It’s Okay to Not Be Okay: ভালোবাসা, মানসিক ক্ষত ও নিজের কাছে ফেরার গল্প
It’s Okay to Not Be Okay কি শুধু প্রেমের কে-ড্রামা? মুন গ্যাং-তে, কো মুন-ইয়ং ও মুন সাং-তের মাধ্যমে মানসিক ক্ষত, অটিজম, পরিচর্যা ও আত্মমুক্তির ব্যক্তিগত পর্যালোচনা।
কে-ড্রামা • ধারাবাহিক পর্যালোচনা • মানসিক স্বাস্থ্য
It’s Okay to Not Be Okay: ভালোবাসা, মানসিক ক্ষত ও নিজের কাছে ফেরার গল্প
শুরুতে যে ধারাবাহিককে অতিরিক্ত প্রশংসিত মনে হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেটিই কেন আমাকে নিজের রাগ, দায়িত্ব, ভালোবাসা এবং আহত মানুষগুলোর দিকে নতুনভাবে তাকাতে বাধ্য করল?
কাহিনি-উন্মোচন সতর্কতা
এই পর্যালোচনায় চরিত্রগুলোর অতীত, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানসিক পরিবর্তনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোচনা করা হয়েছে। তবে কাহিনির কেন্দ্রীয় রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান প্রকাশ করা হয়নি। ধারাবাহিকটি একেবারে না দেখে থাকলে কিছু অংশ আপনার কাছে হালকা কাহিনি-উন্মোচন হিসেবে ধরা দিতে পারে।
কোরিয়ান নাটক, সংক্ষেপে কে-ড্রামা। মাত্র কয়েক বছর আগেও নামটি শুনলে আমাদের কেউ কেউ নাক সিঁটকাতাম। আমিও যে এই প্রবণতার পুরো বাইরে ছিলাম, এমন দাবি করব না। কোরিয়ান নাটক নিয়ে মানুষের এত উচ্ছ্বাস কেন, সেটি বোঝার চেয়ে উচ্ছ্বাসটিকেই অতিরঞ্জিত ভাবা সহজ ছিল।
কিন্তু সময় বদলেছে। আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রদর্শনমাধ্যমের বিস্তার এবং কোরীয় নির্মাতাদের গল্প, অভিনয়, দৃশ্যপরিকল্পনা ও নানা ধরনের কাহিনি নিয়ে পরীক্ষা করার প্রবণতা কে-ড্রামাকে আর নির্দিষ্ট একটি দর্শকগোষ্ঠীর মধ্যে আটকে রাখেনি। আপনি কে-ড্রামা পছন্দ না-ও করতে পারেন, কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক বিনোদন-সংস্কৃতিতে একে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভবত আর সহজ নয়।
এটি আমার প্রথম কে-ড্রামা রিভিউ। ফলে খুব নিরপেক্ষ কোনো অধ্যাপকসুলভ দূরত্ব নিয়ে লিখছি না। একজন দর্শক হিসেবে কী ভেবেছিলাম, দেখতে দেখতে সেই ধারণা কীভাবে বদলেছে এবং শেষ পর্যন্ত চরিত্রগুলো আমাকে কোথায় নিয়ে গেছে, সেটিই এই লেখার মূল বিষয়।
ধারাবাহিক: It’s Okay to Not Be Okay
কোরীয় শিরোনাম: 사이코지만 괜찮아
পরিচালনা: পার্ক শিন-উ
চিত্রনাট্য: জো ইয়ং
মোট পর্ব: ১৬
প্রধান অভিনয়শিল্পী: কিম সু-হিয়ন, সেও ইয়া-জি ও ও জং-সে
প্রথমে অতিরিক্ত প্রশংসিত মনে হয়েছিল
It’s Okay to Not Be Okay প্রথমে আমার কাছে বেশ অতিরিক্ত প্রশংসিত মনে হয়েছিল। এত আলোচনা, এত উচ্ছ্বাস এবং এত দৃশ্যমান জনপ্রিয়তা দেখে আমার ভেতরে স্বাভাবিক সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। অনেক সময় কোনো কাজ দেখার আগেই তার প্রচার আমাদের প্রত্যাশাকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। পরে কাজটি ভালো হলেও সেই অতিরিক্ত প্রত্যাশার নিচে চাপা পড়ে যায়।
