ঘুম আসছে না কেন, আর কখন তা ইনসোমনিয়া?
ঘুম আসতে দেরি হওয়া, বারবার ঘুম ভাঙা বা ভোরে জেগে যাওয়ার কারণ কী? জানুন ইনসোমনিয়ার লক্ষণ, কারণ, আত্মসহায়তা, CBT-I ও চিকিৎসা।
ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্য
ঘুম আসছে না কেন, আর কখন তা ইনসোমনিয়া?
ঘুম আসতে দেরি হওয়া, রাতে বারবার জেগে ওঠা কিংবা খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যাওয়া কখন সাধারণ সমস্যা, আর কখন তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন?
প্রকাশনা ও সম্পাদনা নোট
মূল লেখক: মোঃ মেহেদি হাসান (বিকেল)
প্রথম প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২২, দ্য ব্যাকস্পেস জার্নাল
বর্তমান সংস্করণ: গবেষণাসমৃদ্ধ, তথ্য যাচাইকৃত ও হালনাগাদ পুনঃপ্রকাশ
গবেষণা, তথ্য যাচাই ও সম্পাদনা: অভিযাত্রী সম্পাদনা প্যানেল
ইনসোমনিয়া বা অনিদ্রা সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই ওয়াকিবহাল। কিন্তু এটি যে কেবল এক রাতে ঘুম না আসার বিষয় নয়, বরং আমাদের দিনের কাজ, মনোযোগ, মেজাজ, শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে আমাদের মনোযোগ তুলনামূলকভাবে কম। অনেক ক্ষেত্রে নেই বললেই চলে।
এর আগেও আমি কিছু মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ে লিখেছি। চেষ্টা করেছি লেখাগুলো তথ্যসমৃদ্ধ রাখতে। তবে একটি প্রবণতা খেয়াল করেছি। কোনো সমস্যার কয়েকটি লক্ষণ নিজের সঙ্গে মিলে গেলেই আমরা কখনো কখনো ধরে নিই, নিশ্চয়ই আমরাও সেই রোগে ভুগছি। এখানেই একটু সতর্ক থাকা দরকার।
কেবল কয়েকটি লক্ষণের মিল দেখে নিজেকে রোগী ঘোষণা করা ঠিক নয়। আবার ঘুম হচ্ছে না বলে সারাক্ষণ নিজের ঘুম পর্যবেক্ষণ করা, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকা কিংবা মনে মনে ধরে নেওয়া, “আজও আমার ঘুম হবে না”, উদ্বেগ আরও বাড়াতে পারে। ঘুম নিয়ে এই অতিরিক্ত ভয়, চিন্তা ও মানসিক সক্রিয়তা কখনো কখনো সমস্যাটিকে দীর্ঘায়িত করে। তবে শুধু নিজেকে রোগী মনে করলেই রোগ সৃষ্টি হয়, এমন সরল সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। রোগনির্ণয় একজন যোগ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর কাজ।
ইনসোমনিয়া মূলত কী?
ইনসোমনিয়া একটি ঘুমের ব্যাধি। ঘুমানোর পর্যাপ্ত সময় ও উপযুক্ত পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত ঘুম শুরু করতে, ঘুম ধরে রাখতে অথবা প্রত্যাশিত সময় পর্যন্ত ঘুমাতে অসুবিধা হওয়া এবং এর ফলে দিনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়া এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।
সাধারণভাবে আমরা বলি, ঘুম ঠিকমতো হচ্ছে না অথবা ঘুম আসছে না। কিন্তু বিষয়টিকে একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, ইনসোমনিয়ার প্রকাশ সবার ক্ষেত্রে একই রকম নয়। কিছু মানুষ দীর্ঘ সময় বিছানায় থেকেও ঘুমাতে পারেন না। কারও ঘুম আসে, কিন্তু রাতে কয়েকবার ভেঙে যায়। আবার কারও খুব সকালে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর আর ঘুম আসে না।
তবে নিজের ইচ্ছায় রাত জাগা, কাজের কারণে ঘুমানোর পর্যাপ্ত সময় না পাওয়া কিংবা দু-একটি রাত খারাপ ঘুম হওয়াকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনসোমনিয়া বলা যায় না। ঘুমের সমস্যার পাশাপাশি দিনের জীবন কতটা ব্যাহত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ইনসোমনিয়ার সাধারণ লক্ষণ
