ডিগ্রি বাড়ছে, কাজ কোথায়? বাংলাদেশের শিক্ষিত বেকারত্ব ও পরিকল্পনার সংকট
২০১৬-১৭ থেকে ২০২৪ সালের তথ্য ধরে বাংলাদেশের শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষতার সংকট, কাজের ঘাটতি ও সমাধানের পথ বিশ্লেষণ।
অর্থনীতি • শিক্ষা • শ্রমবাজার
ডিগ্রি বাড়ছে, কাজ কোথায়: বাংলাদেশের শিক্ষিত বেকারত্ব ও পরিকল্পনার সংকট
উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু সেই শিক্ষাকে মানসম্মত ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে রূপান্তরের পথ কি একই গতিতে তৈরি হয়েছে?
লেখাটির প্রেক্ষাপট
এই নিবন্ধ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯ মার্চ ২০২২ সালে। করোনার অর্থনৈতিক ধাক্কা, স্থবির নিয়োগ এবং চাকরির অপেক্ষায় থাকা শিক্ষিত তরুণদের অনিশ্চয়তা তখন আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।
মূল লেখকের উদ্বেগ, প্রশ্ন এবং শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে সমন্বয়হীনতার সমালোচনা সংরক্ষণ করে বর্তমান সংস্করণে পরিসংখ্যান সংশোধন, নতুন সরকারি তথ্য, প্রমাণের সীমা এবং সাম্প্রতিক শ্রমবাজার গবেষণা যুক্ত করা হয়েছে।
দেশে শিক্ষার বিস্তার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। আগের তুলনায় বেশি তরুণ মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করছেন। কিন্তু এই অর্জনের পাশে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও বড় হয়ে উঠছে: ডিগ্রি অর্জনের পর তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত কাজ কোথায়?
অনেক তরুণ বছরের পর বছর চাকরির প্রস্তুতি নেন, একের পর এক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন এবং এমন একটি কাজের অপেক্ষা করেন যেখানে তাঁদের শিক্ষা, শ্রম ও সম্ভাবনার অন্তত কিছুটা মর্যাদা থাকবে। অন্যদিকে নিয়োগদাতাদের একটি অংশ প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন প্রার্থী না পাওয়ার কথা বলেন। এই দুই বক্তব্য পরস্পরবিরোধী মনে হলেও বাস্তবে একই সংকটের দুটি দিক প্রকাশ করে। চাকরির সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়, আবার শিক্ষা ও কাজের বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।
বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারত্ব শুধু ব্যক্তির দক্ষতার অভাবের ফল নয়। উচ্চশিক্ষার দ্রুত বিস্তার, মানসম্মত কাজ সৃষ্টির ধীরগতি, শিক্ষা ও শিল্পের দুর্বল সংযোগ, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং কাজের প্রত্যাশা ও বাস্তব সুযোগের ব্যবধান মিলেই এই সংকট তৈরি করছে।
মূল উপলব্ধি
বেকার বলতে কাকে বোঝায়?
প্রাতিষ্ঠানিক শ্রম-পরিসংখ্যানে শুধু কাজ না থাকলেই কাউকে বেকার বলা হয় না। সাধারণভাবে বেকার হিসেবে গণ্য হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ না করা, কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকা এবং সক্রিয়ভাবে কাজ খোঁজার শর্ত পূরণ করতে হয়।
এই কারণে কর্মক্ষম বয়সের সব কর্মহীন মানুষ আনুষ্ঠানিক বেকারের সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত হন না। শিক্ষার্থী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, কাজ খোঁজা ছেড়ে দেওয়া হতাশ তরুণ, গৃহস্থালির অবৈতনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি অথবা কাজ করতে অনিচ্ছুক মানুষ শ্রমশক্তির বাইরে থাকতে পারেন। আবার কেউ অল্প সময় বা কম আয়ের কাজ করলেও ব্যবহৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী কর্মরত হিসেবে গণ্য হতে পারেন।
তথ্যগত সতর্কতা
বেকারত্ব, কাজ হারানো, আয় কমে যাওয়া, অপ্রতুল কর্মসংস্থান, শ্রমশক্তির বাইরে থাকা এবং শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা তরুণের সংখ্যা একই সূচক নয়। এগুলো একত্র করলে শ্রমবাজারের প্রকৃত চিত্র বিকৃত হয়।
তখন থেকে এখন: কীভাবে বদলেছে চিত্র?
