়ের সঙ্গে চিকিৎসাসেবার প্রশিক্ষণ নিয়েছে। তিনজনের মধ্যে এমন একটি বোঝাপড়া ছিল, যার জন্য প্রতিটি সিদ্ধান্ত উচ্চারণ করতে হয় না।
আমার সঙ্গে যোগ দিল বয়সে ছোট সহকর্মী নাঈম এবং আরও একজন পুরোনো পরিচিত।
নামটি তখন আমার জানা ছিল।
পরে আর মনে রাখতে পারিনি।
সব মিলিয়ে আমরা ছয়জন।
অন্তত আমি ছয়জনই গুনেছিলাম।
মা তাপরোধী বাক্সটি নিলয়ের হাতে দিলেন। নিলয় পর্দার তাপমাত্রা দেখে তৃষাকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দিল। আদিবকে বলল কাছের সড়ক দিয়ে কোন বাস চলতে পারে, তা খুঁজে দেখতে। তারপর হাসপাতালে ফোন করে সিরাম পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময় জানাল।
কেউ তাকে এসব করতে বলেনি।
আগে কোথাও গেলে নিলয় সাধারণত আমার পাশে বা পেছনে থাকত। সেদিন সে নিজেই সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সময় হিসাব করল। দায়িত্ব ভাগ করল। গন্তব্যের কথা বলল।
প্রথমবার তাকে শুধু ছোট ভাই মনে হলো না।
এই যাত্রায় সে আমার সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সম্ভবত আমার চেয়েও বেশি।
আমার ভেতরে নীরব গর্ব জন্ম নিল। তাকে কিছু বললাম না। বড় ভাইদের কিছু উপলব্ধি মুখে বলতে দেরি হয়। কখনো সেই দেরির কোনো প্রয়োজনও থাকে না।
আমরা গ্রামের নির্জন রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করলাম।
পরিকল্পনা ছিল কাছের বাজার থেকে মহানগরগামী বাস ধরব। কিন্তু মূল সড়কের এক অংশে দুর্ঘটনা ঘটায় নিয়মিত যানবাহন অন্য পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুরোনো সংযোগসড়ক দিয়ে কিছু বাস আসতে পারে, এই আশায় আমরা বাজারে না গিয়ে সেদিকেই এগোলাম।
রাস্তার দুই পাশে ধানখেত।
আকাশে সন্ধ্যার শেষ আলো। বাতাস নেই। ধানের শিষগুলো স্থির। আমরা দ্রুত হাঁটছি, কিন্তু সামনের বাঁকটি যেন একই দূরত্বে রয়ে যাচ্ছে।
প্রথম বাসটি এল রাত আটটার কিছু আগে।
দূরে দুটি আলো দেখা দিল। তারপর ভারী ইঞ্জিনের শব্দ। গ্রামীণ রাস্তার তুলনায় বাসটি অস্বাভাবিক বড় মনে হচ্ছিল।
আমরা সবাই হাত তুললাম।
বাস পুরোপুরি থামল না। চালক জানালা খুলে গন্তব্য জানতে চাইলেন।
নিলয় বলল, “মহানগর। জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী আছে।”
চালক পাশে থাকা সহকারীর সঙ্গে কথা বললেন। তারপর মাথা নাড়লেন।
“এই পথে যাওয়ার অনুমতি নেই।”
“বাড়তি ভাড়া দেব,” দলের কেউ বলল।
“ভাড়ার সমস্যা নয়।”
আমি সামনে এগিয়ে গেলাম।
“একজন রোগীর জন্য সিরাম নিয়ে যাচ্ছি। রাতের মধ্যে পৌঁছাতে হবে।”
চালক কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন, “দুঃখিত।”
দরজা খুললেন না।
বাসটি চলে গেল।
পেছনের লাল আলো অন্ধকারে ছোট হতে হতে মিলিয়ে যাওয়ার পর নাঈম আমার পাশে এসে দাঁড়াল।
“এই পথে সত্যিই আর বাস আসবে?”
