দত্ত পরিবার | পর্ব ২২: যে পথের কোনো মালিক ছিল না

বিপরীত গুজবের আতঙ্কে মানুষ ঘর ছাড়তে শুরু করলে স্নেহা নামহীন মানবিক সহায়তার পথ খোলে। কিন্তু পশ্চিমঘরের কাগজে আসে নতুন নির্দেশ।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ২
দত্ত পরিবার | পর্ব ২২: যে পথের কোনো মালিক ছিল না
আহত হাতের চিকিৎসা, পুরোনো মানচিত্র এবং তালাবদ্ধ দরজার নিচে রহস্যময় কাগজ।
অভিযাত্রী ধারাবাহিক উপন্যাস
দত্ত পরিবার

পর্ব ২২: যে পথের কোনো নাম ছিল না

লেখক: মোঃ মেহেদি হাসান

দুটি পরিবর্তিত পাণ্ডুলিপি দুই জায়গায় বিপরীত সাম্প্রদায়িক গুজব ছড়িয়েছে। উভয় নথিতে ব্যবহৃত হয়েছে হাসানের তৈরি তিন বৃত্তের চিহ্ন। পশ্চিমঘরের দরজা এখনো বন্ধ, নিচের কাগজ অসম্পূর্ণ এবং অজ্ঞাত প্রেরক জানিয়ে দিয়েছে, বিশৃঙ্খলা আর লেখকের নিয়ন্ত্রণে নেই। এবার সত্য উদ্ধারের আগে মানুষকে রক্ষা করতে হবে।

টাইপরাইটারের দ্বিতীয় শব্দটির পর পশ্চিমঘর আবার নীরব হয়ে গেল।

টক।

টক।

দুটি শব্দের মধ্যে এমন কোনো ছন্দ ছিল না, যেখান থেকে বাক্য অনুমান করা যায়। শব্দগুলো টাইপরাইটারেরও হতে পারে। পুরোনো কাঠের ভেতরে ধাতব অংশ সরে যাওয়ারও হতে পারে। অমিত আগেই বলেছে, করিডরের দেয়ালে শব্দ বহনের ফাঁপা পথ থাকার সম্ভাবনা আছে। সম্ভাবনা পাওয়া গেছে। প্রমাণ নয়।

তবু ঘরের সবাই পশ্চিমঘরের দৃশ্যসংযোগের দিকে তাকিয়ে ছিল।

দরজা বন্ধ। তালা অক্ষত। নিচের ফাঁক দিয়ে পুরোনো কাগজের সাদা প্রান্ত বেরিয়ে আছে। বাদামি কালির আড়ালে যে বাক্যের কিছু অংশ দেখা গিয়েছিল, সেটিও আর এগোয়নি। হলুদ আলো কাগজের কিনারায় পড়ে খুব সরু একটি ছায়া তৈরি করেছে।

অজ্ঞাত প্রেরকের বার্তাটি পাশের পর্দায় স্থির:

“পর্যবেক্ষণ সম্পন্ন। বিশৃঙ্খলা এখন লেখকের নয়।”

নিজের লেখা অন্যের হাতে বদলে যেতে দেখার একটি অদ্ভুত সুবিধা আছে। মানুষ তখন বুঝতে পারে, লেখকত্ব আর নিয়ন্ত্রণ একই বিষয় নয়। অসুবিধা হলো, এই শিক্ষা সাধারণত পাঠক আহত হওয়ার আগেই পাওয়া ভালো। আমার ক্ষেত্রে সময়টি একটু দেরিতে এসেছে।

স্নেহা দৃশ্যসংযোগ বন্ধ করে দিল।

স্মৃতি দত্ত বললেন, “কেন বন্ধ করলে?”

“কারণ দরজাটি এখন কোথাও যাচ্ছে না,” স্নেহা বলল। “বাইরের মানুষ যাচ্ছে।”

“কাগজটি ভেতরে ফিরে গেলে?”

“তাহলে সেটিও নথিভুক্ত হবে। দরজা খোলা হবে না।”

“আমি দরজা খোলার কথা বলিনি।”

“আপনি এখনো বলেননি।”

মা ও মেয়ের মধ্যে বিরোধ সবসময় উচ্চস্বরে হয় না। কখনো একটি বাক্যের শেষ শব্দে ভবিষ্যতের পুরো ঝগড়া দাঁড়িয়ে থাকে।

অমিত তিনটি সংযোগপথ পরীক্ষা করছিল। ঢাকা, কলকাতা এবং অজ্ঞাত তৃতীয় কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে পড়া পরিবর্তিত নথির নমুনা আলাদা করে রেখেছে। দুটি ভাষ্য বিপরীত। একটিতে লেখা, অখণ্ড বাংলা একটি সম্প্রদায়ের গোপন দখলপরিকল্পনা। অন্যটিতে বিপরীত সম্প্রদায়কে ভবিষ্যৎ শত্রু হিসেবে দেখানো হয়েছে।

দুটি মিথ্যার ভাষা আলাদা। কাজ একই।

মানুষকে বোঝানো, তার পাশের মানুষটি ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে পরিকল্পনা করেছে। ফলে আগে আঘাত করা আত্মরক্ষা বলে মনে হবে।