রাতের ঘুমের ক্ষেত্রে প্রধানত তিন ধরনের সমস্যা দেখা যেতে পারে:
১. ঘুম শুরু করতে অসুবিধা: বিছানায় যাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ঘুম না আসা। এপাশ থেকে ওপাশ করছেন, কিন্তু ঘুমের দেখা মিলছে না।
২. ঘুম ধরে রাখতে অসুবিধা: ঘুম আসে, কিন্তু রাতে বারবার ভেঙে যায়। জেগে ওঠার পর নতুন করে ঘুমাতেও সমস্যা হয়।
৩. খুব সকালে ঘুম ভেঙে যাওয়া: প্রত্যাশিত সময়ের অনেক আগে ঘুম ভেঙে যায় এবং এরপর আর ঘুম আসে না।
এসব হলো রাতের সমস্যা। তবে ইনসোমনিয়া বুঝতে দিনের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। দিনের বেলায় যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে:
১. সারাদিন ক্লান্ত বা অবসন্ন বোধ করা
২. কাজে বা পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা
৩. স্মৃতি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাময়িক সমস্যা
৪. বিরক্তি, উদ্বেগ বা মেজাজের পরিবর্তন
৫. কাজে ভুল বেড়ে যাওয়া বা স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া
৬. কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সহযোগী অস্বস্তি হিসেবে মাথাব্যথা
মাথাব্যথা ইনসোমনিয়ার নির্দিষ্ট বা একক লক্ষণ নয়। একইভাবে ক্লান্তি এবং দিনের বেলায় অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘুমিয়ে পড়ার প্রবণতাও এক বিষয় নয়। ইনসোমনিয়ায় অনেকে সারাদিন ক্লান্ত থাকলেও সহজে ঘুমাতে পারেন না। অন্যদিকে দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমিয়ে পড়ার প্রবণতা থাকলে ঘুমের ঘাটতি, ওষুধের প্রভাব বা অন্য কোনো ঘুমের ব্যাধিও বিবেচনা করা প্রয়োজন হতে পারে।
ইনসোমনিয়ার প্রকারভেদ
ইনসোমনিয়াকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। স্থায়িত্বের ভিত্তিতে এর প্রধান দুটি ধরন হলো স্বল্পমেয়াদি ইনসোমনিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি ইনসোমনিয়া।
স্বল্পমেয়াদি ইনসোমনিয়া
স্বল্পমেয়াদি ইনসোমনিয়া কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। কাজের চাপ, পরীক্ষা, পারিবারিক দুশ্চিন্তা, শোক, অসুস্থতা, ভ্রমণ, সম্পর্কের ভাঙন অথবা দৈনন্দিন সময়সূচির পরিবর্তনের পর এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে চাপের কারণ কমে এলে ঘুমও স্বাভাবিক হতে শুরু করে। সব সাময়িক ঘুমের সমস্যায় ওষুধ প্রয়োজন হয় না। তবে সমস্যা তীব্র হলে, দিনের কাজ ব্যাহত হলে অথবা নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি ইনসোমনিয়া
সপ্তাহে অন্তত তিন রাত ঘুমের সমস্যা হওয়া, তা অন্তত তিন মাস ধরে চলা এবং এর ফলে দিনের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হওয়া দীর্ঘমেয়াদি ইনসোমনিয়া নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে কোনো একটি সংখ্যা বা লক্ষণ মিললেই নিজে থেকে রোগনির্ণয় করা ঠিক নয়। চিকিৎসক ঘুমের ইতিহাস, দৈনন্দিন জীবন, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, ব্যবহৃত ওষুধ এবং অন্য ঘুমের ব্যাধির সম্ভাবনা বিবেচনা করেন।
ইনসোমনিয়া কেন হয়?
