ভাদ্রের পাকা তালে কীভাবে তৈরি করবেন গ্রাম্য তালের রুটি?

পাকা তাল, চালের আটা, দুধ ও চিনি দিয়ে গ্রাম্য তালের রুটি তৈরির সহজ পদ্ধতি জানুন আশরাফুন নেছার পরীক্ষিত ঘরোয়া রেসিপিতে।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ১
ভাদ্রের পাকা তালে কীভাবে তৈরি করবেন গ্রাম্য তালের রুটি?
কলা পাতার ওপর মাটির পাত্রে সাজানো সোনালি-বাদামি তালের রুটি, পাশে পাকা তাল, তালের শাঁস, চালের আটা ও গুড়।

রান্নাবান্না | গ্রাম্য রেসিপি

ভাদ্র মাসের পাকা তালের ঘ্রাণে পরিচিত এক গ্রামীণ রেসিপি

পাকা তাল, চালের আটা, দুধ ও চিনি দিয়ে তৈরি করুন সুগন্ধি গ্রাম্য তালের রুটি।

আসসালামু আলাইকুম। আজ আমাদের রেসিপি তালের রুটি। রুটি আমরা অনেকেই খেয়ে থাকি, কিন্তু ভাদ্র মাসে পাকা তাল দিয়ে তৈরি রুটি খাওয়ার আনন্দ একেবারেই আলাদা।

ভাদ্র মাস বলতেই আমাদের অনেকের মনে পড়ে পাকা তালের কথা। তাল দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পিঠা, বড়া ও মিষ্টান্ন তৈরি করা যায়। আবার কিছু এলাকায় তালের রুটি ছাড়া ভাদ্র মাসের খাবারের আয়োজন যেন পূর্ণতাই পায় না।

এই রুটি ছোট-বড় সবাই পছন্দ করে। পাকা তালের নিজস্ব ঘ্রাণ, দুধের স্বাদ এবং চালের আটার পরিচিত গঠন মিলিয়ে তৈরি হয় মজার তালের রুটি। চলুন, সহজভাবে রেসিপিটি জেনে নিই।

প্রয়োজনীয় উপকরণ

১. পাকা তাল

২. চালের আটা

৩. চিনি অথবা গুড়, পরিমাণমতো

৪. তরল গরুর দুধ অথবা গুঁড়া দুধ, পরিমাণমতো

৫. ভাজা জিরার গুঁড়া, সামান্য

৬. আস্ত ভাজা জিরা, সামান্য

পরিমাণ সম্পর্কে: পাকা তালের রসের ঘনত্ব ও মিষ্টতা অনুযায়ী চালের আটা, দুধ এবং চিনি বা গুড়ের পরিমাণ ঠিক করতে হবে। তাই চালের আটা একবারে না দিয়ে অল্প অল্প করে মেশানো জরুরি।

তাল প্রস্তুত করা

প্রথমে একটি ভালোভাবে পাকা তাল নিন। তালের মাথার অংশ ছাড়িয়ে পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন। এরপর ফলটির বাইরের অংশ ছাড়িয়ে ভেতরের আঁশযুক্ত শাঁস আলাদা করুন।

তালের শাঁস হাতে ভালোভাবে মেখে নরম করে নিন। প্রয়োজন হলে সামান্য পানি ব্যবহার করতে পারেন। তবে বেশি পানি দেওয়া যাবে না। বেশি পানি দিলে তালের রস পাতলা হয়ে যাবে।

শাঁস নরম হয়ে এলে একটি পরিষ্কার ঝাঁঝরি, ডালা অথবা তাল ঘষার উপযোগী পাত্রে ভালোভাবে ঘষে রস বের করে নিন।

এরপর পাতলা পরিষ্কার কাপড় বা সূক্ষ্ম জালের ছাঁকনি দিয়ে রসটি ছেঁকে নিন। তালের আঁশ যেন রসের মধ্যে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন। আঁশ থেকে গেলে রুটি বেলার সময় ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তালের মিশ্রণ তৈরি

ছেঁকে নেওয়া তালের রস একটি পাত্রে ঢেলে চুলায় গরম করতে দিন। পাত্রের তলায় যেন লেগে না যায়, তাই নিয়মিত নেড়ে দিতে হবে।

এবার স্বাদ অনুযায়ী চিনি যোগ করুন। চাইলে চিনির পরিবর্তে গুড় ব্যবহার করতে পারেন। তবে চিনি ব্যবহার করলে তালের স্বাভাবিক ঘ্রাণটি আমার কাছে বেশি ভালো মনে হয়।

এরপর গরুর দুধ যোগ করুন। চাইলে তরল দুধের পরিবর্তে গুঁড়া দুধও ব্যবহার করা যাবে। গুঁড়া দুধ ব্যবহার করলে মিশ্রণটি খুব বেশি সময় জ্বাল দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

তরল গরুর দুধ ব্যবহার করলে জ্বাল দিয়ে মিশ্রণটির ঘনত্ব কিছুটা বাড়িয়ে নিতে হবে। তালের মিশ্রণ ফুটে উঠলে আঁচ কমিয়ে দিন।