কিন্তু দেখা শুরু করার পর বুঝলাম, শুধু ধারাবাহিকটি সম্পর্কে নয়, মানুষের মানসিক ক্ষত, দায়িত্ব এবং ভালোবাসার ভাষা সম্পর্কেও আমার অনেক কিছু দেখা হয়নি, জানা হয়নি। ধারাবাহিকটি নিখুঁত নয়। কিন্তু কিছু গল্পের শক্তি নিখুঁততায় নয়, আপনার ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা কোনো দরজায় শব্দ করার ক্ষমতায়। এই গল্পটি আমার ক্ষেত্রে সেই কাজ করেছে।
শুধু হাসপাতাল নয়, আমাদের জীবনের একটি কাঠামো
গল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র OK Psychiatric Hospital। তবে এটিকে শুধু একটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে গল্পটির বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। আমার কাছে হাসপাতালটি আমাদের জীবনের একটি পরিশীলিত প্রতিরূপ। এখানে মানুষ নিজের ভেতরের এমন কষ্ট নিয়ে আসে, যা বাইরে থেকে সবসময় দৃশ্যমান নয়।
হাসপাতালের রোগীদের গল্পগুলো মনে করিয়ে দেয়, মানসিক কষ্ট কোনো দূরের বা অচেনা মানুষের বিষয় নয়। শোক, ভয়, অপরাধবোধ, দমিয়ে রাখা রাগ, পারিবারিক নির্যাতন, একাকিত্ব অথবা ভালোবাসা হারানোর অভিজ্ঞতা আমাদের আশপাশের মানুষের জীবনেও বিভিন্ন মাত্রায় উপস্থিত থাকতে পারে। কখনো আমরা অন্যের কষ্ট বুঝতে পারি না। আরও ভয়ংকর হলো, কখনো নিজের কষ্টকেও ঠিক নামে ডাকতে পারি না।
হাসপাতালটিকে এমন কোনো জাদুকরি জায়গা বানানো হয়নি, যেখানে কয়েকটি কথা বললেই সবাই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। আবার বাস্তব মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প হিসেবেও এই ধারাবাহিককে দেখা উচিত নয়। গল্পের ভেতরে পরিবর্তন আসে ধীরে। কখনো সম্পর্কের মধ্য দিয়ে, কখনো নিজের ভয়কে চিনে, কখনো ভুল স্বীকার করে এবং কখনো অন্য মানুষের সাহায্য গ্রহণ করে।
নিজের কষ্ট স্বীকার করা আর নিজের মানসিক সমস্যার জন্য নিজেকেই দায়ী করা এক বিষয় নয়। শৈশবের আঘাত, নির্যাতন, শোক, পারিবারিক চাপ বা সামাজিক পরিস্থিতি মানুষের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। আরোগ্যের শুরু নিজের প্রতি দোষারোপ দিয়ে নয়, বরং নিজের অভিজ্ঞতাকে সত্য বলে স্বীকার করার মধ্য দিয়েও হতে পারে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
মুন গ্যাং-তে: নিয়ন্ত্রণের আড়ালে জমে থাকা ক্লান্তি
কিম সু-হিয়ন অভিনীত মুন গ্যাং-তে মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একজন পরিচর্যাকারী। তিনি চিকিৎসক নন। কিন্তু অন্য মানুষের আচরণ, সম্ভাব্য বিপদ এবং কষ্টের ভাষা বোঝার একটি প্রশিক্ষিত অভিজ্ঞতা তাঁর আছে। নিজের জীবনের ক্ষেত্রে অবশ্য এই দক্ষতা প্রায়ই কাজ করে না।
