বুদ্ধদেব বসু: কবিতা, আধুনিকতা ও বিশ্বসাহিত্যের এক নিরলস নির্মাতা

বুদ্ধদেব বসুর শৈশব, শিক্ষা, সাহিত্যসাধনা, কবিতা পত্রিকা, প্রতিভা বসুর সঙ্গে জীবন, যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্য প্রতিষ্ঠা ও বাংলা আধুনিকতায় তাঁর অবদান নিয়ে গবেষণাভিত্তিক জীবনী।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ২
বুদ্ধদেব বসু: কবিতা, আধুনিকতা ও বিশ্বসাহিত্যের এক নিরলস নির্মাতা
বই ও পাণ্ডুলিপির পাশে বসে হাতে সিগারেট ধরে থাকা এক সাহিত্যিকের সাদাকালো প্রতিকৃতি।

জীবনী • বাংলা সাহিত্য • আধুনিকতা

বুদ্ধদেব বসু: কবিতা, আধুনিকতা ও বিশ্বসাহিত্যের এক নিরলস নির্মাতা

কুমিল্লায় জন্ম নেওয়া মাতৃহীন এক শিশুর কবি, কথাসাহিত্যিক, সম্পাদক, অনুবাদক ও তুলনামূলক সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক পথিকৃৎ হয়ে ওঠার বহুমাত্রিক জীবনকথা

একজন লেখকের চেয়েও বেশি

বুদ্ধদেব বসুর জীবন নিয়ে লিখতে গেলে শুধু তাঁর জন্ম, শিক্ষা, চাকরি আর প্রকাশিত বইয়ের তালিকা দিলেই কাজ শেষ হয় না। তিনি ছিলেন রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের আত্মপরিচয় নির্মাণের অন্যতম সক্রিয় কারিগর। কবিতা লিখেছেন, উপন্যাস ও নাটক রচনা করেছেন, বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের বাংলায় এনেছেন, নতুন কবিদের জন্য পত্রিকা ও প্রকাশনার পরিসর নির্মাণ করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যকে একটি স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর জীবন তাই একই সঙ্গে ব্যক্তিগত সংগ্রাম, সাহিত্যিক শৃঙ্খলা এবং প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ইতিহাস।

সংক্ষেপে বুদ্ধদেব বসু

জন্ম: ৩০ নভেম্বর ১৯০৮, কুমিল্লা

আদি নিবাস: মালখানগর, বিক্রমপুর

প্রধান পরিচয়: কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সম্পাদক ও সাহিত্যসমালোচক

গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান: Kavita পত্রিকা, কবিতাভবন এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ

মৃত্যু: ১৮ মার্চ ১৯৭৪, কলকাতা

মাতৃহীন শৈশব ও শব্দের সঙ্গে প্রথম পরিচয়

১৯০৮ সালের ৩০ নভেম্বর কুমিল্লায় মাতামহের বাড়িতে বুদ্ধদেব বসুর জন্ম। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বিক্রমপুরের মালখানগর। পিতা ভূদেবচন্দ্র বসু ঢাকা বারের আইনজীবী ছিলেন। মা বিনয়কুমারী সন্তান জন্মের অল্প সময়ের মধ্যেই ধনুষ্টংকারে মারা যান। ফলে মাতামহ চিন্তাহরণ সিংহ ও মাতামহী স্বর্ণলতা সিংহের কাছেই তাঁর শৈশব গড়ে ওঠে।

কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ঢাকা তাঁর শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের প্রথম পর্বের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ক্ষেত্র। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রবেশের আগেই বাড়িতে ইংরেজি, বাংলা, সংস্কৃত ও গণিতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। এই শিক্ষায় কেবল পাঠ্যপুস্তক ছিল না। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের বিভিন্ন লেখক তাঁর কল্পনাজগৎ গঠনে ভূমিকা রাখেন।

শৈশবে ইংরেজিতে লেখা একটি কবিতাকে তিনি পরবর্তী সময়ে তাঁর কবিজীবনের আকস্মিক সূচনা হিসেবে স্মরণ করেছিলেন। ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি দেখায়, সাহিত্য তাঁর কাছে আগে এসেছিল ভাষার ব্যাকরণগত পরিচয় হিসেবে নয়, ছন্দ, ধ্বনি ও কল্পনার আকস্মিক অভিজ্ঞতা হিসেবে। পরে তিনি বাংলা ভাষাকেই নিজের প্রধান সাহিত্যিক মাধ্যম করে নেন।