ইনসোমনিয়ার একটি মাত্র কারণ নেই। মানসিক, শারীরিক, পরিবেশগত ও আচরণগত বিভিন্ন বিষয় একসঙ্গে কাজ করতে পারে। মানসিক কারণগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা। তবে কারণের তালিকা এই তিনটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
মানসিক চাপ ও অতিচিন্তা
আমরা যখন এমন কিছু বিষয়ে চিন্তা করি, যার কারণে মন অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে পড়ে, তখন ঘুম আসা কঠিন হতে পারে। অফিসের কাজ, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার চাপ, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, আর্থিক সমস্যা কিংবা পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তা আমাদের মনকে ব্যস্ত রাখতে পারে। সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে করতে রাত গভীর হয়, কিন্তু মস্তিষ্ক যেন দিনের কাজ থেকে বের হতে পারে না।
অতীতের কোনো কষ্টকর অভিজ্ঞতার প্রভাবও ঘুমে পড়তে পারে। পরীক্ষায় ব্যর্থতা, চাকরি হারানো, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, গুরুতর অসুস্থতা কিংবা কাছের কারও মৃত্যু ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করতে পারে। তবে একই ঘটনা সবার ওপর একইভাবে প্রভাব ফেলে না। কারও ঘুম দ্রুত স্বাভাবিক হয়, কারও সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
ঘুম নিয়ে উদ্বেগ
যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে গভীর চিন্তা বা দুশ্চিন্তায় থাকেন, তাঁর ঘুম ব্যাহত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আবার ঘুম না হওয়া নিয়েই অতিরিক্ত চিন্তা শুরু হলে একটি নতুন চক্র তৈরি হতে পারে। “এখন ঘুম না হলে কাল কিছুই করতে পারব না” কিংবা “আজও নিশ্চয়ই ঘুম হবে না” ধরনের ভাবনা মানসিক উত্তেজনা বাড়ায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকা এবং জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা সমস্যাটিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
শারীরিক অসুস্থতা ও ব্যথা
দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, পিঠ বা জয়েন্টের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, হরমোনগত পরিবর্তন, স্নায়বিক সমস্যা এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। আবার কোনো শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতার সঙ্গে শুরু হওয়া ইনসোমনিয়া পরে নিজস্ব সমস্যা হিসেবেও টিকে থাকতে পারে।
জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, হাঁপিয়ে ওঠা কিংবা পায়ে অস্বস্তির কারণে বারবার নড়াচড়া করার মতো লক্ষণ থাকলে অন্য কোনো ঘুমের ব্যাধির সম্ভাবনাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন হতে পারে।
অনিয়মিত সময়সূচি ও রাতজাগার অভ্যাস
অনেকের আমার মতো রাত জাগার অভ্যাস থাকতে পারে। এতে সমস্যা কী? দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট দেরি করা সময়ে ঘুমাতে অভ্যস্ত হওয়ার পর হঠাৎ অনেক আগে বিছানায় গেলেই দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া সব সময় সম্ভব হয় না। প্রতিদিন ভিন্ন সময়ে ঘুমানো ও ওঠা, রাতের শিফটে কাজ করা কিংবা ছুটির দিনে সম্পূর্ণ ভিন্ন সময়সূচি অনুসরণ করা শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণ ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে রাত জাগলেই কেউ ইনসোমনিয়ায় আক্রান্ত, এমন নয়। কেউ নিজের পছন্দ বা কাজের কারণে দেরিতে ঘুমালেও সুযোগমতো পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুমাতে পারেন। ইনসোমনিয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত ঘুমানোর সুযোগ থাকার পরও ঘুমে সমস্যা এবং দিনের কার্যক্ষমতায় ব্যাঘাত থাকে।
পর্দার সামনে দীর্ঘ সময়
আমরা যারা ল্যাপটপ, ডেস্কটপ বা স্মার্টফোনে দীর্ঘ সময় কাজ করি, তাদের ঘুমের রুটিনেও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শোয়ার কাছাকাছি সময়ে উজ্জ্বল পর্দা দেখা, কাজ চালিয়ে যাওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকা কিংবা মানসিকভাবে উত্তেজক বিষয় দেখার ফলে ঘুমের সময় পিছিয়ে যেতে পারে।
তবে পর্দা ব্যবহার একাই সব ইনসোমনিয়ার ব্যাখ্যা নয়। পর্দা ব্যবহারের সময়, বিষয়বস্তু, কাজের ধরন, ঘুমের সময় পিছিয়ে যাওয়া এবং ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতা মিলিয়ে এর প্রভাব তৈরি হতে পারে।
ক্যাফেইন, নিকোটিন, অ্যালকোহল ও কিছু ওষুধ
চা, কফি বা অন্য উৎস থেকে নেওয়া ক্যাফেইন, বিশেষ করে দিনের শেষ ভাগে, ঘুম আসতে দেরি করাতে পারে। নিকোটিনও উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। অ্যালকোহল প্রথমে ঘুমঘুম ভাব আনলেও পরে ঘুম হালকা হয়ে যাওয়া বা রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কিছু ব্যবস্থাপত্রভুক্ত ও সাধারণ ওষুধও ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো ওষুধ নিয়ে সন্দেহ হলে নিজে থেকে বন্ধ না করে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
শরীরের সক্রিয়তা ও শান্ত মস্তিষ্ক
শরীর যখন সারাদিন একেবারেই সক্রিয় থাকে না অথবা মন কোনো চিন্তা থেকে বের হতে পারে না, তখন অনেকের ঘুমের প্রস্তুতি ব্যাহত হয়। আমাদের শরীরের উপযুক্ত সক্রিয়তাও জরুরি, পাশাপাশি শান্ত হওয়ার সুযোগও দরকার। তবে উদ্দেশ্য শরীরকে নিঃশেষ করে ফেলা নয়। নিয়মিত ও ভারসাম্যপূর্ণ শারীরিক সক্রিয়তা ঘুমের স্বাভাবিক চাপ তৈরি করতে সহায়তা করতে পারে।
ইনসোমনিয়া নিয়ে কথা বলা জরুরি কেন?
কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যে ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিশোরদের ক্ষেত্রে ঘুম ও জাগরণের সময় স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা পিছিয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে পড়াশোনা, অনিয়মিত সময়সূচি এবং রাতের পর্দা ব্যবহার যুক্ত হলে ঘুমের সময় আরও কমে যেতে পারে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক ও কিশোরদের ঘুমের সমস্যা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বয়স ও জীবনযাত্রার পার্থক্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিনের ঘুমের সমস্যা মনোযোগ, স্মৃতি, মেজাজ, শিক্ষা, কাজ এবং সামগ্রিক জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আবার উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা অন্য রোগের সঙ্গে এর দ্বিমুখী সম্পর্ক থাকতে পারে। এজন্য ইনসোমনিয়াকে শুধু মানসিক সমস্যা বা শুধু শারীরিক সমস্যা হিসেবে না দেখে একটি ঘুমের ব্যাধি হিসেবে দেখা প্রয়োজন, যার সঙ্গে মন ও শরীর উভয়ের সম্পর্ক রয়েছে।
নিজে থেকে কোন অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করতে পারেন?
চিকিৎসার আগে বা চিকিৎসার পাশাপাশি কিছু অভ্যাস ঘুমের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। তবে এই অভ্যাসগুলো দীর্ঘমেয়াদি ইনসোমনিয়ার পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার বিকল্প নয়।
১. ঘুম ও জাগরণের নিয়মিত সময় নির্ধারণ করুন: প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন। ছুটির দিনেও সময়ের বড় পরিবর্তন না করাই ভালো।
২. দিনের ঘুম পর্যবেক্ষণ করুন: দিনের ঘুম রাতে ঘুমে বাধা দিলে তা সীমিত করুন। বিশেষ করে দীর্ঘ কিংবা বিকেলের পরের ঘুম এড়িয়ে চলা সহায়ক হতে পারে। নিয়মিত দিনের ঘুমকে ইনসোমনিয়ার সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
৩. কাজ শেষ করার জন্য নিজেকে জোর করে জাগিয়ে রাখবেন না: কাজ, পড়াশোনা বা অসমাপ্ত দায়িত্বের কারণে নিয়মিত ঘুম পিছিয়ে দিলে শরীরের ঘুম-জাগরণের ছন্দে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
৪. নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: দিনের বেলায় নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বা উপযুক্ত ব্যায়াম ঘুমের মান উন্নত করতে পারে। শোয়ার একেবারে আগে তীব্র ব্যায়াম কারও কারও ঘুমে বাধা দিতে পারে।
৫. ঘুমের পরিবেশ আরামদায়ক রাখুন: ঘর শান্ত, অন্ধকার, পরিচ্ছন্ন ও আরামদায়ক রাখার চেষ্টা করুন। আলো, শব্দ, অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা এবং অপ্রয়োজনীয় উদ্দীপনা যেন ঘুমে বাধা না দেয়।
৬. খাবারের পর শরীরকে কিছুটা সময় দিন: খাবার খেয়েই শুয়ে না পড়ে কিছু সময় অপেক্ষা করুন। হালকা হাঁটাহাঁটি কারও জন্য আরামদায়ক হতে পারে, তবে এটি ইনসোমনিয়ার বাধ্যতামূলক চিকিৎসা নয়। শোয়ার খুব কাছে ভারী খাবার এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।
৭. শোয়ার আগে পর্দা সীমিত করুন: ঘুমের আগের একটি নির্দিষ্ট সময় ফোন, কম্পিউটারের কাজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মানসিকভাবে উত্তেজক অনলাইন কার্যক্রম থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন।
৮. ক্যাফেইন, নিকোটিন ও অ্যালকোহল সম্পর্কে সতর্ক থাকুন: দিনের শেষ ভাগে ক্যাফেইন এবং শোয়ার কাছাকাছি সময়ে নিকোটিন এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। অ্যালকোহলকে ঘুমের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা নিরাপদ সমাধান নয়।
৯. ঘুম না এলে নিজেকে জোর করবেন না: দীর্ঘ সময় বিছানায় জেগে থেকে ঘড়ি দেখার বদলে সাময়িকভাবে বিছানা ছেড়ে কম আলোয় শান্ত কোনো কাজ করা যেতে পারে। ঘুমঘুম অনুভব করলে আবার বিছানায় ফিরুন। দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় এই কৌশল পেশাদার CBT-I চিকিৎসার অংশ হিসেবে ব্যক্তিভেদে সমন্বয় করা হয়।
ইনসোমনিয়ার চিকিৎসা কী?