“আসতে পারে।”
“সাধারণত তো আসে না।”
“সাধারণত আমরা এমন পরিস্থিতিতে রাতের রাস্তায় বেরও হই না।”
নাঈম ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
ধর্মীয় বিষয়ে তার পড়াশোনা আছে। সে দ্রুত সম্মত হওয়ার মানুষ নয়।
“আপনি কি মনে করছেন, আমাদের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা হবেই?”
আমি সামনে তাকালাম।
নিলয় তাপরোধী বাক্সের পাশে হাঁটছে। তৃষা পর্দার তাপমাত্রা পরীক্ষা করছে। আদিব দুর্বল নেটওয়ার্কের মধ্যে ফোনে বিকল্প পথ খুঁজছে।
আমি বললাম, “হবেই, তা জানি না।”
“তাহলে ভরসা করছেন কেন?”
“কারণ আমরা শুধু অপেক্ষা করছি না। আমরা চেষ্টা করছি।”
“তাতে কি তকদির বদলে যায়?”
“তকদির বদলায় কি না জানি না। তবে কয়েকজন মানুষের একই ভালো নিয়তে একসঙ্গে পথে নামার নিশ্চয়ই অর্থ আছে।”
“কী অর্থ?”
“হয়তো একজনের জন্য যে পথ বন্ধ, কয়েকজনের সম্মিলিত চেষ্টায় তার বদলে অন্য পথ দেখা যায়।”
নাঈম কিছুক্ষণ নীরব রইল।
“অর্থাৎ ফল নিশ্চিত নয়।”
“না।”
“তবু হাঁটতে হবে।”
“আল্লাহর ওপর ভরসা মানে বসে থেকে বাহনের অপেক্ষা করা নয়। আমরা থেমে গেলে সামনে থাকা ব্যবস্থার কাছেও পৌঁছাতে পারব না।”
নাঈম আর কিছু বলল না।
শুধু হাঁটার গতি বাড়াল।
দ্বিতীয় বাসটি আসার আগে চারপাশের শব্দ হঠাৎ কমে গেল।
বাসটির গায়ে লেখা গন্তব্যের নাম ধুলোয় ঢাকা। প্রায় সব জানালার কাচ ঘোলা। শুধু মাঝের একটি জানালা পরিষ্কার।
সেই জানালার পাশে বসেছিল একটি মেয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাকে চিনতাম। সে ছবি আঁকত। আলো কোথা থেকে আসে, তার চেয়ে মানুষের মুখে পড়ে আলোটি কীভাবে বদলে যায়, সেটিই তাকে বেশি আকর্ষণ করত।
একসময় আমার মনে হয়েছিল, আমাদের আগ্রহ হয়তো একতরফা নয়।
আমরা কেউ কথাটি বলিনি।
কিছু সম্পর্ক শেষ হয় না। কারণ তাদের কখনো শুরু হওয়ার সুযোগই দেওয়া হয় না।
মেয়েটি আমাকে চিনতে পারল।
তারপর হাসল।
একটি সংযত, পরিচিত হাসি।
আমি থেমে গেলাম।
সে জানালার দিকে সামান্য ঝুঁকে কিছু বলার চেষ্টা করল। ঠোঁট নড়ল। ইঞ্জিনের শব্দে কিছুই শুনতে পেলাম না।
বাসটি থামেনি।
আমি হাত তুলেছিলাম কি না, মনে নেই।
চলে যাওয়ার আগে মেয়েটির হাসিতে সামান্য পরিবর্তন ঘটেছিল। সেটি বিদায়, বিস্ময় নাকি সতর্কতা, বোঝার সময় পেলাম না।
বাসটি আবাদপুরের দিকে যাচ্ছিল। সেখান থেকে জেলা শহর, তারপর অন্য বাসে মহানগর। ঘুরপথ। সময় বেশি লাগবে। ভাড়াও বেশি।
তবু সেটি একটি পথ হতে পারত।
নিলয় আমার কাঁধে হাত রাখল।
“চিনতে?”