সুবর্ণা কলকাতা থেকে দৃশ্যসংযোগে ছিল। পর্দার পেছনে কয়েকজনের চলাচল দেখা যাচ্ছে। কেউ কাগজ আনছে। কেউ ফোনে কথা বলছে। সে দুটি পরিবর্তিত পাঠের পাশাপাশি মূল যাচাইকরণ বিজ্ঞপ্তি রেখে বলল, “বাক্যগুলো ভিন্ন উৎস থেকে লেখা বলে মনে হয়। কিন্তু বিন্যাস একই। প্রথমে ইতিহাসের একটি সত্য অংশ, তারপর অপ্রমাণিত দাবি, শেষে জরুরি শত্রু।”

অমিত বলল, “দুটি নথির পরীক্ষামূলক স্তরে একই তিন বৃত্তের চিহ্ন আছে। ছবির ওপর পরে বসানো নয়। নথি তৈরির সময়ই ছিল।”

স্নেহা আমার দিকে তাকাল। “চিহ্নটি তোমার?”

“আমার তৈরি।”

সুবর্ণা বলল, “তাহলে পথটিও তোমার?”

“ছিল।”

“এখন?”

আমার ডান হাত টেবিলের ওপর ছিল। আঙুলগুলো ধীরে মুঠো করলাম। তর্জনী ও মধ্যমা নির্দেশ মানল। ছোট আঙুলে ঝিনঝিনি উঠল। ব্যথারও স্মৃতি আছে। শরীর তাকে ভুলতে দেয় না।

“আমার নিয়ন্ত্রণে নেই।”

স্নেহা বলল, “তোমার পরীক্ষা শেষ।”

“না,” বললাম। “আমার নিয়ন্ত্রণ শেষ।”

দুটি বাক্যের পার্থক্য রাজনৈতিক নথিতে খুব বড় হতে পারে। আহত মানুষের কাছে নয়।

মানচিত্রের বাইরে

স্মৃতি দত্ত আসন-মানচিত্রটি আবার সংরক্ষণকক্ষের দীর্ঘ টেবিলে খুললেন। Public, Archive, Relief, Dialogue ও Silent Lane-এর সম্ভাব্য পথগুলো আলাদা রঙে চিহ্নিত। কয়েক ঘণ্টা আগে এগুলো ছিল পরিকল্পনা। এখন মানচিত্রের ওপর ছোট ছোট আলো জ্বলছে।

কোথাও যোগাযোগের অনুরোধ। কোথাও চলাচলের বাধা। কোথাও আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। কোথাও আহত মানুষের খবর এসেছে, কিন্তু সংখ্যা যাচাই হয়নি।

কোনো আলো মানুষের সম্মতি বোঝায় না। শুধু কেউ কোনো পথ চেয়েছে, সেটি বোঝায়।

স্নেহা নিজের নামের পাশে থাকা নীল চিহ্নটি খুলে টেবিলের এক পাশে রাখল।

স্মৃতি দত্ত বললেন, “এখন ব্যক্তিগত আপত্তির সময় নয়।”

“এখনই ব্যক্তিগত সম্মতির সময়,” স্নেহা বলল। “আতঙ্কের মধ্যে মানুষ সহজে এমন দায়িত্ব নেয়, যা পরে আর তার নিজের থাকে না।”

“তোমার চিকিৎসাগত সক্ষমতা প্রয়োজন।”

“আমার চিকিৎসাগত সক্ষমতা থাকবে। আপনার রাজনৈতিক পথের অধীনে নয়।”

“Relief Lane রাজনৈতিক পথ নয়।”

“আপনার আসন-মানচিত্রে আছে। মানুষের কাছে পার্থক্যটি দৃশ্যমান হবে না।”

“তাহলে কী করবে?”

“নামহীন একটি মানবিক সহায়তা-সংযোগ চালু করব। সেখানে চিকিৎসা, নিরাপদ যাত্রা, অস্থায়ী আশ্রয় এবং যাচাইকৃত স্থানীয় তথ্য থাকবে। কোনো রাজনৈতিক চিহ্ন থাকবে না। তিন বৃত্তও নয়।”

সুবর্ণা বলল, “গুজব যাচাইয়ের কাজ আলাদা থাকবে। একই পথে সহায়তা ও রাজনৈতিক বক্তব্য রাখলে মানুষ সাহায্য নিতে ভয় পাবে।”

অমিত মাথা নাড়ল। “দুই ধরনের তথ্য একে অন্যকে দেখতে পাবে না। চিকিৎসা ও আশ্রয়ের তালিকা থেকে সাক্ষ্য বা রাজনৈতিক অবস্থান শনাক্ত করা যাবে না।”

স্মৃতি দত্ত জিজ্ঞেস করলেন, “নিয়ন্ত্রণ কার কাছে?”

“কোনো এক ব্যক্তির কাছে নয়,” স্নেহা বলল। “চিকিৎসার সিদ্ধান্ত চিকিৎসকেরা নেবেন। স্থানীয় পথের বর্তমান অবস্থা সেখানকার মানুষ নিশ্চিত করবে। আশ্রয় নেওয়া বা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নেবেন।”

“আহত মানুষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় না থাকলে?”

“তখন চিকিৎসাগত প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে। রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী নয়।”

স্মৃতি দত্ত আমার দিকে তাকালেন। “তোমার মত?”