বাংলাদেশের শ্রমশক্তি জরিপের ধারাবাহিকতায় কয়েকটি বড় বিরতি রয়েছে। ২০১৬-১৭ সালের পূর্ণ জরিপের পর পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ জরিপ হয় ২০২২ সালে। ফলে করোনার সবচেয়ে তীব্র সময়ের পরিবর্তন একই পদ্ধতিতে তৈরি একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি বার্ষিক ধারাবাহিকতায় দেখা যায় না।
এখানে “উচ্চশিক্ষিত” বলতে মূলত বিশ্ববিদ্যালয় বা সমমানের তৃতীয় পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন জনগোষ্ঠী বোঝানো হয়েছে। সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে কখনো এই শ্রেণিকে tertiary-level educated, কখনো graduate বা university-educated হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্রেণিবিন্যাসের এই পার্থক্যের কারণে সংখ্যাগুলো পড়ার সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের সংজ্ঞা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মোট বেকার: প্রায় ২৭ লাখ
সামগ্রিক বেকারত্বের হার: প্রায় ৪.২ শতাংশ
তৃতীয় পর্যায়ের শিক্ষাপ্রাপ্ত বেকার: প্রায় ৪ লাখ
এই শ্রেণির বেকারত্বের হার: ১১.২ শতাংশ
বিভিন্ন গবেষণায় করোনাকালে কাজ, আয় ও জীবিকার বড় ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে ২০১৬-১৭ ও ২০২২ সালের মধ্যবর্তী সময়ের জন্য একই কাঠামোয় তৈরি পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক BBS Labour Force Survey না থাকায় করোনার ধাক্কাকে একটি নির্দিষ্ট জাতীয় বেকার-সংখ্যায় রূপান্তর করা নিরাপদ নয়। কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা বা আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং কয়েক কোটি মানুষ আনুষ্ঠানিকভাবে বেকার হওয়া এক কথা নয়।
মোট বেকার: প্রায় ২৫.৮ লাখ
সামগ্রিক বেকারত্বের হার: প্রায় ৩.৬ শতাংশ
তৃতীয় পর্যায়ের শিক্ষাপ্রাপ্ত বেকার: প্রায় ৮ লাখ
এই শ্রেণির বেকারত্বের হার: ১২ শতাংশ
২০১৬-১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে মোট বেকারের সংখ্যা কিছুটা কমলেও তৃতীয় পর্যায়ের শিক্ষাপ্রাপ্ত বেকারের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়। অর্থাৎ মোট বেকারত্বের তুলনায় শিক্ষিত বেকারত্বের কাঠামোগত চাপ বেড়েছে।
মোট বেকার: প্রায় ২৪.৬১ লাখ
তৃতীয় পর্যায়ের শিক্ষাপ্রাপ্ত বেকার: প্রায় ৯.০৬ লাখ
এই শ্রেণির বেকারত্বের হার: প্রায় ১৩.১১ শতাংশ
বার্ষিক মোট বেকার: প্রায় ২৬.২৪ লাখ
বার্ষিক সামগ্রিক বেকারত্বের হার: ৪.৪৮ শতাংশ
তৃতীয় পর্যায়ের শিক্ষাপ্রাপ্ত বেকার: প্রায় ৮.৮৫ লাখ
এই শ্রেণির বেকারত্বের হার: ১৩.৫ শতাংশ
২০২৩ সালের তুলনায় তৃতীয় পর্যায়ের শিক্ষাপ্রাপ্ত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার কমলেও সংশ্লিষ্ট শ্রমশক্তির মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়েছে। শ্রমশক্তির আকার ও অংশগ্রহণ বদলালে বেকারের মোট সংখ্যা কমার পাশাপাশি হার বাড়তে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি তুলনার সীমা