আমি উত্তর দিলাম না।
তাপরোধী বাক্স থেকে ছোট একটি শব্দ এল।
তৃষা পর্দা দেখে বলল, “চার ঘণ্টার কম।”
বাসটির পেছনের আলো তখন আর দেখা যাচ্ছিল না।
আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম।
তৃতীয় বাসটি থামল।
কিন্তু মহানগরের দিকে যাওয়ার অনুমতি তারও নেই। জেলা শহর পর্যন্ত যেতে পারে, অথচ ভেতরে দাঁড়ানোর জায়গাও নেই। চালকের সহকারী বাক্সটি আলাদাভাবে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিল।
নিলয় সঙ্গে সঙ্গে না বলল।
সিরামটি এমন কোনো বস্তু নয়, যা এক মানুষের হাত থেকে আরেক মানুষের হাতে দিয়ে অনিশ্চিত যাত্রায় পাঠানো যায়।
তৃতীয় বাসটিও চলে গেল।
নাঈম আমার দিকে তাকাল।
প্রশ্নটি মুখে বলল না।
এবার কোথায়?
উত্তর দিল আদিব।
“অর্কর বাড়ি এখান থেকে খুব দূরে নয়।”
অর্ক নিলয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। প্রযুক্তি ও যন্ত্র নিয়ে তার অস্বাভাবিক আগ্রহ। সে বর্তমানে দূরের একটি শহরে। কিন্তু বাড়িতে তার বাবা-মা আছেন।
নিলয় পুরো পথ চেনে না। আদিবের ফোনে অর্কের পাঠানো পুরোনো একটি অবস্থান সংরক্ষিত ছিল। মূল সড়ক থেকে পশ্চিমে নেমে যাওয়া সরু পথটি মানচিত্রে দেখা গেল।
আমরা সেই পথ ধরলাম।
অর্কদের বাড়িতে পৌঁছাতে প্রায় চল্লিশ মিনিট লাগল।
বড় একতলা বাড়ি। লম্বা বারান্দা। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দোলক নড়ছে, কিন্তু কাঁটা আটটা সতেরো মিনিটে স্থির।
অর্কের বাবা আমাদের দেখে বিস্মিত হলেন। তাপরোধী বাক্স এবং আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সেই বিস্ময় বেশিক্ষণ ধরে রাখলেন না।
“ভেতরে এসো,” বললেন।
নিলয় পরিস্থিতি বোঝানোর পর তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন।
তারপর বললেন, “অর্ক যাওয়ার আগে বলেছিল, খুব বড় বিপদ হলে যেন তোমরা এখানে আসো।”
“কখন বলেছিল?” নিলয় জিজ্ঞেস করল।
“অনেক আগে।”
নিলয় আর প্রশ্ন করল না।
বাড়ির পেছনে একটি বড় ধাতব ছাউনি। অর্কের বাবা একটি সুইচ চাপলে ছাউনির পুরো পাশ ধীরে ধীরে খুলে গেল।
ভেতরের যন্ত্রটিকে প্রথমে ছোট হেলিকপ্টার মনে হয়েছিল।
কাছে গিয়ে দেখলাম, প্রচলিত পাখা বা লেজ নেই। চারদিকে ভাঁজ করা বৈদ্যুতিক রোটর। নিচে ভারী অবতরণদণ্ড। সামনে বাঁকানো স্বচ্ছ কাচ।
অর্কের বাবা বললেন, “পরীক্ষামূলক আকাশযান।”
“এটা অর্ক কিনেছে?” নিলয় জিজ্ঞেস করল।
“একটি প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে যন্ত্রটি এখানে এনে রেখেছে।”
অর্কের মা পাশে এসে বললেন, “সবাই বলেছিল অপ্রয়োজনীয় জিনিস। আমি বলেছিলাম, রেখে দাও। কোন বিপদে কী প্রয়োজন হয়, আগে থেকে কে জানে?”
আমি কাচের ভেতর তাকালাম।
পাঁচটি আসন।
একটি সামনে।
পেছনে চারটি।
আমরা ছয়জন।
অন্তত বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ছয়জন ছিলাম।
আমি দলটিকে গুনলাম।
এক।
দুই।
তিন।
চার।
পাঁচ।
আবার গুনলাম।
পাঁচজনই।
যাত্রার শুরুতে ষষ্ঠ মানুষটি কোথায় দাঁড়িয়েছিল, মনে করার চেষ্টা করলাম।
মায়ের ঘরের সামনে?