মানুষের মতামত দুই কারণে চাওয়া হয়। একটি হলো, সত্যিই তার সিদ্ধান্ত জানা। অন্যটি হলো, সে কোন ভুল উত্তর দিতে যাচ্ছে, তা আগে দেখে নেওয়া। স্মৃতি দত্ত কোনটি করছেন, নিশ্চিত ছিলাম না।

“স্নেহার প্রস্তাবই ঠিক,” বললাম।

সুবর্ণা পর্দার ওপাশ থেকে বলল, “এত দ্রুত?”

“দীর্ঘদিন ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুশীলন করেছি। এখন সঠিক সিদ্ধান্ত চিনতে সামান্য কম সময় লাগে।”

“নিজের উন্নতির কৃতিত্ব নেওয়ার অভ্যাসটি এখনো যায়নি।”

“সব পরিবর্তন একই সপ্তাহে ঘটলে চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হতে পারে।”

স্নেহার ঠোঁটের কোণে সামান্য পরিবর্তন হলো। হাসি নয়। রসিকতাটি আপাতত প্রত্যাখ্যাত হয়নি।

স্মৃতি দত্ত মানচিত্রের ওপর রাখা নীল চিহ্নটির দিকে তাকালেন। তারপর Relief Lane-এর পাশের ফাঁকা জায়গায় একটি ছোট সাদা কাগজ রাখলেন।

“এটি তোমার স্বাধীন পথ,” তিনি বললেন। “নাম তুমি দেবে।”

স্নেহা মাথা নাড়ল। “এখন কোনো নাম দরকার নেই।”

নামহীন একটি মানবিক পথ। রাজনৈতিক পরিকল্পনার টেবিলে সম্ভবত এটিই সবচেয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

প্রথম মানুষটি

প্রথম নিশ্চিত চিকিৎসা-সংযোগ এল বিকেল চারটার কিছু আগে।

একটি ছোট বাজারের ওষুধের দোকান থেকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী কথা বলছিলেন। পেছনে ভাঙা কাচ। দোকানের অর্ধেক শাটার নামানো। মেঝেতে বসে থাকা একজনের কপালে গভীর কাটা। আরেকজন নিজের বাঁ কাঁধ ধরে আছেন।

আহত দুজন পরস্পরকে চেনেন না। অন্তত প্রথমে তাই বললেন। কীভাবে আহত হয়েছেন, সে বিষয়ে তাঁদের বক্তব্যও আলাদা। একজন বলেছেন, বাইরে থেকে ছোড়া কিছু কাচে লেগেছিল। অন্যজন বলেছেন, দোকানের শাটার নামানোর সময় ভিড়ের চাপে পড়ে গেছেন।

কোন বক্তব্য সত্য, তখনো জানা নেই। রক্তপাত বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের অপেক্ষা করে না।

স্নেহা পর্দার সামনে এগিয়ে গেল।

“রক্তপাত এখন কেমন?”

ওপাশের স্বাস্থ্যকর্মী উত্তর দিলেন।

“চেতনা স্বাভাবিক? সময় ও জায়গা সম্পর্কে বলতে পারছেন?”

আরেকটি উত্তর এল।

“নিরাপদ পরিবহন আছে?”

এই প্রশ্নের উত্তর আসতে সময় লাগল। বাজারের প্রধান পথের অবস্থা কেউ নিশ্চিত জানে না। একটি গাড়ি আছে, কিন্তু চালক যেতে রাজি নন। বিকল্প সরু পথের কথা একজন বলেছেন। পথটি এখনো চলাচলযোগ্য কি না, জানা নেই।

স্মৃতি দত্ত মানচিত্রে একটি রেখা দেখালেন। “এই পথ ব্যবহার করা যায়।”

স্নেহা জিজ্ঞেস করল, “শেষবার কবে যাচাই হয়েছে?”

“তিন ঘণ্টা আগে।”

“এখন কাউকে দেখে বলতে হবে।”

“তাতে সময় যাবে।”

“ভুল পথে পাঠালে আরও বেশি যাবে।”

স্থানীয় একজন মানুষকে পথের মুখ পর্যন্ত যেতে বলা হলো। কয়েক মিনিট পরে জানা গেল, পথটি পুরো বন্ধ নয়। কিন্তু মাঝখানে একটি ভাঙা গাছ পড়ে আছে। ছোট গাড়ি যাওয়ার মতো জায়গা নেই। অন্য একটি যান পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হলো।

কপালে আঘাত পাওয়া মানুষটি যেতে রাজি। কাঁধে আঘাত পাওয়া দোকানি দোকান ছাড়তে অস্বীকার করলেন।

স্মৃতি দত্ত বললেন, “তিনি আহত। এ অবস্থায় তাঁর সিদ্ধান্ত কতটা গ্রহণযোগ্য?”