ঢাকার শিক্ষাজীবন ও একজন আধুনিক লেখকের প্রস্তুতি

১৯২৩ সালে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯২৫ সালের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পঞ্চম এবং ১৯২৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৩০ সালে বিএ অনার্স এবং ১৯৩১ সালে এমএ সম্পন্ন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা তাঁকে শুধু ইংরেজি সাহিত্যের পাঠ দেয়নি। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাহিত্যকে পাশাপাশি পড়ার অভ্যাস, ভাষা ও রীতির তুলনা, সাহিত্যকে ইতিহাস ও সংস্কৃতির বৃহত্তর প্রবাহে দেখার ক্ষমতা এবং কঠোর পাঠশৃঙ্খলা তাঁর মধ্যে গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে কবিতা, সমালোচনা, অনুবাদ ও তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে তাঁর কাজের ভিত এই সময়েই নির্মিত হয়েছিল।

ছাত্রজীবনে তিনি হাতে লেখা পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন এবং ঢাকায় প্রগতি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কবিতা লেখা তাঁর কাছে তখন আর নিভৃত ব্যক্তিগত অভ্যাস ছিল না। লেখা প্রকাশ, অন্য লেখকের সাহিত্য নির্বাচন এবং নতুন সাহিত্যরুচি গড়ে তোলার দায়িত্বও তাঁর সাহিত্যচর্চার অংশ হয়ে উঠেছিল।

ঢাকা তাঁর জীবনে কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বুদ্ধদেব বসুর জন্ম কুমিল্লায় এবং পরিণত সাহিত্যজীবনের প্রধান ক্ষেত্র কলকাতা হলেও তাঁর বৌদ্ধিক ও সাহিত্যিক আত্মগঠন অনেকাংশে ঢাকায়। শিক্ষা, বন্ধুত্ব, পত্রিকা সম্পাদনা এবং আধুনিক সাহিত্য নিয়ে প্রাথমিক পরীক্ষা সবই এই শহরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তাঁকে শুধু কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যিক হিসেবে দেখলে তাঁর বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্ববাংলার অধ্যায় আড়ালে থেকে যায়।

কলকাতার অনিশ্চিত দিন ও লেখাকে জীবিকা করার সংগ্রাম

১৯৩১ সালে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর তিনি কলকাতায় চলে যান। নতুন শহরে তাঁর প্রতিষ্ঠা সহজ ছিল না। স্থায়ী আয়, বাসস্থান, প্রকাশক এবং লেখার সম্মানী নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে তিনি লেখাকে জীবিকা করার গৌরবের পাশাপাশি প্রকাশকের কাছে পাওনা অর্থের জন্য অপেক্ষা করার তিক্ততার কথাও জানিয়েছেন।

১৯৩৪ সালে তিনি রিপন কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সেখানে কাজ করেন। তাঁর স্মৃতিচারণে কর্মক্ষেত্রের অস্বস্তি ও ঢাকার শিক্ষাগত পরিচয়কে ঘিরে কলকাতার একাংশের বিরূপ মনোভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে এসব অভিজ্ঞতাকে একটি বৃহত্তর সামাজিক সত্য হিসেবে নয়, তাঁর ব্যক্তিগত কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা হিসেবে পড়াই যথার্থ।

তিনি The Statesman পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালে ইউনেস্কোর একটি প্রকল্পে দিল্লি ও মহীশূরে কাজ করেন এবং পরের বছর যুক্তরাষ্ট্রের Pennsylvania College for Women-এ অধ্যাপনা করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও বক্তৃতার সুযোগ তাঁর চিন্তায় আন্তর্জাতিক পরিসর আরও বিস্তৃত করে।

প্রতিভা বসু: প্রেম, সংসার ও সাহিত্যিক সহযাত্রা

১৯৩৪ সালের ১৯ জুলাই বুদ্ধদেব বসু প্রতিভা সোমকে বিয়ে করেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিভা সোম সাহিত্যজগতে প্রতিভা বসু নামে স্বতন্ত্র পরিচিতি অর্জন করেন। তিনি সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরে কথাসাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁদের দুই কন্যা মীনাক্ষী ও দময়ন্তী এবং এক পুত্র শুদ্ধশীল।