প্রকাশিত BBS ফলাফলে ২০১৬-১৭ সালে তৃতীয় পর্যায়ের শিক্ষাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ১১.২ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ১৩.৫ শতাংশ দেখা যায়। তবে জরিপের কাঠামো, শিক্ষা-শ্রেণিবিন্যাস, জনসংখ্যার ভিত্তি এবং শ্রম-পরিসংখ্যানের পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণে এই দীর্ঘমেয়াদি তুলনাকে সতর্কতার সঙ্গে পড়তে হবে।
সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত BBS-এর তালিকাভুক্ত সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ Labour Force Survey হলো ২০২৪ সালের প্রতিবেদন। ২০২৫ সালে শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য সংগ্রহ স্থগিত থাকায় ২০২৪-পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ জাতীয় BBS ফল পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক সংস্থার ২০২৫ সালের মডেলভিত্তিক অনুমান থাকলেও সেটিকে BBS-এর সরাসরি জাতীয় জরিপের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি।
২০১৬-১৭: প্রাথমিক তুলনাবিন্দু
২০২০-২১: করোনার আঘাত, কিন্তু তুলনাযোগ্য তথ্যের ঘাটতি
২০২২: মোট বেকার কিছুটা কম, উচ্চশিক্ষিত বেকার প্রায় দ্বিগুণ
২০২৩: উচ্চশিক্ষিত বেকার প্রায় ৯ লাখ
২০২৪: সংখ্যায় সামান্য পতন, হারে বৃদ্ধি
সর্বশেষ তথ্যের সীমা
পরিমাপের পদ্ধতি বদলালে সংখ্যা কেন বদলায়?
২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকের ক্ষেত্রে BBS পুরোনো ও নতুন দুই আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান কাঠামো অনুসারে ফল প্রকাশ করে। নতুন 19th International Conference of Labour Statisticians বা 19th ICLS কাঠামোয় মূলত মজুরি বা মুনাফার জন্য সম্পাদিত কাজকে কর্মসংস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নিজের বা পরিবারের ব্যবহারের জন্য উৎপাদনমূলক কাজকে আগের মতো সব ক্ষেত্রে employment-এর মধ্যে রাখা হয় না।
এই নতুন কাঠামোয় অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ প্রান্তিকে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭.৩ লাখ এবং বেকারত্বের হার ৪.৬৩ শতাংশ পাওয়া যায়। পুরোনো 13th ICLS কাঠামোয় একই সময় বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৬.১ লাখ এবং হার ৩.৬৯ শতাংশ। ফলে সংজ্ঞা ও পদ্ধতি উল্লেখ না করে আলাদা বছরের সংখ্যা পাশাপাশি রাখলে ভুল অর্থ তৈরি হতে পারে।
করোনার আঘাত: কাজহানি ও বেকারত্ব এক নয়
করোনার প্রভাবে ব্যবসা, পরিবহন, পর্যটন, শিক্ষা, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের বহু মানুষ কাজ ও আয় হারিয়েছিলেন। অনেকের কাজের সময় কমেছিল, কেউ সাময়িকভাবে কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন, আবার কেউ শ্রমবাজারের বাইরে চলে গিয়েছিলেন।
কিন্তু এই ক্ষতির সবটুকুকে আনুষ্ঠানিক বেকারের সংখ্যা হিসেবে দেখানো যায় না। কেউ কাজ হারানোর পর সক্রিয়ভাবে নতুন কাজ না খুঁজলে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক সংজ্ঞায় বেকার নাও হতে পারেন। কেউ কাজ ধরে রেখেও আয় বা কর্মঘণ্টা হারাতে পারেন। তাই করোনাকালে কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অনুমান থেকে কয়েক কোটি আনুষ্ঠানিক বেকারের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো পরিসংখ্যানগতভাবে সঠিক নয়।
উচ্চশিক্ষিতদের সংকট কেন গভীর?