স্নেহা আবার তাঁর সঙ্গে কথা বলল। নাম, সময়, অবস্থান এবং কী ঘটেছে সে বিষয়ে কয়েকটি প্রশ্ন করল। উত্তর পরিষ্কার। তারপর চিকিৎসা না নিলে সম্ভাব্য ঝুঁকি ব্যাখ্যা করল।

মানুষটি সব শুনে বললেন, দোকানে ওষুধ আছে। আশপাশের মানুষ সেগুলো নিতে আসবে। তিনি এখন গেলে দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।

“তিনি সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম,” স্নেহা বলল। “ঝুঁকি বুঝেছেন। জোর করা হবে না। তবে স্থানীয় চিকিৎসক পৌঁছানো পর্যন্ত কেউ তাঁর সঙ্গে থাকবে।”

স্মৃতি দত্ত কিছু বললেন না। তাঁর নীল পাথরের আংটির ওপর অন্য হাতের আঙুল থেমে রইল। এই অঙ্গভঙ্গিটি আগেও দেখেছি। তিনি সিদ্ধান্তটি মেনে নিয়েছেন, এমন নয়। আপাতত প্রতিরোধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

প্রথম সহায়তা-যানটি আহত মানুষটিকে নিয়ে বের হওয়ার সময় স্নেহা তার নাম জানতে চাইল না। কোনো ধর্মীয় পরিচয়ও নয়। শুধু ওষুধে প্রতিক্রিয়া আছে কি না এবং আগের কোনো চিকিৎসাগত সমস্যা আছে কি না জিজ্ঞেস করল।

পরিবর্তিত পাণ্ডুলিপির দুই পক্ষই সেই মুহূর্তে মানুষটির নাম জানতে আগ্রহী হতো। কারণ নাম দিয়ে তাকে পক্ষে বা বিপক্ষে বসানো যেত। চিকিৎসার কাজে নামের চেয়েও জরুরি কিছু তথ্য আছে। রাজনীতি প্রায়ই বিপরীত ক্রমে শেখে।

যানটি নিরাপদে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর সংবাদ এলে বিকেল গড়িয়ে গেছে। ছোট একটি সাফল্য। কোনো রহস্যের সমাধান নয়। কোনো রাজনৈতিক বিজয়ও নয়। শুধু একজন আহত মানুষ নিরাপদ জায়গায় পৌঁছেছেন।

সম্ভবত কাহিনির সব অগ্রগতি মানচিত্র বদলায় না। কিছু অগ্রগতি শুধু একজন মানুষের রক্তপাত বন্ধ করে।

দুটি প্রশ্ন

সুবর্ণার সাক্ষ্য-সংযোগে প্রথম ঘণ্টায় চৌদ্দটি বক্তব্য এল। সাতটি সরাসরি দেখা ঘটনা। পাঁচটি অন্যের কাছে শোনা। দুটি বক্তব্যে প্রেরক নিজেই নিশ্চিত নন, তিনি যা দেখেছেন, সেটি বর্তমান সময়ের ছবি কি না।

সুবর্ণা প্রতিটি সাক্ষ্যের শুরুতে দুটি প্রশ্ন রেখেছিল:

১. আপনি নিজে কী দেখেছেন?

২. এই মুহূর্তে আপনার কী প্রয়োজন?

প্রথম প্রশ্নটি গুজব থেকে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আলাদা করছিল। দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক বক্তব্যের ভেতর চাপা পড়া মানুষটিকে আবার সামনে আনছিল।

একজন বলেছেন, বাজারের সামনে মানুষের ভিড় দেখেছেন। কোনো হামলা দেখেননি। তাঁর প্রয়োজন বাড়িতে আটকে থাকা মায়ের ওষুধ।

আরেকজন বলেছেন, দুটি দোকানের কাচ ভাঙতে দেখেছেন। কারা ভেঙেছে, চিনতে পারেননি। তাঁর প্রয়োজন শিশুদের নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া।

তৃতীয়জন কোনো সংঘর্ষ দেখেননি। ফোনে একটি জমির তালিকার ছবি পেয়েছেন। তাঁর প্রয়োজন তালিকাটি সত্য কি না জানা।

অমিত ছবিটি পরীক্ষা করল। একই তালিকার অন্তত চারটি সংস্করণ পাওয়া গেছে। নামের সংখ্যা এক নয়। জমির পরিমাণ আলাদা। তারিখের ঘর কোনো সংস্করণে আছে, কোনো সংস্করণে নেই। সবগুলোতে তিন বৃত্তের চিহ্ন।

“মূল তালিকা আছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“এখন পর্যন্ত না,” অমিত বলল। “প্রত্যেকে অন্য কারও কাছ থেকে পেয়েছে।”

গুজবের প্রমাণ সবসময় পরের মানুষের কাছে থাকে। পরের মানুষটিকে জিজ্ঞেস করলে প্রমাণ আরও একজন দূরে সরে যায়। একসময় আপনি সীমান্তে পৌঁছে যান। গুজব তখন বলে, প্রমাণ ওপারে।

স্মৃতি দত্ত বললেন, “বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। কোনো বৈধ জমির তালিকা প্রকাশ হয়নি।”

অমিত বলল, “যারা তালিকার কথা জানে না, তারাও তখন খুঁজবে।”

সুবর্ণা বলল, “দাবিটি অস্বীকারের আগে যাচাইয়ের নিয়মটি প্রকাশ করি। পূর্ণ নথি, উৎস, সময় এবং স্বাধীন সমর্থন না থাকলে কোনো তালিকাকে সিদ্ধান্তের ভিত্তি না করতে বলি।”