ইনসোমনিয়ার চিকিৎসা নির্ভর করে সমস্যার স্থায়িত্ব, তীব্রতা, সম্ভাব্য কারণ, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, ব্যবহৃত ওষুধ এবং অন্য কোনো ঘুমের ব্যাধি আছে কি না তার ওপর। তাই সবার চিকিৎসা একই হবে না।
CBT-I: দীর্ঘমেয়াদি ইনসোমনিয়ার প্রথম সারির চিকিৎসা
Cognitive Behavioral Therapy for Insomnia বা অনিদ্রার জ্ঞানীয় আচরণগত চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ইনসোমনিয়ার প্রথম সারির চিকিৎসা হিসেবে সুপারিশ করা হয়। এতে ঘুম নিয়ে অকার্যকর ভয় ও বিশ্বাস শনাক্ত করা, বিছানা ও ঘুমের সম্পর্ক পুনর্গঠন, ঘুমের সময়সূচি সামঞ্জস্য করা, শিথিলায়ন এবং ঘুমবিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এটি সাধারণত প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী বা থেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
ঘুমের সময় ঠিক রাখা, ব্যায়াম করা বা শোয়ার আগে পর্দা সীমিত করার মতো অভ্যাস সহায়ক ভিত্তি তৈরি করতে পারে। কিন্তু শুধু ঘুমের স্বাস্থ্যবিধির তালিকা দীর্ঘমেয়াদি ইনসোমনিয়ার পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নয়। দীর্ঘদিনের সমস্যায় CBT-I অথবা অন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে।
ঘুমের ওষুধ সম্পর্কে সতর্কতা
কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক রোগীর প্রয়োজন ও ঝুঁকি বিচার করে ঘুমের ওষুধ দিতে পারেন। সব ওষুধ সবার জন্য উপযুক্ত নয় এবং ওষুধের ধরন অনুযায়ী ব্যবহারকাল ও ঝুঁকিও ভিন্ন হতে পারে। কিছু ওষুধে পরদিন ঝিমুনি, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি, মনোযোগের সমস্যা কিংবা নির্ভরতার আশঙ্কা থাকতে পারে। তাই নিজে থেকে ঘুমের ওষুধ শুরু করা, অন্যের ওষুধ গ্রহণ করা, মাত্রা বাড়ানো অথবা হঠাৎ বন্ধ করা উচিত নয়।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসক CBT-I-এর সঙ্গে ওষুধ বিবেচনা করতে পারেন। তবে সবার জন্য সমন্বিত চিকিৎসা প্রয়োজন নয়। সিদ্ধান্তটি রোগীর প্রয়োজন, চিকিৎসার লক্ষ্য, সম্ভাব্য উপকার, ঝুঁকি ও পছন্দের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
কখন পেশাদার সহায়তা নেবেন?