১. ডিগ্রি বাড়লেও মানসম্মত কাজ একই গতিতে বাড়েনি
প্রতিবছর নতুন স্নাতক শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প ও আধুনিক সেবা খাতে সমান গতিতে নতুন কাজ তৈরি হচ্ছে না। একজন উচ্চশিক্ষিত প্রার্থী সাধারণত এমন কাজ প্রত্যাশা করেন যেখানে তাঁর শিক্ষা ব্যবহার করা যাবে, ভবিষ্যৎ উন্নতির সুযোগ থাকবে এবং আয় জীবনযাত্রার প্রয়োজন মেটাতে পারবে। এ ধরনের কাজ সীমিত হলে চাকরি খোঁজার সময় দীর্ঘ হয়।
২. শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে দক্ষতার অসামঞ্জস্য
শিক্ষার্থীরা যে জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে বের হচ্ছেন, তার সবকিছু নিয়োগদাতাদের প্রয়োজনের সঙ্গে মেলে না। যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ, ডিজিটাল সাক্ষরতা, বিশ্লেষণ, পেশাগত লেখালেখি এবং কর্মস্থলে দ্রুত নতুন কিছু শেখার সক্ষমতা নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে এই সমস্যার দায় শুধু শিক্ষার্থীর নয়। পাঠক্রম কতটা হালনাগাদ, শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান কতটা প্রস্তুত, শিক্ষার্থী বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন কি না এবং শিল্পখাত পাঠক্রম প্রণয়নে যুক্ত কি না, এগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
৩. বিনিয়োগ ও চাকরি সৃষ্টির সীমাবদ্ধতা
শুধু দক্ষতা উন্নয়ন করলেই কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। নতুন প্রতিষ্ঠান, শিল্প, গবেষণা, প্রযুক্তি সেবা ও উৎপাদনশীল ব্যবসা বাড়তে হয়। বিনিয়োগ এবং ব্যবসার প্রসার দুর্বল থাকলে দক্ষ প্রার্থীরাও কাজ পাবেন না। তাই শিক্ষিত বেকারত্বকে শুধু “গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতা নেই” বলে ব্যাখ্যা করা একপাক্ষিক।
৪. সীমিত সরকারি পদের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা
চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত বেতন, সামাজিক মর্যাদা ও অবসরসুবিধার কারণে অনেক তরুণ সরকারি চাকরিকে অগ্রাধিকার দেন। কিন্তু সরকারি খাত পুরো শ্রমশক্তির অল্প অংশকেই ধারণ করতে পারে। সীমিত পদের জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতি অনেক তরুণকে কয়েক বছর শ্রমবাজারের অন্য অংশ থেকে দূরে রাখে।
৫. কাজের মান, মজুরি ও অবস্থানের সমস্যা
চাকরি আছে কি না, এটিই একমাত্র প্রশ্ন নয়। প্রারম্ভিক মজুরি, কর্মঘণ্টা, নিরাপত্তা, শিক্ষার ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ উন্নতির সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ। নগরকেন্দ্রিক চাকরি, বাসস্থান ও যাতায়াতের উচ্চ ব্যয় এবং কম বেতন অনেক প্রার্থীকে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কাজ গ্রহণে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
৬. নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বাড়তি বাধা
নারীদের ক্ষেত্রে নিরাপদ যাতায়াত, কর্মস্থলের পরিবেশ, পারিবারিক দায়িত্ব, শিশুযত্ন, সামাজিক প্রত্যাশা এবং নিয়োগে বৈষম্য বাড়তি বাধা তৈরি করতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণ এবং আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের স্নাতকেরাও প্রশিক্ষণ, যোগাযোগ ও চাকরি খোঁজার ক্ষেত্রে অসম সুযোগের মুখোমুখি হন।
বেকারের সংখ্যা শুধু একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়। দীর্ঘ চাকরি-অনুসন্ধান একজন তরুণের আত্মবিশ্বাস, পারিবারিক সম্পর্ক, আর্থিক স্বাধীনতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করতে পারে। কর্মসংস্থান নীতিকে শুধু পদসংখ্যার হিসাব হিসেবে দেখলে সংকটের মানবিক দিক অদৃশ্য থেকে যায়।
সংখ্যার পেছনের মানুষ
কম বেকারত্বের হার কি সব সময় ভালো খবর?
বাংলাদেশের বড় অংশের কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক। জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজন মানুষকে কম আয়, অনিরাপদ পরিবেশ অথবা নিজের শিক্ষার সঙ্গে অসংগত কাজ গ্রহণে বাধ্য করতে পারে। তাঁরা পরিসংখ্যানগতভাবে কর্মরত হলেও তাঁদের কাজকে মানসম্মত বা পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান বলা কঠিন।
এই কারণে সামগ্রিক বেকারত্বের পাশাপাশি অপ্রতুল কর্মসংস্থান, অনানুষ্ঠানিক কাজ, প্রকৃত মজুরি, শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ এবং শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা তরুণদের অবস্থাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সংকট উত্তরণে কী করা প্রয়োজন?