“আতঙ্কের মধ্যে মানুষ পদ্ধতি পড়ে না,” স্মৃতি দত্ত বললেন।

স্নেহা উত্তর দিল, “তবু তাদের কী ভাবতে হবে বলার চেয়ে কীভাবে যাচাই করতে হবে বলা ভালো।”

আমি বললাম, “দুটি আলাদা তথ্যপত্র দরকার।”

সবাই আমার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ সন্দেহ করার পর মানুষ মনোযোগ দিলে নিজেকে আবার গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে। অনুভূতিটি বিপজ্জনক।

“প্রথমটিতে শুধু চিকিৎসা, আশ্রয় ও যাচাইকৃত পথ থাকবে,” বললাম। “দ্বিতীয়টিতে নথি যাচাইয়ের পদ্ধতি। একই পৃষ্ঠায় নয়।”

স্নেহা জিজ্ঞেস করল, “কেন?”

“যাতে চিকিৎসা নিতে গেলে কাউকে আমাদের রাজনৈতিক ভাষা গ্রহণ করতে না হয়।”

স্নেহার দৃষ্টিতে খুব সামান্য পরিবর্তন হলো। ক্ষমা নয়। অনুমোদনও নয়। শুধু সিদ্ধান্তটি তার পরীক্ষার প্রথম ধাপ পেরিয়েছে।

“তিন বৃত্তের চিহ্ন?” অমিত জিজ্ঞেস করল।

“কোনোটিতে থাকবে না।”

সুবর্ণা বলল, “নিজের তৈরি পথ থেকে প্রথমবার নিজের চিহ্ন সরাচ্ছ?”

“চিহ্নটি এখন মানুষের নিরাপত্তার চেয়ে বড় হয়ে গেছে।”

“চিহ্ন বড় হয়নি,” সুবর্ণা বলল। “তুমি তাকে যত বড় হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলে, সেটি এখন দৃশ্যমান।”

সঠিক কথা শুনলে মানুষের দুটি পথ থাকে। গ্রহণ করা অথবা বক্তার পুরোনো কোনো ভুল মনে করিয়ে দেওয়া। দ্বিতীয়টি বেশি আরামদায়ক।

“হ্যাঁ,” বললাম।

সন্ধ্যার আগে মানবিক সহায়তার প্রথম তথ্যপত্র বের হলো। সেখানে কোনো সংগঠনের নাম নেই। কোনো ঐতিহাসিক দাবি নেই। কোনো রাজনৈতিক মানচিত্র নেই। শুধু চিকিৎসা, আশ্রয়, যাচাইকৃত পথ এবং যোগাযোগের সময়।

দ্বিতীয় নথিতে সুবর্ণার দুটি প্রশ্ন এবং অমিতের চারটি যাচাই-শর্ত রাখা হলো:

১. পূর্ণ নথি কোথায়?

২. প্রথম প্রকাশের সময় কী?

৩. একই দাবি স্বাধীনভাবে আর কোথায় পাওয়া গেছে?

৪. ছবির মুখ, নাম ও তারিখ মূল নথির সঙ্গে মেলে কি না?

আমার কোনো বক্তব্য সেখানে রাখা হয়নি।

এটি সিদ্ধান্ত ছিল। শাস্তি নয়। তবু কিছু সিদ্ধান্ত শাস্তির চেয়ে বেশি কার্যকর। নিজের তৈরি বিশৃঙ্খলার সময়ে নিজের কণ্ঠ সরিয়ে রাখা সহজ নয়। লেখক বিশ্বাস করে, শেষ ব্যাখ্যাটি তারই দেওয়া উচিত। কারণ সে জানে, তার উদ্দেশ্য কী ছিল।

আহত মানুষের কাছে উদ্দেশ্য একটি বিলাসিতা। তার আগে রক্তপাত বন্ধ করতে হয়।

যে পথের কোনো নাম ছিল না

রাত নামার আগেই নামহীন মানবিক পথে ছয়টি সহায়তা-অনুরোধ এল।

দুটি চিকিৎসার। একটি ওষুধের। দুটি অস্থায়ী আশ্রয়ের। শেষ অনুরোধে শুধু একটি অবস্থান লেখা, কোনো নাম নেই। অবস্থানটি অসম্পূর্ণ। একই নামে দুই জায়গা থাকতে পারে। অমিত কোনো মানুষ পাঠাতে রাজি হয়নি। স্মৃতি দত্ত সম্ভাব্য দুটি পথ দেখালেন। স্নেহা স্থানীয় নিশ্চিতকরণ না আসা পর্যন্ত দুটিই স্থগিত রাখল।

“ওপাশে সত্যিই মানুষ থাকলে?” স্মৃতি দত্ত বললেন।

“তাহলে তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য ভুল জায়গায় মানুষ পাঠিয়ে আরেকটি বিপদ তৈরি করব না,” স্নেহা উত্তর দিল।

“কখনো সিদ্ধান্তের সময় পূর্ণ তথ্য থাকে না।”

“তাই অনিশ্চয়তাটিও সিদ্ধান্তের মধ্যে থাকবে।”

কিছুক্ষণ পরে স্থানীয় একটি নম্বর থেকে উত্তর এল। অনুরোধের অবস্থান প্রথম সম্ভাব্য জায়গাটি নয়। দ্বিতীয়টিরও পুরো ঠিকানা নয়। কাছাকাছি একটি পরিত্যক্ত বিদ্যালয়ঘরে তিনটি পরিবার অপেক্ষা করছে। তাদের কেউ পাণ্ডুলিপির সঙ্গে যুক্ত নয়। কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য কি না, জানা নেই। জানতে চাওয়াও হয়নি।