গ্যাং-তের নিজের আবেগ লুকিয়ে রাখার ক্ষমতা ভয়ংকর। প্রথমে একে অসাধারণ আত্মনিয়ন্ত্রণ মনে হয়। তাঁর ধৈর্য, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং অন্য মানুষের প্রয়োজন বুঝতে পারা সহজেই মুগ্ধ করে। কিন্তু গল্প এগোলে বোঝা যায়, সব নিয়ন্ত্রণ শক্তির লক্ষণ নয়। কিছু নিয়ন্ত্রণ বহু বছরের দায়িত্ব, ক্লান্তি এবং নিজের প্রয়োজনকে অস্বীকার করার ফল।
ছোটবেলা থেকে বড় ভাই মুন সাং-তের দায়িত্ব নিতে নিতে গ্যাং-তে নিজের জীবনকে যেন স্থগিত করে রেখেছেন। নিজের রাগ প্রকাশ করলে অপরাধবোধ হয়। নিজের সুখ চাইলে মনে হয়, তিনি দায়িত্ব থেকে পালাচ্ছেন। ভাইকে ভালোবাসেন, আবার একই দায়িত্ব থেকে কিছুটা মুক্তিও চান। এই পরস্পরবিরোধী সত্য তাঁকে অনেক বেশি মানবিক করে তোলে।
আর হ্যাঁ, তাঁর ধৈর্য, নীরব দৃষ্টি এবং আবেগ লুকিয়ে রাখার ধরন যে কারও জন্য ঝামেলার হতে পারে। প্রেমেও পড়ে যেতে পারেন। তবে দূর থেকে যে সংযমকে আকর্ষণীয় লাগে, কাছ থেকে সেটিই কখনো যোগাযোগের দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়।
কো মুন-ইয়ং: সৌন্দর্য, রূপকথা ও বিপজ্জনক অধিকারবোধ
সেও ইয়া-জি অভিনীত কো মুন-ইয়ংকে পর্দায় প্রথম দেখার পর চোখ সরিয়ে নেওয়া সহজ নয়। তাঁর পোশাক, কণ্ঠ, হাঁটার ধরন, আত্মবিশ্বাস এবং নাটকীয় উপস্থিতি চরিত্রটিকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে। তিনি একজন সফল শিশুতোষ সাহিত্যিক, কিন্তু তাঁর রূপকথা শিশুদের জন্য নির্মল ও নিরাপদ পৃথিবী তৈরি করে না। সেখানে ভয় আছে, ক্ষুধা আছে, পরিত্যাগ আছে, লজ্জা আছে এবং মানুষের ভেতরের অন্ধকারও আছে।
গল্প হলেও আমি তাঁর প্রেমে পড়ে গেছি। কথাটি অস্বীকার করে লাভ নেই। তাঁর রূপ, মেধা, গল্প বলার ক্ষমতা এবং ভেতরে লুকিয়ে থাকা একাকিত্ব তাঁকে অসম্ভব আকর্ষণীয় করে তোলে। কিন্তু চরিত্রটিকে ভালো লাগা আর তাঁর প্রতিটি আচরণকে সমর্থন করা এক বিষয় নয়।
মুন-ইয়ংয়ের ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা সত্য, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অধিকারবোধ, হুমকি, অনুসরণ এবং অন্য মানুষের সীমা অতিক্রম করার প্রবণতাও আছে। শৈশবের আঘাত তাঁর আচরণের ব্যাখ্যা দিতে পারে, কিন্তু সব আচরণকে ন্যায়সংগত করে না। আহত মানুষও অন্যকে আঘাত করতে পারে। ভালোবাসা থাকলেই প্রতিটি সম্পর্ক স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না।
এই দ্বন্দ্বই সম্ভবত মুন-ইয়ংকে এত আকর্ষণীয় করে। তিনি একই সঙ্গে সৃজনশীল, একাকী, সাহসী, আহত এবং বিপজ্জনকভাবে সীমালঙ্ঘনকারী। তাঁকে শুধু নায়িকা অথবা নিখুঁত প্রেমিকা বানালে চরিত্রটির বড় অংশ হারিয়ে যাবে।