প্রথম বাসের পাশে?
তকদির নিয়ে কথা বলার সময়?
দ্বিতীয় বাসটি চলে যাওয়ার পর?
কোনো মুখ মনে পড়ল না।
শুধু মনে হলো, একজন ছিল।
আমি অন্যদের দিকে তাকালাম।
তাদের কারও চোখে সংখ্যাটি নিয়ে প্রশ্ন নেই।
নিলয় বলল, “কী হয়েছে?”
“আমরা কয়জন বের হয়েছিলাম?”
সে বাকিদের দিকে তাকাল।
“পাঁচজন।”
আমি আর কিছু বললাম না।
তাপরোধী বাক্সটি আবার শব্দ করল।
তৃষা বলল, “তিন ঘণ্টার কম।”
তবু মনে হলো, সমস্যাটি সমাধান হয়নি। শুধু তার আকার বদলেছে।
নতুন সমস্যা হলো, আমাদের কেউ আকাশযান চালাতে জানি না।
ঠিক তখন নিয়ন্ত্রণপর্দার বিন্যাস দেখে আমার মাথার ভেতর একটি দৃশ্য ঝলকে উঠল।
বন্ধ একটি প্রশিক্ষণকক্ষ।
সামনে একই ধরনের পর্দা।
আমার দুই হাত নিয়ন্ত্রণদণ্ডের ওপর।
কেউ কানে নির্দেশ দিচ্ছে।
দৃশ্যটি এত দ্রুত মিলিয়ে গেল যে নিশ্চিত হতে পারলাম না, এটি স্মৃতি নাকি পরিচিত কোনো ছবির ভাঙা অংশ।
আমি কিছু বলার আগেই নিলয় চালকের আসনে বসে পড়ল।
“স্থানীয় পরীক্ষা চালানো যাবে,” সে বলল।
অর্কের বাবা ছাউনির পুরো দরজা খুলে দিলেন।
নিলয় যন্ত্রটি চালু করল।
রোটরগুলো খুলে গেল। শব্দ খুব বেশি নয়, কিন্তু বাতাসের চাপ তীব্র। আকাশযানটি মাটি থেকে কয়েক ফুট ওপরে উঠে উঠানের ভেতর সামান্য এগোল।
তারপর দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল।
নিলয়ের হাত নিয়ন্ত্রণপর্দার ওপর অবিশ্বাস্য দ্রুততায় চলছিল। সে যন্ত্রটিকে ডান দিকে কাত করে আবার ভারসাম্যে আনল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই নিরাপদে নামিয়ে ফেলল।
সবাই মুগ্ধ।
আমিও।
কিন্তু তার দ্রুততা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলল।
সে সত্যিই দক্ষ, নাকি ঝুঁকিটা এখনো বুঝতে পারেনি?
আরেকটি সম্ভাবনাও ছিল।
হয়তো সে যথেষ্ট দক্ষ। আমি শুধু ছোট ভাইয়ের হাতে নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে প্রস্তুত নই।
“এবার আমাকে দেখতে দাও,” বললাম।
নিলয় কোনো আপত্তি করল না।
চালকের আসনে বসে নিয়ন্ত্রণপর্দায় হাত রাখতেই আমার আঙুলগুলো নিজে থেকে কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গায় চলে গেল।
আঙুলগুলো যেন বিন্যাসটি জানে।
আমি জানি না।
আকাশযানটি স্থানীয় পরীক্ষার সীমার মধ্যে ওপরে উঠল। ধীরে ঘুরিয়ে ভারসাম্য দেখলাম। তারপর নামিয়ে আনলাম।
দূরপথের পরিচালনাব্যবস্থা চালু করতে গেলে পর্দায় হলুদ সতর্কতা দেখা দিল:
অর্কের বাবা বললেন, স্থানীয়ভাবে স্বল্প দূরত্বে যন্ত্রটি চালানো গেলেও মহানগর পর্যন্ত যেতে একটি বৃহৎ নেভিগেশন সংকেত প্রয়োজন। সেটি আকাশপথ, উচ্চতা ও দূরপথের পরিচালনা নিয়ন্ত্রণ করে।
“সংকেতটির নাম কী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
তিনি মাথা নাড়লেন।
“মনে নেই। অর্ক জানে।”
পর্দায় একটি চিহ্ন জ্বলছিল।
কয়েকটি রেখা।
মাঝখানে ছোট একটি বৃত্ত।
মাটির ঘরের বৈদ্যুতিক যন্ত্রের নিচে একই চিহ্ন দেখেছিলাম কি?