নিরাপদ যাত্রার জন্য স্থানীয় দুই ব্যক্তির সাহায্য নেওয়া হলো। তাঁরা নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি। স্নেহা বলল, নাম না বলেও বর্তমান পথের অবস্থা ও অপেক্ষমাণ মানুষের সংখ্যা নিশ্চিত করা যায়।

স্মৃতি দত্ত বললেন, “নাম ছাড়া দায় নির্ধারণ করা কঠিন।”

সুবর্ণা বলল, “সব দায় কেন্দ্রের নথিতে নাম রেখে শুরু হয় না। কখনো কাজটি আগে বাঁচাতে হয়।”

স্মৃতি দত্ত তার দিকে তাকালেন। “তুমি নামহীন ক্ষমতাকে সমর্থন করছ?”

“না। নামহীন সহায়তা আর নামহীন ক্ষমতা এক নয়। একটি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে থেমে যায়। অন্যটি তার ভবিষ্যৎ ঠিক করতে চায়।”

আমি কোনো মন্তব্য করলাম না। কারণ সংজ্ঞাটির দ্বিতীয় অংশে আমার পুরোনো কাজের সাদৃশ্য ছিল। সুবর্ণা সেটি আমার দিকে তাকিয়ে বলেনি। প্রয়োজনও ছিল না।

তিনটি পরিবার নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর খবর এলে স্নেহা শুধু সময়টি লিখে রাখল। কোনো পতাকা উঠল না। কেউ বিজয়ের ঘোষণা দিল না। নামহীন পথটি একটি কাজ শেষ করল। তারপর পরবর্তী অনুরোধের অপেক্ষায় রইল।

সম্ভবত এ কারণেই পথটির কোনো নাম প্রয়োজন ছিল না। নাম এলে উত্তরাধিকার আসে। উত্তরাধিকার এলে মালিকানা। মালিকানা এলে একসময় কেউ প্রশ্ন করে, শেষ সিদ্ধান্তের অধিকার কার।

স্নেহা অন্তত আজ কোনো শেষ সিদ্ধান্তের আসন তৈরি করতে চায়নি।

শর্তের প্রথম পরীক্ষা

রাত আটটার পরে আমার ডান হাতের ব্যথা বাড়ল।

প্রথমে আঙুলের ডগায় ঝিনঝিনি। তারপর বাহুর গভীর থেকে কাঁধ পর্যন্ত গরম রেখা। আমি হাতটি শরীরের কাছে স্থির করে রাখলাম। কেউ জিজ্ঞেস না করলে বলার প্রয়োজন নেই, এই পুরোনো যুক্তিটি এখনো পুরোপুরি মরেনি।

স্নেহা দূর থেকে দেখেই বলল, “হাতটা সামনে রাখো।”

“এভাবে ভালো আছে।”

“তুমি ভালো আছ কি না জিজ্ঞেস করিনি।”

“আমাদের যোগাযোগে আহত মানুষ আছে।”

“তুমিও আহত।”

“তুলনামূলকভাবে কম।”

“চিকিৎসায় তুলনামূলক আত্মত্যাগ নামে কোনো পরীক্ষা নেই।”

সে আমার সামনে এসে স্লিংয়ের অবস্থান পরীক্ষা করল। আঙুল নড়াতে বলল। তর্জনী নড়ল। মধ্যমা ধীরে সাড়া দিল। ছোট আঙুলে অনুভূতি কম।

“কখন থেকে ব্যথা বাড়ছে?”

“সন্ধ্যার আগে।”

তার হাত থেমে গেল। “এখন বললে কেন?”

“তুমি জিজ্ঞেস করেছ।”

“আমার প্রথম শর্ত কি শুধু রাজনৈতিক তথ্য নিয়ে ছিল?”

“আমি ভেবেছিলাম চিকিৎসাগত গোপনীয়তার সুবিধা রোগীরও থাকে।”

“নিজের চিকিৎসকের কাছ থেকে?”

“আইনের এই অংশ নিয়ে আমার গবেষণা দুর্বল।”

“হাসান।”

একটি নাম কখনো প্রশ্ন। কখনো সতর্কতা। কখনো সম্পর্কের শেষ সীমা। এবার তিনটিই ছিল।

“ভুল হয়েছে,” বললাম।

“কেন ভুল?”

“কারণ তথ্যটি আমার শরীরের হলেও তোমার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। আমি কতক্ষণ কাজ করব, কোথায় যাব, তুমি আমাকে চিকিৎসা দেবে কীভাবে, সব বদলায়।”

স্নেহা কয়েক মুহূর্ত চুপ রইল। তারপর স্লিংয়ের নিচে নতুন সমর্থন দিল।

“শর্তের ভাষা মুখস্থ করেছ,” সে বলল।

“প্রয়োগে নম্বর কেমন?”

“উত্তীর্ণ নও।”

“পুনঃপরীক্ষা?”