রূপকথাগুলো শুধু সুন্দর অ্যানিমেশন বা পর্বের নাম নয়। প্রতিটি গল্প চরিত্রগুলোর ভয়, স্মৃতি, ক্ষুধা, অপরাধবোধ এবং পরিচয়ের একটি দরজা খুলে দেয়। চরিত্ররা গল্পগুলোর অর্থ তৈরি করে, আবার গল্পগুলোও চরিত্রদের ভেতরের অন্ধকারকে ভাষা দেয়।
মুন-ইয়ংয়ের রূপকথার আসল কাজ
মুন সাং-তে: সবচেয়ে কঠিন এবং জরুরি চরিত্র
ধারাবাহিকটির সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং চরিত্র মুন সাং-তে। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন ও জং-সে। সাং-তে কোনো অটিস্টিক শিশু নন। তিনি একজন অটিস্টিক প্রাপ্তবয়স্ক, যার নিজস্ব পছন্দ, ভয়, জেদ, স্মৃতি, প্রতিভা, পেশাগত আকাঙ্ক্ষা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে।
ও জং-সের জন্য কাজটি সহজ ছিল না। দীর্ঘ ১৬ পর্বে একই ধরনের শারীরিক নড়াচড়া, অতিরিক্ত আলো-শব্দে অস্বস্তি, সরাসরি কথা বলা, মুখের অভিব্যক্তি বুঝতে অসুবিধা এবং নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর আগ্রহের মতো অটিস্টিক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করতে গিয়ে খুব সহজেই চরিত্রটি অতিরঞ্জিত নকল হয়ে যেতে পারত। আমার অন্তত একবারও মনে হয়নি যে তিনি চরিত্রটিকে কৌতুক বা করুণার উপকরণ বানিয়েছেন।
তবে সাং-তে অটিজমের বিস্তৃত পরিসরের সব মানুষের প্রতিনিধি নন। অটিজম একটি বৈচিত্র্যময় স্নায়ুবিক বিকাশগত অবস্থা। একজন মানুষের বৈশিষ্ট্য, সহায়তার প্রয়োজন এবং জীবনযাপনের ধরন অন্য একজনের থেকে অনেক আলাদা হতে পারে। তাই সাং-তেকে বাস্তব অটিজমের একমাত্র মডেল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
চরিত্রটির সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, গল্প তাকে গ্যাং-তের বোঝা হিসেবে শেষ করেনি। সাং-তে শুধু পরিচর্যা গ্রহণ করেন না। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন, পুরোনো স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধরে রাখেন, নিজের শ্রমের মূল্য বোঝেন, চিত্রশিল্পী হিসেবে কাজ করেন এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে অন্যদের রক্ষাও করেন।
তাঁর বিকাশের অর্থ অটিজম থেকে “সেরে ওঠা” নয়। তিনি অটিস্টিকই থাকেন। পরিবর্তনটি ঘটে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায়। ধীরে ধীরে তিনি শুধু গ্যাং-তের ওপর নির্ভরশীল ভাই নন, নিজের পেশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া একজন বড় ভাই হয়ে ওঠেন।
ও জং-সের অভিনয় অসাধারণ হলেও একজন non-autistic অভিনেতার অভিনীত কাল্পনিক চরিত্র অটিজমের সম্পূর্ণ বৈচিত্র্য ধারণ করতে পারে না। গল্পটি বোঝাপড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলেছে, কিন্তু বাস্তব অটিস্টিক ব্যক্তিদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠের বিকল্প নয়।
অটিজমের উপস্থাপন নিয়ে সতর্কতা