বুদ্ধদেব ও প্রতিভার সংসার সাধারণ অর্থে শুধু পারিবারিক সংসার ছিল না। এটি ছিল পাঠ, লেখা, সংগীত, অতিথি, পত্রিকা ও সাহিত্যিক আলোচনায় গড়ে ওঠা একটি সাংস্কৃতিক পরিসর। কলকাতার ২০২ রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের বাড়ি দীর্ঘকাল বাংলা সাহিত্যজগতের বহু লেখক ও কবির সাক্ষাৎস্থল হয়ে উঠেছিল।

বুদ্ধদেব বসুর নিবিষ্ট সাহিত্যসাধনার পেছনে প্রতিভা বসুর শ্রম, যত্ন ও বাস্তব দায়িত্ব গ্রহণের ভূমিকা ছিল। তবে তাঁকে কেবল স্বামীর সহায়ক হিসেবে দেখলে তাঁর নিজস্ব সৃজনশীল পরিচয় খর্ব হয়। তাঁরা ছিলেন দুই স্বতন্ত্র সাহিত্যিক, যাঁদের যৌথ জীবন বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল।

কবিতা পত্রিকা: আধুনিকতার একটি নির্মিত পরিসর

১৯৩৫ সালে কলকাতা থেকে বুদ্ধদেব বসুর সম্পাদনায় কবিতা পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়। বাংলা ভাষায় শুধু কবিতা এবং কবিতাবিষয়ক আলোচনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘকাল একটি পত্রিকা পরিচালনা করা ছিল সাহসী উদ্যোগ। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে প্রকাশিত এই পত্রিকা রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতার নতুন ভাষা, ছন্দ, দৃষ্টিভঙ্গি ও নন্দনতত্ত্ব নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, সমর সেনসহ বিভিন্ন প্রজন্মের কবিদের রচনা ও কবিতাবিষয়ক আলোচনা এই পত্রিকার পরিসরে স্থান পেয়েছে। বুদ্ধদেব বসু এখানে শুধু নিজের সাহিত্য প্রকাশ করেননি। তিনি পাঠক তৈরি করেছেন, নতুন কবিকে সামনে এনেছেন এবং কবিতা নিয়ে সুসংহত সমালোচনার ক্ষেত্র নির্মাণ করেছেন।

১৯৬০ সালে কবিতা-র শততম সংখ্যা আন্তর্জাতিক সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়। বাংলা কবিতার সঙ্গে বিদেশি কবিতার অনুবাদ যুক্ত করার এই প্রচেষ্টা তাঁর বিশ্বসাহিত্যবোধের পরিচয় বহন করে। কবিতাভবনও ধীরে ধীরে কেবল একটি ঠিকানা নয়, একটি সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান ও প্রকাশনা-পরিসরের নাম হয়ে ওঠে।

রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার এবং স্বতন্ত্র আধুনিকতা

বুদ্ধদেব বসুর প্রজন্মের সামনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একই সঙ্গে অনিবার্য শিক্ষক এবং বিশাল সাহিত্যিক পূর্বসূরি। রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার না করেও তাঁর প্রভাবের বাইরে একটি নতুন কাব্যভাষা নির্মাণ ছিল এই প্রজন্মের বড় চ্যালেঞ্জ। বুদ্ধদেব বসু সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন।

তাঁর কবিতায় প্রেম, শরীর, নিঃসঙ্গতা, নগরজীবন, সময়, মৃত্যু এবং ব্যক্তিমানুষের অন্তর্জগত গুরুত্ব পায়। কিন্তু আধুনিকতা তাঁর কাছে শুধু বিষয়বস্তুর পরিবর্তন ছিল না। শব্দ নির্বাচন, ছন্দ, রূপ, নির্মাণশৃঙ্খলা এবং কবিতার স্বতন্ত্র শিল্পমূল্যও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সাহিত্যকে রাজনৈতিক স্লোগান বা নৈতিক শিক্ষার অধীন করতে চাননি। সমাজ ও ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন থেকেও শিল্পের নিজস্ব বিচারপদ্ধতি রক্ষার পক্ষে ছিলেন।

একটি প্রচলিত সরলীকরণ

বুদ্ধদেব বসুকে “রবীন্দ্রবিরোধী” বলা তাঁর সাহিত্যিক অবস্থানকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে। রবীন্দ্রনাথের বিপুল প্রভাবের ভেতর থেকেও নতুন সাহিত্যভাষা নির্মাণের প্রয়াস এবং রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে পাঠ ও মূল্যায়ন করা, এই দুই প্রবণতা তাঁর কাজে পাশাপাশি ছিল।

কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও সমালোচক

বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যকর্ম কোনো একটি শাখায় সীমাবদ্ধ নয়। বন্দীর বন্দনা, কঙ্কাবতী, দ্রৌপদীর শাড়ি, শীতের প্রার্থনা: বসন্তের উত্তর এবং যে আঁধার আলোর অধিক তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যকর্মের মধ্যে রয়েছে। তাঁর কবিতায় রোমান্টিক আবেগের পাশাপাশি মনন, নির্মাণশৃঙ্খলা এবং আধুনিক মানুষের একাকিত্বের অনুভব পাওয়া যায়।

তিথিডোর, রাত ভ’রে বৃষ্টি, পাতাল থেকে আলাপ এবং গোলাপ কেন কালো তাঁর উল্লেখযোগ্য কথাসাহিত্য। সম্পর্ক, আকাঙ্ক্ষা, দাম্পত্য, একাকিত্ব ও নাগরিক জীবনের মনস্তাত্ত্বিক সংকট তাঁর উপন্যাসে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নাটকে তপস্বী ও তরঙ্গিণী, কলকাতার ইলেকট্রা এবং প্রথম পার্থ প্রাচীন কাহিনি ও আধুনিক অভিজ্ঞতার মধ্যে নতুন সংলাপ তৈরি করে।

সাহিত্যসমালোচনায় তিনি আবেগনির্ভর প্রশংসার বদলে পাঠ, রূপ, ভাষা, ঐতিহ্য ও নন্দনতত্ত্বকে গুরুত্ব দেন। কালের পুতুল, সাহিত্যচর্চা, রবীন্দ্রনাথ: কথাসাহিত্য এবং কবিতার শত্রু ও মিত্র তাঁর সমালোচনামূলক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

অনুবাদে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে বাংলার কথোপকথন

বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদচর্চা তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের কেন্দ্রীয় অংশ। কালিদাসের মেঘদূত, শার্ল বোদলেয়ার, রাইনার মারিয়া রিলকে এবং হেল্ডারলিনের কবিতা অনুবাদের মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষার পাঠকদের বিভিন্ন সাহিত্যিক ঐতিহ্যের কাছে নিয়ে যান।

তাঁর কাছে অনুবাদ ছিল শুধু অন্য ভাষার বক্তব্য বাংলায় স্থানান্তর নয়। এটি ছিল বাংলা কবিতার প্রকাশক্ষমতা পরীক্ষা, নতুন ছন্দ ও ভাবভঙ্গির সঙ্গে পরিচয় এবং নিজের সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে পুনর্বিবেচনার উপায়। এই অনুবাদমনস্কতাই পরবর্তী সময়ে তাঁর তুলনামূলক সাহিত্যচিন্তার সঙ্গে যুক্ত হয়।

যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা

১৯৫৬ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধদেব বসু নেতৃত্ব দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে বিভাগটিকে ভারতের প্রাচীনতম তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলা, ভারতীয় ও বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন ভাষা ও ঐতিহ্যকে সম্পর্কের মধ্যে পাঠ করার যে চর্চা তিনি সম্পাদনা, অনুবাদ ও সমালোচনায় করেছিলেন, তা এখানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

এই অবদানের তাৎপর্য শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগ প্রতিষ্ঠায় সীমাবদ্ধ নয়। ভাষাভিত্তিক বিচ্ছিন্নতার বদলে সাহিত্যিক আদানপ্রদান, আন্তঃসাংস্কৃতিক সম্পর্ক, অনুবাদ এবং বিশ্বসাহিত্যের ধারণাকে উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রে আনতে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর উদ্যোগে শুরু হওয়া Jadavpur Journal of Comparative Literature ভারতের তুলনামূলক সাহিত্যচর্চার প্রাচীনতম সাময়িকীগুলোর একটি।

প্রেম, শরীর ও “অশ্লীলতা”র বিতর্ক

বুদ্ধদেব বসুর কিছু রচনা প্রকাশের পর তাঁকে “অশ্লীল” বলার প্রবণতা দেখা যায়। এর পেছনে ছিল প্রেম, শরীর, যৌনতা, দাম্পত্যের সংকট এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে সাহিত্যের স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে গ্রহণ করার তাঁর সাহস। রক্ষণশীল সামাজিক দৃষ্টিতে যে অভিজ্ঞতাগুলো আড়ালে রাখার কথা, তিনি সেগুলোকে মানুষের মানসিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে সাহিত্যে স্থান দিয়েছিলেন।