নিশ্চিত হতে পারলাম না।
সবাই যেতে প্রস্তুত।
ঠিক তখন নিলয়ের ফোন বেজে উঠল।
অর্ক কল করেছে।
নিলয় ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে প্রশ্ন এল,
“তোর সঙ্গে মেয়েটা কে?”
নিলয় থেমে গেল।
আমরা তৃষার দিকে তাকালাম।
অর্ক জানতে চাইল না আমরা তার বাড়িতে কেন। আকাশযানটি বের করা হয়েছে কি না, সেটিও নয়। তার প্রথম প্রশ্ন তৃষাকে নিয়ে।
“আমাকে আগে বলিসনি কেন?” সে আবার জিজ্ঞেস করল।
তৃষা কাচের গায়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ছিল। প্রশ্নটি শুনে সে বিব্রত, বিরক্ত নাকি নিছক উদাসীন, বোঝার উপায় নেই।
আদিব সিরামের বাক্সটি পেছনের আসনে স্থির করছিল। নাঈম বাইরে তাকিয়ে ছিল। নিলয় ফোন হাতে দাঁড়িয়ে।
আমি চালকের আসনে বসে পাঁচটি আসন গুনলাম।
তারপর পাঁচজন মানুষ।
সংখ্যা মিলে গেছে।
তবু বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ছয়জন ছিলাম, এই অনুভূতিটি সরাতে পারলাম না।
ঠিক তখন গ্রামের উত্তর প্রান্তে একটি সাদা আলো জ্বলে উঠল।
ধানখেত ও পরিত্যক্ত ইটভাটার ওপাশে।
মা বলেছিলেন, গবেষণাকেন্দ্রটি ওই দিকে।
একই মুহূর্তে আকাশযানের পর্দার হলুদ সতর্কতা কেঁপে উঠল।
সংকেত পাওয়া যায়নি।
তবে যন্ত্রটি দূরের কোনো উৎস শনাক্ত করেছে।
নিলয় আমার দিকে তাকাল।
“ভাই?”
আমি সামনের পর্দা থেকে চোখ সরালাম না।
“সবাই বসো।”
অর্ক তখনো ফোনের ওপাশ থেকে তৃষার পরিচয় জানতে চাইছিল।
নিলয় উত্তর দিল না।
নাঈম পেছনের আসনে বসল। আদিব বাক্সের স্থিতি পরীক্ষা করল। তৃষা শেষবারের মতো তাপমাত্রা দেখল।
আমি নিয়ন্ত্রণদণ্ডে দুই হাত রাখলাম।
সন্ধ্যায় আরেকটি যন্ত্রের সামনে বসেছিলাম। তাপ বেড়ে গেলে সেটি বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কাজের অসম্পূর্ণ অংশ মায়ের হাতে দিয়ে বলেছিলাম, কিছুটা এগিয়ে রেখেছি।
এবারও একটি সতর্কবাতি জ্বলছে।
তবে এবার যন্ত্রটির ভেতরে শুধু চাল আর জল নেই।
পাঁচজন মানুষ আছে।
আর দূরের হাসপাতালে অপেক্ষা করছেন একজন।
পর্দায় নতুন একটি বার্তা উঠল:
আমি দুই হাত নিয়ন্ত্রণদণ্ডে স্থির রাখলাম।
সংকেত না এলে আমরা যেতে পারব না।
সংকেত এলে কে চালাবে, তা আর অনিশ্চিত নয়।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0