দুই ভাইয়ের সম্পর্ক: ভালোবাসার সঙ্গে ক্লান্তিও সত্য
মুন গ্যাং-তে ও মুন সাং-তের সম্পর্ককে শুধু আত্মত্যাগী ভাইয়ের গল্প বললে অন্যায় হবে। এখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু ক্লান্তিও আছে। দায়িত্ব আছে, আবার সেই দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যেতে চাওয়ার অপরাধবোধও আছে। নির্ভরতা আছে, কিন্তু ধীরে ধীরে স্বাধীনতার প্রয়োজনও সামনে আসে।
গ্যাং-তে বহু বছর ধরে মনে করেছেন, তাঁর জীবনের প্রধান কাজ বড় ভাইকে নিরাপদ রাখা। এই দায়িত্ব তাঁকে শক্ত করেছে, আবার ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ও করেছে। সাং-তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে তিনি কখনো সাং-তের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত করেছেন, আবার নিজের সুখকেও অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন।
গল্পটি ধীরে ধীরে দেখায়, কাউকে ভালোবাসা মানে তার হয়ে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়। আবার নিজের জীবন চাইলে তাতে ভালোবাসা কমে যায় না। একটি সম্পর্ক তখনই পরিণত হয়, যখন দুই মানুষই একে অন্যকে প্রয়োজনের পাশাপাশি স্বাধীন মানুষ হিসেবেও দেখতে শেখে।
পার্শ্বচরিত্রগুলো শুধু ভিড় নয়
এই ধারাবাহিকের প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের ওপর যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। শুধু তিন কেন্দ্রীয় চরিত্রের ওপর সমস্ত আবেগের ভার রেখে পার্শ্বচরিত্রগুলোকে অদৃশ্য করা হয়নি। হাসপাতালের রোগী, কর্মী, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মানুষ এবং আশপাশের পরিচিত চরিত্রগুলো মূল গল্পের বিভিন্ন দিককে প্রতিফলিত করে।
শোক, মানসিক আঘাত, বিষণ্নতা, মদনির্ভরতা, উন্মত্ততার পর্ব, পারিবারিক সহিংসতা এবং বিচ্ছিন্নতার মতো বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ছোট ছোট কাহিনির মাধ্যমে আসে। তবে এগুলো কোনো মানসিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাবিজ্ঞান নয়। ধারাবাহিকটি মানুষের কষ্টকে গল্পে রূপ দিয়েছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তক তৈরি করেনি।
এই সীমাবদ্ধতা মনে রেখেও বলতে হয়, পার্শ্বচরিত্রগুলো গল্পটিকে মানবিক গভীরতা দিয়েছে। তাঁদের কারও গল্প কয়েকটি পর্বে শেষ হলেও সেই গল্প কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর সামনে একটি আয়না ধরে। অন্যকে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে মানুষ কখনো নিজের অস্বীকার করা সত্যও দেখে ফেলে।
নিজের সম্পর্কে নতুন কিছু জানার সম্ভাবনা