রাত ভ’রে বৃষ্টি উপন্যাসে নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের দাম্পত্য, আকর্ষণ, বিচ্ছিন্নতা এবং প্রচলিত যৌননৈতিকতার সংকট বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এই ধরনের রচনার মূল্যায়নে শুধু শ্লীলতা বা অশ্লীলতার সামাজিক ধারণা যথেষ্ট নয়। চরিত্রের মনস্তত্ত্ব, শিল্পের প্রয়োজন এবং ভাষার ভূমিকা বিবেচনা করা জরুরি।

তাঁর সাহিত্যিক অবস্থানের কেন্দ্রে ছিল শিল্পের স্বাধীনতা। তবে এর অর্থ এই নয় যে সাহিত্য সমাজ ও নৈতিকতার সব প্রশ্নের বাইরে। বরং তিনি মনে করতেন, সাহিত্যকে তার পূর্ণ রূপ, ভাষা ও মানবিক জটিলতার আলোকে বিচার করতে হবে, বিচ্ছিন্ন শব্দ বা ঘটনার ভিত্তিতে নয়।

পুরস্কার, স্বীকৃতি ও শেষ জীবন

তপস্বী ও তরঙ্গিণী নাটকের জন্য বুদ্ধদেব বসু ১৯৬৭ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭০ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণে ভূষিত করে। স্বাগত বিদায় কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৭৪ সালে তিনি মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার পান বলে বাংলাপিডিয়ার জীবনপঞ্জিতে উল্লেখ রয়েছে।

জীবনের শেষ দশকেও তাঁর সৃষ্টিশীলতা থেমে থাকেনি। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ, স্মৃতিকথা ও সমালোচনা মিলিয়ে এই সময়েও তিনি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। সাহিত্য তাঁর কাছে অবসরের কাজ ছিল না। এটি ছিল তাঁর জীবনের প্রধান শৃঙ্খলা, পেশা এবং আত্মপরিচয়।

১৯৭৪ সালের ১৮ মার্চ কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়। প্রতিভা বসুর স্মৃতিচারণে তাঁর শেষ সময়ের যে মানবিক চিত্র পাওয়া যায়, সেখানে সাহিত্যিকের বৃহৎ পরিচয়ের আড়াল থেকে একজন স্বামী এবং জীবনসঙ্গীর মুখ ফুটে ওঠে। জীবনের শেষ মুহূর্তে প্রতিভাকে তাঁর পরিচিত নাম ধরে ডাকার ঘটনাটি তাঁদের দীর্ঘ সহযাত্রার এক মর্মস্পর্শী প্রতীক হয়ে আছে।

বুদ্ধদেব বসুর স্থায়ী উত্তরাধিকার

বুদ্ধদেব বসুর উত্তরাধিকার কেবল তাঁর শতাধিক গ্রন্থে নেই। তা রয়েছে বাংলা কবিতার জন্য নির্মিত সম্পাদকীয় পরিসরে, নতুন কবিদের গ্রহণ করার সাহসে, বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে বাংলার সংযোগে, সাহিত্যসমালোচনার মননশীলতায় এবং তুলনামূলক সাহিত্যকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার কাজে।

তিনি দেখিয়েছেন, একজন লেখক শুধু নিজের বই লিখে সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন না। তিনি পাঠক তৈরি করতে পারেন, অন্য লেখকের জন্য জায়গা নির্মাণ করতে পারেন, অনুবাদের মাধ্যমে ভাষার দিগন্ত প্রসারিত করতে পারেন এবং একটি সাহিত্যিক চিন্তাকে প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে পারেন। এই বহুমাত্রিক নির্মাণের কারণেই বুদ্ধদেব বসু বাংলা সাহিত্যের শুধু একটি স্মরণীয় নাম নন, তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যবোধের অন্যতম নির্মাতা।