“চলছে।”

তার আঙুল আমার কবজির কাছে নাড়ি গুনছিল। খুব সাধারণ স্পর্শ। তবু দিনের সমস্ত মানচিত্র, নথি ও রাজনৈতিক বাক্যের বাইরে শরীর মনে রাখল, এই মানুষটির কাছে আমি একটি রাষ্ট্র, একটি পরিচয় অথবা একটি পরীক্ষা নই। আহত একজন মানুষ।

“আজ আর কাজ করবে না,” স্নেহা বলল।

“পশ্চিমঘর?”

“দরজা এখনো বন্ধ। তোমার জেগে থাকা সেটিকে দ্রুত খুলবে না।”

“আমার ঘুম সাধারণত কোনো রহস্য সমাধান করে না।”

“তোমার স্বপ্নের ইতিহাস বিবেচনায় কথাটি প্রমাণিত নয়।”

সুবর্ণা পর্দার ওপাশে হেসে ফেলল। অমিত মুখ ঘুরিয়ে নিল। স্মৃতি দত্ত হাসলেন না। তিনি নামহীন পথের সাদা কাগজটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

কাগজটি আবার নড়ল

রাত আটটা সাতচল্লিশে পশ্চিমঘরের দৃশ্যসংযোগ নিজে থেকে চালু হলো।

অমিত বলল, “আমি চালু করিনি।”

ডা. তাহমিনা করিডরের অন্য প্রান্তে ছিলেন। দৃশ্যসংযোগে তাঁকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। দরজার নিচের হলুদ আলো আগের চেয়ে ম্লান। কাগজটি সামান্য আরও বাইরে এসেছে।

“কেউ কাছে গিয়েছিল?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।

তাহমিনা বললেন, “না। দুই প্রান্তের মানুষও একই কথা বলছে। পূর্ণ প্রবেশতথ্য সংরক্ষিত আছে।”

“জানালা?”

“বন্ধ। নিচের ভাঙা কাঠের অংশ দিয়ে বাতাস ঢুকতে পারে।”

কাগজের নড়াচড়ার একটি মানবসৃষ্ট নয়, ভৌত সম্ভাবনা পাওয়া গেল। কিন্তু কাগজটি আগে কোথায় ছিল, কে রেখেছিল এবং কেন এখন বের হচ্ছে, জানা গেল না।

স্নেহা বলল, “কেউ স্পর্শ করবে না। দূর থেকে ছবি নিন।”

তাহমিনা কয়েকটি ছবি নিলেন। অমিত আগের ছবির সঙ্গে পাশাপাশি রাখল। কাগজটি প্রায় দুই আঙুল পরিমাণ এগিয়েছে। আগে দৃশ্যমান দুটি বাঁকানো রেখার নিচে এবার আরও কিছু চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।

মৈত্রেয়ী দূরের সংযোগে ছবিটি বড় করে দেখলেন। “এটি সম্পূর্ণ বাক্য নয়। কয়েকটি শব্দের নিচের অংশ।”

সুবর্ণা বলল, “ছবিটি উল্টো করলে?”

অমিত ছবিটি ঘোরাল। নদীর বাঁক ও ভাঙা স্থলপথের মাঝের ফাঁকটি এবার আরও পরিষ্কার। তার নিচে তিনটি শব্দের অংশ। প্রথমটির ওপর বাদামি কালি। দ্বিতীয়টির মাঝখান মুছে গেছে। তৃতীয়টি প্রায় পাঠযোগ্য।

অক্ষরগুলো আলাদা করে দেখে মৈত্রেয়ী সম্ভাব্য পাঠ দিলেন। তিনি আগেই জানালেন, মূল কাগজ হাতে না পাওয়া পর্যন্ত এটি শুধু দৃশ্যমান অংশের পাঠ।

“...আসনের আগে পথ...”

স্মৃতি দত্ত বললেন, “প্রথম আসনের আগে পথ?”

স্নেহা বলল, “দৃশ্যমান শব্দের বাইরে বাক্য পূরণ করা যাবে না।”

আমি ছবিটির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। পোড়ানো নথির স্মৃতি ফিরে এল না। বরং একটি অনুভূতি। কাগজের ওপর হাত রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কারও কণ্ঠ বলেছিল, আসনকে রক্ষা করলে পথ হারাবে। নাকি পথকে রক্ষা করলে আসন হারাবে?

দুটি বাক্যের মধ্যে কোনটি শুনেছিলাম, নিশ্চিত নই। হতে পারে কোনোটিই নয়। বর্তমান দৃশ্য থেকে মস্তিষ্ক অতীতের জন্য একটি উপযুক্ত বাক্য বানাচ্ছে।

“কিছু মনে পড়েছে?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।

“একটি অনুভূতি। বাক্য নয়।”

“কী অনুভূতি?”

“পথ আর আসনের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার কথা ছিল।”

সুবর্ণা বলল, “তুমি কোনটি বেছেছিলে?”

“জানি না।”

“আজ?”

নামহীন মানবিক পথের সাদা কাগজটি টেবিলের ওপর। সেখানে কোনো চিহ্ন নেই। প্রথম আসনের মানচিত্র এখনো ভাঁজ করা। তিনটি পরিবার আশ্রয়ে পৌঁছেছে। একজন আহত মানুষ চিকিৎসা পেয়েছেন। দুই পক্ষের গুজব পুরো থামেনি, কিন্তু মৃত্যুর নিশ্চিত খবরও নেই।

“আজ পথ,” বললাম।

স্মৃতি দত্ত জিজ্ঞেস করলেন, “আগামীকাল?”