ছোট ছোট সমস্যা, চেপে রাখা রাগ, অভিমান ও ভালোবাসা কখনো সঠিক মানুষের কাছে সঠিক সময়ে ভাষা পেলে নতুন অর্থ তৈরি করতে পারে। সব সমস্যার সমাধান শুধু প্রকাশে হয় না। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকার করা অনুভূতিকে নাম দেওয়া অনেক সময় পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হতে পারে।
এমন অনেক চরিত্র এবং মুহূর্ত আছে, যা দেখে মনে হতে পারে, “এটা তো আমি ছিলাম।” হয়তো আপনি গ্যাং-তের মতো নিজের প্রয়োজন চেপে রাখেন। হয়তো মুন-ইয়ংয়ের মতো ভালোবাসা আর অধিকারের সীমা গুলিয়ে ফেলেন। অথবা হয়তো সাং-তের মতো অন্যরা আপনার হয়ে সিদ্ধান্ত নিলে আপনি নিজের কণ্ঠ হারিয়ে ফেলেন।
ধারাবাহিক দেখা আত্মবিশ্লেষণ অথবা পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প নয়। তবু একটি ভালো গল্প কখনো এমন প্রশ্ন তৈরি করে, যা আমরা আগে নিজেকে করিনি। এই ধারাবাহিকের সাফল্য সম্ভবত এখানেই। উত্তর দেওয়ার আগে এটি দর্শককে নিজের দিকে কিছুক্ষণ তাকাতে বাধ্য করে।
দৃশ্য, পোশাক ও অন্ধকার রূপকথার পৃথিবী
ধারাবাহিকটির দৃশ্যপরিকল্পনা শুধু সুন্দর নয়, গল্পের সক্রিয় অংশ। মুন-ইয়ংয়ের পোশাক কখনো বর্মের মতো, কখনো রূপকথার দুষ্ট রানি অথবা নিঃসঙ্গ রাজকন্যার স্মৃতি তৈরি করে। তাঁর বাড়িটি একই সঙ্গে প্রাসাদ, কারাগার এবং শৈশবের ক্ষত ধরে রাখা এক অন্ধকার জাদুঘর।
অ্যানিমেশন, অলংকরণ, রঙের ব্যবহার এবং বাস্তব দৃশ্যের মধ্যকার পরিবর্তন ধারাবাহিকটিকে সাধারণ প্রেমভিত্তিক পারিবারিক নাটক থেকে আলাদা করেছে। শিশুতোষ বইয়ের চিত্র এবং চরিত্রগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে। কখনো গল্প বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে, আবার কখনো বাস্তবতা গল্পের নির্দোষ মুখোশ সরিয়ে দেয়।
পোশাক পরিকল্পনার স্বীকৃতিও এসেছে। ২০২১ সালের Baeksang Arts Awards-এ ধারাবাহিকটির পোশাক পরিকল্পনা কারিগরি বিভাগে পুরস্কার অর্জন করে। মুন-ইয়ংয়ের পোশাক যে শুধু সাজসজ্জা নয়, চরিত্র নির্মাণের একটি ভাষা, এই স্বীকৃতি সেই পর্যবেক্ষণকে আরও শক্তিশালী করে।
অভিনয় কোথায় সবচেয়ে শক্তিশালী
কিম সু-হিয়নের অভিনয়ের শক্তি বড় আবেগে নয়, আবেগ আটকে রাখার ভেতরে। চোখ, চোয়াল, দীর্ঘ বিরতি এবং হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারানোর ছোট মুহূর্তগুলো গ্যাং-তের দমিয়ে রাখা জীবনকে দৃশ্যমান করে। তাঁর চরিত্রটি অনেক কথা না বলেও ক্লান্তির দীর্ঘ ইতিহাস বহন করে।
সেও ইয়া-জি মুন-ইয়ংকে এমন এক উপস্থিতি দিয়েছেন, যাকে একই সঙ্গে ভয় পাওয়া, বিরক্ত হওয়া এবং ভালোবেসে ফেলা সম্ভব। তাঁর নিচু কণ্ঠ, কথার নিয়ন্ত্রিত গতি এবং পোশাকের সঙ্গে দেহভঙ্গির সমন্বয় চরিত্রটির অন্ধকার রূপকথাসুলভ সৌন্দর্যকে বিশ্বাসযোগ্য করেছে।