শেষকথা

মাতৃহীন শৈশব, পূর্ববাংলার শহরগুলোতে বেড়ে ওঠা, ঢাকার শিক্ষাজীবন, কলকাতার আর্থিক অনিশ্চয়তা, প্রতিভা বসুর সঙ্গে সাহিত্যিক সংসার, কবিতা পত্রিকার দীর্ঘ সম্পাদনা, অনুবাদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন জ্ঞানশাখা প্রতিষ্ঠা, সবকিছু মিলিয়ে বুদ্ধদেব বসুর জীবন ছিল সাহিত্যের জন্য নিরলস শ্রমের জীবন। তিনি সাহিত্যকে শুধু লিখে যাননি। সাহিত্যকে ঘিরে একটি চিন্তা, রুচি, পাঠকসমাজ এবং প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে গেছেন।

লেখকত্ব, সম্পাদনা ও অধিকার

মূল লেখিকা: শ্রীমতী স্মৃতি দত্ত

মূল প্রকাশ: অভিযাত্রীর পূর্ববর্তী সংস্করণ, ১৮ আগস্ট ২০২৪

পূর্ববর্তী হালনাগাদ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৪

গবেষণা, তথ্য যাচাই ও সম্পাদনা: অভিযাত্রী সম্পাদনা প্যানেল

কপিরাইট: পুনরুদ্ধার, গবেষণা, সম্পাদনা ও বর্তমান প্রকাশনার একচেটিয়া অধিকার অভিযাত্রী কর্তৃক সংরক্ষিত। মূল লেখিকার নাম ও সৃজনশীল অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃত।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

১. বাংলাপিডিয়া। “বসু, বুদ্ধদেব।” জাতীয় জ্ঞানকোষ, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ। জন্ম, শিক্ষা, কর্মজীবন, প্রধান রচনা, পুরস্কার ও মৃত্যু-সংক্রান্ত জীবনপঞ্জি। মূল নিবন্ধ দেখুন

২. Jadavpur University. “Comparative Literature.” যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস এবং বিভাগ প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাতা দেখুন

৩. Jadavpur University. “Jadavpur Journal of Comparative Literature Archives.” সাময়িকীটির ইতিহাস, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাথমিক সম্পাদকদের তথ্য। আর্কাইভ দেখুন

৪. President’s Secretariat, Government of India. “Padma Awards, 1970.” The Gazette of India, ২৬ জানুয়ারি ১৯৭০। পদ্মভূষণপ্রাপ্তদের সরকারি তালিকায় বুদ্ধদেব বসুর নাম। সরকারি গেজেট দেখুন

৫. Encyclopedia.com. “Bose, Buddhadeva 1908–1974.” শিক্ষা, কর্মজীবন, গ্রন্থপঞ্জি, অনুবাদ ও আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক পরিচিতি। জীবনী ও গ্রন্থপঞ্জি দেখুন

৬. Literaturforum Indien e.V. “Buddhadeva Bose.” রবীন্দ্র-পরবর্তী আধুনিকতা, শিল্পের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সাহিত্যবোধ এবং বিশ্বসাহিত্যসংক্রান্ত মূল্যায়ন। নিবন্ধ দেখুন

৭. Parabaas. “Bibliography of Buddhadeva Bose.” কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা ও অনুবাদসহ বুদ্ধদেব বসুর গ্রন্থপঞ্জি। গ্রন্থপঞ্জি দেখুন

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
শ্রীমতী স্মৃতি দত্ত আমি স্মৃতি দত্ত। আদালতের পেশাগত জগৎ থেকে সাহিত্য ও সংগীতের সৃজনশীল পরিসর পর্যন্ত আমার পথচলা বিস্তৃত। পেশায় অ্যাডভোকেট হলেও লেখালেখিই আমার ভাবনা, অনুভূতি ও পর্যবেক্ষণ প্রকাশের সবচেয়ে আপন মাধ্যম। ছোটগল্প, অণুগল্প, জীবনী, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও ভ্রমণ নিয়ে লিখতে ভালোবাসি। কখনো একজন স্মরণীয় মানুষের জীবন আমাকে আকর্ষণ করে, কখনো একটি চলচ্চিত্র, আবার কখনো সংসারের খুব সাধারণ একটি সম্পর্কের মধ্যেই আমি গল্প খুঁজে পাই। আমি বঙ্গীয় সাহিত্যের সদস্য এবং কীবোর্ড বাজাতে ভালোবাসি। পাশাপাশি অ্যামওয়ে-সংশ্লিষ্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছি। আমার লেখা বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যাল ও টি.ভি শো’ এবং ‘লেনিন সাহেবের সাথে দেখা’। মানুষের জীবন, সময় ও স্মৃতির ভেতরে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো সহজ ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চাই।