মূল লেখায় সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে ব্যবহারিক ও কারিগরি প্রশিক্ষণ, নতুন স্নাতকদের জন্য internship এবং প্রযুক্তিগত ও যোগাযোগ দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান শ্রমবাজার গবেষণাও এই প্রস্তাবগুলোর প্রয়োজনীয়তা সমর্থন করে।
১. শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক পাঠক্রম
পাঠক্রম তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট পেশায় বাস্তবে কী কাজ করতে হয়, কোন দক্ষতা প্রয়োজন এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনে সেই কাজ কীভাবে বদলাচ্ছে, তা নিয়মিত বিশ্লেষণ করতে হবে। নিয়োগদাতা, পেশাজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্থায়ী পরামর্শব্যবস্থা প্রয়োজন।
২. বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা
শুধু সনদ দেওয়ার জন্য স্বল্পমেয়াদি internship যথেষ্ট নয়। নির্দিষ্ট শেখার লক্ষ্য, দায়িত্ব, তত্ত্বাবধান, মূল্যায়ন এবং ন্যায্য ভাতাসহ internship ও apprenticeship চালু করা প্রয়োজন।
৩. প্রশিক্ষণের সফলতা চাকরিতে প্রবেশ দিয়ে মাপা
কতজন প্রশিক্ষণে নিবন্ধিত হলেন, সেটি একমাত্র সফলতা নয়। প্রশিক্ষণের পর কতজন কাজ পেয়েছেন, তাঁদের আয় কতটা বদলেছে এবং কাজটি প্রশিক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।
৪. প্রতিষ্ঠানে কার্যকর পেশা-সহায়তা
শিক্ষার্থীদের শেষ বর্ষে পৌঁছানোর পর নয়, শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই পেশা সম্পর্কে ধারণা, জীবনবৃত্তান্ত, সাক্ষাৎকার, পেশাগত যোগাযোগ, internship এবং বিকল্প কর্মপথ সম্পর্কে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
৫. স্নাতকদের কর্মজীবন অনুসরণ
কোন প্রতিষ্ঠানের কোন বিভাগের শিক্ষার্থীরা কত সময়ে কাজ পাচ্ছেন, কী ধরনের কাজ করছেন এবং তাঁদের শিক্ষা কতটা ব্যবহার হচ্ছে, সে বিষয়ে নিয়মিত অনুসরণমূলক গবেষণা প্রয়োজন। এই তথ্য শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারককে বাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
৬. মানসম্মত কাজ তৈরির জন্য বিনিয়োগ
দক্ষতা তৈরির পাশাপাশি শিল্প, গবেষণা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ডিজিটাল সেবা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং স্থানীয় উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান না বাড়িয়ে শুধু প্রশিক্ষণ বাড়ালে দক্ষ বেকারের সংখ্যা বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
৭. নিয়মিত ও তুলনাযোগ্য শ্রমশক্তি জরিপ
বেকারত্ব, মজুরি, অপ্রতুল কর্মসংস্থান, অনানুষ্ঠানিক কাজ এবং শিক্ষিত তরুণদের অবস্থার তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। প্রকল্পের অর্থ শেষ হলে জরিপ বন্ধ হয়ে গেলে নীতিনির্ধারণ অনুমাননির্ভর হয়ে পড়ে। শ্রমশক্তি জরিপের স্থায়ী ও নিরবচ্ছিন্ন অর্থায়ন জরুরি।
মূল লেখকের কারিগরি শিক্ষা, internship ও চাকরির বাজারের সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয় সম্পর্কিত প্রস্তাবের সঙ্গে বর্তমান গবেষণায় আরও তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে: প্রশিক্ষণের ফল চাকরিতে প্রবেশ দিয়ে পরিমাপ করা, স্নাতকদের কর্মজীবন অনুসরণ করা এবং শ্রমশক্তি জরিপের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। এগুলো বর্তমান সংস্করণে সম্পাদকীয় গবেষণা-সংযোজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
অভিযাত্রী সম্পাদনা প্যানেলের গবেষণা-নোট
শেষ কথা