তবে আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন অভিনয়টি ও জং-সের। সাং-তের আচরণকে শুধু বাহ্যিক নকল বানালে চরিত্রটি দ্রুত ভেঙে পড়ত। কিন্তু তিনি ছোট ছোট পর্যবেক্ষণ, জেদ, ভয়, স্নেহ, রসিকতা এবং পেশাগত আত্মমর্যাদাকে একই চরিত্রের মধ্যে ধরে রেখেছেন। এই অভিনয়ের জন্য তিনি ২০২১ সালের Baeksang Arts Awards-এ সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন। স্বীকৃতিটি প্রাপ্য বলেই মনে হয়।
যেখানে ধারাবাহিকটি দুর্বল
এত প্রশংসার পরও ধারাবাহিকটি নিখুঁত নয়। প্রতিটি পর্ব দীর্ঘ এবং কাহিনির গতি ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর। এই ধীরতা অনেক জায়গায় চরিত্রের আবেগ জমতে সাহায্য করে, কিন্তু মধ্যভাগের কিছু দ্বন্দ্ব পুনরাবৃত্ত মনে হতে পারে। একই সম্পর্কের টানাপোড়েন কয়েকবার নতুন মোড়কের ভেতর ফিরে আসে।
শেষভাগে রহস্য ও প্রতিপক্ষকে ঘিরে যে নাটকীয়তা তৈরি হয়, সেটি প্রাথমিক পর্বগুলোর সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক আবহের তুলনায় বেশি অতিনাটকীয়। পারিবারিক ক্ষত ও আরোগ্যের গল্প তখন কিছুটা রহস্য-রোমাঞ্চের পথে যায়। এই পরিবর্তন উত্তেজনা বাড়ায়, কিন্তু চরিত্রভিত্তিক বাস্তবতার কিছু অংশকে সরলও করে ফেলে।
মুন-ইয়ংয়ের সীমালঙ্ঘনকারী আচরণকেও কখনো দৃশ্যগত সৌন্দর্য ও প্রেমের আকর্ষণের কারণে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য করে দেখানো হয়েছে। দর্শক হিসেবে তাঁকে ভালো লাগতেই পারে। আমারও লেগেছে। কিন্তু বাস্তব সম্পর্কে একই আচরণ নিরাপদ বা গ্রহণযোগ্য হবে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপজ্জনক।
এই ধারাবাহিক মানসিক স্বাস্থ্য, শৈশবের আঘাত, অটিজম এবং পরিচর্যার দীর্ঘমেয়াদি চাপ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তৈরি করে। কিন্তু এটি রোগনির্ণয় বা চিকিৎসার নির্দেশিকা নয়। নিজের অথবা পরিচিত কারও অভিজ্ঞতার সঙ্গে কোনো চরিত্রের মিল পেলেই নিশ্চিত রোগনির্ণয় ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে যোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সতর্কতা
তাহলে গল্পটি আসলে কী বলে?
আমার কাছে এটি “ভালোবাসা সব ঠিক করে দেয়” ধরনের গল্প নয়। ভালোবাসা এখানে প্রয়োজনীয়, কিন্তু যথেষ্ট নয়। চরিত্রগুলোকে নিজের ভয় চিনতে হয়, অতীতের মুখোমুখি হতে হয়, অন্য মানুষের সীমারেখা বুঝতে হয় এবং নিজের সিদ্ধান্তের দায়ও নিতে হয়।
কষ্টের ইতিহাস কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো মানুষ বানায় না। একইভাবে ভুল করা মানেই মানুষটি চিরকাল খারাপ, এটিও নয়। মুন-ইয়ংয়ের আঘাত তাঁর নিষ্ঠুরতার ব্যাখ্যা দিতে পারে, কিন্তু দায় মুছে দেয় না। গ্যাং-তের দায়িত্ব তাঁর আত্মত্যাগ ব্যাখ্যা করে, কিন্তু নিজের জীবন অস্বীকার করাকে আদর্শ করে না। সাং-তের অটিজম তাঁর পরিচয়ের অংশ, কিন্তু তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় নয়।