খামির তৈরি

তালের মিশ্রণ ফুটে উঠলে এর মধ্যে অল্প অল্প করে চালের আটা দিন। চালের আটা একবারে ঢেলে দেবেন না। প্রতিবার অল্প আটা দিয়ে ভালোভাবে মেশানোর পর প্রয়োজন অনুযায়ী আবার আটা যোগ করুন।

খামির খুব নরম হবে না, আবার অতিরিক্ত শক্তও হবে না। আমরা সাধারণত যেভাবে চালের রুটির খামির তৈরি করি, প্রায় সেভাবেই তালের রুটির খামির তৈরি করতে হবে।

খামির চুলা থেকে নামানোর কিছুক্ষণ আগে সামান্য ভাজা জিরার গুঁড়া এবং অল্প আস্ত ভাজা জিরা মিশিয়ে দিন। এতে রুটিতে সুন্দর একটি ঘ্রাণ আসবে।

খামির পাত্রের গা ছেড়ে একসঙ্গে জমে এলে চুলা বন্ধ করে পাত্রটি নামিয়ে নিন।

খামিরের সঠিক অবস্থা: খামিরটি এমন হতে হবে যেন ঠান্ডা হওয়ার পর সহজে হাতে নিয়ে মথা, লেচি কাটা এবং রুটি বেলা যায়।

রুটি তৈরি

তালের রুটির খামিরটি হালকা ঠান্ডা করে নিন। হাতে নেওয়ার মতো হলে ভালোভাবে মথুন। খামির যত ভালোভাবে মথা হবে, রুটি তত সুন্দর হবে।

এবার খামির থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে নিন। প্রতিটি লেচি গোল করে একটু মোটা রুটি তৈরি করুন।

সাধারণ চালের রুটির তুলনায় তালের রুটি সামান্য মোটা হলে খেতে ভালো লাগে। তবে খুব বেশি মোটা করবেন না, যেন তাওয়ায় সেঁকার সময় ভেতরের অংশও ভালোভাবে সেদ্ধ হয়।

তাওয়ায় সেঁকা

একটি পরিষ্কার তাওয়া চুলায় বসিয়ে ভালোভাবে গরম করে নিন। এরপর তাওয়ায় একটি রুটি দিন।

রুটির নিচের অংশ সামান্য সেঁকা হয়ে তাওয়া থেকে সহজে উঠতে শুরু করলে উল্টে দিন। এরপর মাঝারি আঁচে দুই পাশ ভালোভাবে সেঁকে নিন।

রুটির পুরুত্ব ও তাওয়ার তাপমাত্রা অনুযায়ী সেঁকার সময় কিছুটা কমবেশি হতে পারে। তাই শুধু সময়ের হিসাব না করে রুটির দুই পাশে হালকা বাদামি দাগ পড়েছে এবং ভেতর পর্যন্ত সেদ্ধ হয়েছে কি না, তা দেখে নিন।

একইভাবে প্রতিটি রুটি সেঁকে নিন। তৈরি হয়ে গেল আমাদের সুস্বাদু গ্রাম্য তালের রুটি।

পরিবেশন

তালের রুটি গরম অবস্থায় খেতে যেমন ভালো লাগে, ঠান্ডা হওয়ার পরও এর স্বাদ বেশ মজার। আপনারা যে যেভাবে পছন্দ করেন, সেভাবে পরিবেশন করতে পারেন।

রুটিগুলো সেঁকার পর পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখলে দ্রুত শুকিয়ে যাবে না।

খেয়াল রাখবেন

১. ভালোভাবে পাকা ও সুগন্ধযুক্ত তাল ব্যবহার করুন।

২. তাল ঘষার সময় অতিরিক্ত পানি দেবেন না।

৩. তালের আঁশ ভালোভাবে ছেঁকে ফেলুন।

৪. চালের আটা অল্প অল্প করে মেশান।

৫. খামির খুব নরম বা অতিরিক্ত শক্ত করবেন না।

৬. মাঝারি আঁচে রুটির দুই পাশ ভালোভাবে সেঁকে নিন।

শেষ কথা

ভাদ্র মাসের পাকা তালের ঘ্রাণের সঙ্গে গ্রামবাংলার রান্নাঘর ও মৌসুমি খাবারের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। পরিচিত কয়েকটি উপকরণে তৈরি তালের রুটি সকালের নাশতা বা বিকেলের খাবারে পরিবেশন করা যায়।

আশা করি রেসিপিটি আপনাদের ভালো লাগবে। সবাই ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
আশরাফুন নেছা আমি আশরাফুন নেছা। ঘরোয়া রান্না, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবার, মাছ-মাংসের পদ, পিঠা-মিষ্টি, নাশতা এবং সহজ বেকিংয়ের রেসিপি নিয়ে লিখি। পরিচিত উপকরণ ব্যবহার করে সহজভাবে সুস্বাদু খাবার তৈরির অভিজ্ঞতা পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই আমার লেখার প্রধান উদ্দেশ্য। রান্নার পাশাপাশি কাপড়ে ব্লক প্রিন্টসহ ঘরোয়া সৃজনশীল কাজ নিয়েও লিখতে আগ্রহী।