নিচের কোনো পরিস্থিতি থাকলে চিকিৎসক বা ঘুমের সমস্যায় প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সঙ্গে কথা বলা উচিত:
১. ঘুমের সমস্যা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে বা ধীরে ধীরে বাড়ছে
২. পড়াশোনা, কাজ, সম্পর্ক বা দৈনন্দিন দায়িত্ব ব্যাহত হচ্ছে
৩. গাড়ি চালানো বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সময় অতিরিক্ত ঘুম পাচ্ছে
৪. ঘুমের মধ্যে জোরে নাক ডাকা, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা বা হাঁপিয়ে ওঠার ঘটনা রয়েছে
৫. দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা বা অন্য অসুস্থতা রয়েছে
৬. ঘুমের জন্য নিয়মিত ওষুধ, অ্যালকোহল বা অন্য কোনো পদার্থের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে
প্রাথমিকভাবে সাধারণ চিকিৎসক বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ঘুমবিশেষজ্ঞ অথবা CBT-I-তে প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানী বা থেরাপিস্টের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। সবার জন্য ঘুমের পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। অন্য কোনো ঘুমের ব্যাধির সন্দেহ অথবা চিকিৎসায় প্রত্যাশিত ফল না এলে বিশেষ পরীক্ষা বিবেচিত হতে পারে।
শেষ কথা
ইনসোমনিয়া শুধু “রাতে ঘুম আসে না” বলে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। আবার এক বা দুই রাত ঘুম খারাপ হলেই নিজেকে ইনসোমনিয়ার রোগী ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। ঘুমের সমস্যার ধরন, স্থায়িত্ব এবং দিনের জীবনে তার প্রভাব বুঝতে হবে।
নিজের ঘুমকে ভয় না পেয়ে বোঝার চেষ্টা করুন। প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নিন। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।
স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সতর্কতা
এই নিবন্ধ সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার জন্য। এটি ব্যক্তিগত রোগনির্ণয়, চিকিৎসকের পরামর্শ বা নির্ধারিত চিকিৎসার বিকল্প নয়। নিজের উপসর্গ বা ওষুধ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যোগ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শ নিন।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
১. American Academy of Sleep Medicine. International Classification of Sleep Disorders, Third Edition, Text Revision: Summary of Diagnostic Criteria Changes. ২০২৩। নথিটি দেখুন
২. World Health Organization. International Classification of Diseases 11th Revision: Sleep-wake Disorders. ICD-11 দেখুন
৩. National Heart, Lung, and Blood Institute. “What Is Insomnia?” National Institutes of Health, ২৪ মার্চ ২০২২। মূল পৃষ্ঠা দেখুন
৪. National Heart, Lung, and Blood Institute. “Insomnia: Treatment.” National Institutes of Health, ২৪ মার্চ ২০২২। চিকিৎসা নির্দেশনা দেখুন
৫. Riemann, Dieter, et al. “The European Insomnia Guideline: An Update on the Diagnosis and Treatment of Insomnia 2023.” Journal of Sleep Research, vol. 32, no. 6, 2023, e14035. https://doi.org/10.1111/jsr.14035DOI দেখুন
৬. Edinger, Jack D., et al. “Behavioral and Psychological Treatments for Chronic Insomnia Disorder in Adults: An American Academy of Sleep Medicine Clinical Practice Guideline.” Journal of Clinical Sleep Medicine, vol. 17, no. 2, 2021, pp. 255–262. https://doi.org/10.5664/jcsm.8986DOI দেখুন
৭. Dressle, Raphael J., and Dieter Riemann. “Hyperarousal in Insomnia Disorder: Current Evidence and Potential Mechanisms.” Journal of Sleep Research, vol. 32, no. 6, 2023, e13928. https://doi.org/10.1111/jsr.13928DOI দেখুন
৮. Hartstein, Lauren E., et al. “The Impact of Screen Use on Sleep Health across the Lifespan: A National Sleep Foundation Consensus Statement.” Sleep Health, vol. 10, no. 4, 2024, pp. 373–384. মূল নিবন্ধ দেখুন
৯. Xie, Yi, et al. “Effects of Exercise on Sleep Quality and Insomnia in Adults: A Systematic Review and Meta-Analysis of Randomized Controlled Trials.” Frontiers in Psychiatry, vol. 12, 2021, article 664499. https://doi.org/10.3389/fpsyt.2021.664499DOI দেখুন
১০. Buysse, Daniel J., et al. “Combination Treatment for Chronic Insomnia Disorder in Adults: An American Academy of Sleep Medicine Clinical Practice Guideline.” Journal of Clinical Sleep Medicine, ১৩ এপ্রিল ২০২৬. https://doi.org/10.1007/s44470-025-00038-8DOI দেখুন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0