আমার কাছে গল্পটির কয়েকটি ঘটনা এমন এক নৈতিক প্রতিধ্বনি তৈরি করেছে, যেখানে দীর্ঘদিন চাপা রাখা অন্যায়, ভয় ও অপরাধবোধ অন্য রূপে চরিত্রগুলোর কাছে ফিরে আসে। কিন্তু গল্পটি সরল ন্যায়-অন্যায়ের সমীকরণে আটকে থাকে না। আহত মানুষও অন্যকে আঘাত করতে পারে, আবার ভুল করা মানুষও বদলানোর চেষ্টা করতে পারে।
It’s Okay to Not Be Okay মানসিক স্বাস্থ্যের কোনো পাঠ্যপুস্তক নয়। এটি তিনজন আহত মানুষের গল্প। একজন নিজের জীবনকে পরিচর্যার দায়িত্বের নিচে চাপা দিয়েছেন। একজন ভালোবাসা ও অধিকারের সীমা গুলিয়ে ফেলেছেন। আর একজনকে অন্যরা দীর্ঘদিন নির্ভরশীল মানুষ হিসেবে দেখলেও তিনি নিজের পেশা, সিদ্ধান্ত এবং বড় ভাইসুলভ দায়িত্বের দিকে এগিয়ে যান।
কিছু অংশ ধীর। কিছু নাটকীয়তা অতিরিক্ত। কিছু সম্পর্ক বাস্তব জীবনে আরও কঠোর প্রশ্নের দাবি রাখে। তবু ধারাবাহিকটি শেষ করার পর মনে হয়েছে, সময়টি নষ্ট হয়নি। বরং নিজের এবং আশপাশের মানুষের কিছু নীরব আচরণ নতুনভাবে দেখতে শিখেছি।
সময় পেলে ধারাবাহিকটি একবার দেখা যেতেই পারে। আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন ৯/১০। বাকি ১ নম্বর আপাতত হাতে থাক। ভালো লাগার মধ্যেও সামান্য সন্দেহ বাঁচিয়ে রাখা মন্দ নয়।
মূল লেখক: মোঃ মেহেদি হাসান
কলম নাম: মি. বিকেল
গবেষণা, তথ্য যাচাই ও সম্পাদনা: অভিযাত্রী সম্পাদনা প্যানেল
প্রকাশনা: অভিযাত্রী
১. Netflix. “It’s Okay to Not Be Okay.” Official Series Page, 2020। ধারাবাহিকের তথ্য দেখুন
২. CJ ENM. “It’s Okay to Not Be Okay.” Official Programme Overview। আনুষ্ঠানিক পরিচিতি দেখুন
৩. Lum, Meachelle এবং Brandon S. Ito. “It’s Okay to Not Be Okay.” Journal of the American Academy of Child & Adolescent Psychiatry, Volume 65, Issue 4, 2026। প্রবন্ধটি দেখুন
৪. Wisteria, Amber. “TV Representations of Autism Spectrum Disorder: A Cross-Cultural Analysis of South Korean K-Drama ‘It’s Okay to Not Be Okay’.” International Journal of Creative Media Research, Volume 8, DOI: 10.24135/ijcmr.v8i.122। গবেষণাটি দেখুন
৫. Arviani, Heidy; Natasya Candraditya Subardja; Jessica Charisma Perdana. “Mental Healing in Korean Drama ‘It’s Okay to Not Be Okay’.” JOSAR, DOI: 10.35457/josar.v7i1.1532। গবেষণাটি দেখুন
৬. Baeksang Arts Awards. The 57th Baeksang Arts Awards, Television Awards, 2021। আনুষ্ঠানিক পুরস্কারতালিকা দেখুন
৭. CJ ENM Newsroom. “‘It’s Okay to Not Be Okay’ Recognized by NYT as Best International TV Show.” ৩ ডিসেম্বর ২০২০। সংবাদটি দেখুন
শেষ কথা
লেখকত্ব ও সম্পাদকীয় কৃতিত্ব
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0