বাংলাদেশের মোট বেকারের সংখ্যা প্রতিটি জরিপে একই গতিতে বাড়েনি। কিন্তু ২০১৬-১৭ থেকে ২০২২ সালের তুলনাযোগ্য সরকারি ফলাফলে দেখা যায়, মোট বেকারের সংখ্যা কিছুটা কমলেও তৃতীয় পর্যায়ের শিক্ষাপ্রাপ্ত বেকারের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের সাম্প্রতিক ফলেও উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের চাপ অব্যাহত রয়েছে।
এ থেকে বোঝা যায়, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন বা ডিগ্রির সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। আবার শিক্ষাকে কেবল চাকরির তাৎক্ষণিক প্রশিক্ষণে সীমাবদ্ধ করাও সমাধান নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ জ্ঞান, গবেষণা, সমালোচনামূলক চিন্তা, পেশাগত সক্ষমতা এবং সামাজিক দায়িত্ব তৈরি করা। সমস্যা তখনই গভীর হয়, যখন শিক্ষা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে।
একটি দেশের তরুণেরা শুধু চাকরির আবেদনকারী নন। তাঁরা ভবিষ্যৎ শিক্ষক, গবেষক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা, কৃষি-উদ্ভাবক, প্রযুক্তিবিদ ও নাগরিক নেতৃত্ব। তাঁদের ডিগ্রি যদি দীর্ঘ অপেক্ষার সনদে পরিণত হয়, তবে সংকটটি কোনো একক তরুণের নয়; সংকটটি আমাদের শিক্ষা, অর্থনীতি ও পরিকল্পনার।
মূল লেখক: আব্দুস সবুর (লোটাস)
মূল শিরোনাম: বেড়েই চলেছে শিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা এবং আমাদের পরিকল্পনাহীনতা
মূল প্রকাশনা: দ্য ব্যাকস্পেস জার্নাল
প্রথম প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২২
মূল পৃষ্ঠা হালনাগাদ: ২ মার্চ ২০২৩
Archive capture: ৭ মার্চ ২০২৩
বর্তমান সংস্করণ: গবেষণা-সমৃদ্ধ, তথ্যগতভাবে হালনাগাদ ও গভীরভাবে সম্পাদিত পুনঃপ্রকাশ
গবেষণা, তথ্য যাচাই ও সম্পাদনা: অভিযাত্রী সম্পাদনা প্যানেল
বর্তমান প্রকাশনা ও কপিরাইট অধিকার: অভিযাত্রী
১. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। Labour Force Survey Bangladesh 2016–2017. সরকারি প্রকাশনা। প্রকাশনা রেকর্ড
২. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। Labour Force Survey 2022 Final Report. আপলোড: ২৫ অক্টোবর ২০২৩। শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রকাশনা
৩. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। Labour Force Survey 2023. সরকারি শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রকাশনা। প্রকাশনা তালিকা
৪. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। Labour Force Survey 2024 Final Report. সরকারি শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রকাশনা। প্রকাশনা তালিকা
৫. International Labour Organization. From Certificate to Career: Closing the Skills Mismatch. ৩০ জুলাই ২০২৬। মূল নিবন্ধ
৬. International Labour Organization. Skills Mismatches. দক্ষতার অসামঞ্জস্যের ধারণা ও পরিমাপ। মূল উৎস
৭. World Bank. Bangladesh Tertiary Education Sector Review: Skills and Innovation for Growth. ৩১ মার্চ ২০১৯। পূর্ণ প্রতিবেদন
৮. World Bank. Bangladesh Development Update: Tertiary Education and Job Skills. অক্টোবর ২০১৯। পূর্ণ প্রতিবেদন
৯. Raihan, Selim; Uddin, Mahtab; Ahmed, Md. Tuhin; Nahar, Mir Ashrafun; Sharmin, Eshrat. COVID-19 Fallout on Poverty and Livelihoods in Bangladesh: Results from SANEM’s Nation-wide Household Survey. SANEM, সেপ্টেম্বর ২০২১। পূর্ণ প্রতিবেদন
লেখক, প্রকাশনা ও অধিকার-তথ্য
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0