“আগামীকালের সিদ্ধান্ত আজ নিয়ে রাখব না।”

স্নেহা আমার দিকে তাকাল। এবার দৃষ্টির পরিবর্তনটি ব্যাখ্যা করলাম না। কোনো কোনো সম্পর্কের অগ্রগতি প্রমাণের ভাষায় ধরতে গেলে তার স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়।

কাগজটি আবার নড়ল।

তাহমিনা এক ধাপও এগোলেন না। বাতাসের সম্ভাব্য চাপ নথিভুক্ত হলো। দৃশ্যসংযোগে কাগজের আরও একটি সরু অংশ দেখা গেল।

এবার বাক্যের শেষ দিকটি প্রায় পরিষ্কার:

“...পথ বাঁচবে মানুষের সম্মতিতে।”

ঘরের কেউ কথা বলল না।

বাক্যটি আমাদের বর্তমান আলোচনার সঙ্গে খুব সুবিধাজনকভাবে মিলে যায়। তাই সেটিকে বিশ্বাস করার আগে আরও বেশি সন্দেহ করা দরকার। কোনো অজ্ঞাত পক্ষ আমাদের ভাষা শুনে থাকতে পারে। পুরোনো নথি পরিবর্তিত হতে পারে। বাক্যের প্রথম অংশে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থও থাকতে পারে।

তবু স্মৃতি দত্ত ধীরে নামহীন পথের সাদা কাগজটির দিকে তাকালেন।

“Relief Lane-এর মানচিত্রটি আপাতত স্থগিত থাক,” তিনি বললেন। “স্নেহার স্বাধীন সংযোগ চলবে।”

স্নেহা জিজ্ঞেস করল, “কত দিন?”

“যত দিন সংশ্লিষ্ট মানুষের সম্মতি ছাড়া মানচিত্র পূর্ণ করা যাচ্ছে না।”

“এটি সাময়িক মেনে নেওয়া, না নীতিগত পরিবর্তন?”

স্মৃতি দত্ত মেয়ের দিকে তাকালেন। “এখন সাময়িক। স্থায়ী সিদ্ধান্তের আগে আমি নিজের অভ্যাস পরীক্ষা করব।”

স্নেহা কোনো অভিনন্দন দিল না। শুধু মাথা নাড়ল। মানুষের নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস একটি বাক্যে বদলায় না। কিন্তু কখনো প্রথমবার অভ্যাসটির নাম বলা হয়। পরিবর্তনের শুরু সম্ভবত সেখানেই।

অমিত বলল, “নামহীন পথের প্রথম দিনের সব তথ্য আলাদা করে সংরক্ষণ করেছি। কোনো রাজনৈতিক চিহ্ন নেই। প্রত্যেক অনুরোধের সম্মতির অবস্থা আলাদা।”

সুবর্ণা বলল, “গুজবের দুই উৎস এখনো খোলা। একটি পথ বন্ধ করলে অন্যটি ভাষা বদলে ফিরে আসতে পারে।”

“আগামীকাল থেকে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য প্রকাশ করব,” সে যোগ করল। “নাম নয়। মানুষ কী দেখেছে এবং কী দেখেনি, সেটি।”

আমি বললাম, “আমার ভূমিকা?”

স্নেহা উত্তর দিল, “আজ রাতে বিশ্রাম।”

“রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে?”

“চিকিৎসাগত সীমা হিসেবে।”

“আপিল?”

সুবর্ণা বলল, “শুনব। রায় একই থাকবে।”

অমিত যোগ করল, “আমিও সমর্থন করছি।”

স্মৃতি দত্ত বললেন, “আমি আপত্তি করছি না।”

একটি ঘরে চারজন বুদ্ধিমান মানুষ থাকলে চারটি পরিকল্পনা তৈরি হয়। আমার বিশ্রামের প্রশ্নে তারা একমত হয়েছে। রাজনৈতিক ইতিহাসে আমার সবচেয়ে ব্যক্তিগত পরাজয়।

স্নেহা আমাকে চিকিৎসাকক্ষের দিকে নিয়ে গেল। হাত ধরল না। পিঠের কাছেও হাত রাখল না। হাঁটার গতি এমন রাখল, যাতে আমি পাশে থাকতে পারি। যত্ন সবসময় শরীর ধরে রাখে না। কখনো নিজের গতি কমিয়ে অন্য মানুষকে একা পড়ে যেতে দেয় না।

দরজার কাছে গিয়ে বললাম, “তোমার তিনটি শর্তের প্রথমটিতে আজ পুরোপুরি ব্যর্থ হইনি।”

“পুরোপুরি সফলও হওনি।”

“মধ্যবর্তী ফল গ্রহণযোগ্য?”

“মানুষের সব সম্পর্কই মধ্যবর্তী ফলে চলে।”

“তাহলে বিয়ের আবেদন এখনো বিবেচনাধীন?”

স্নেহা থামল। “তুমি বিশ্রাম নাও।”

“এটি প্রত্যাখ্যান নয়।”

“চিকিৎসকের নির্দেশকে রাজনৈতিক ফল বানিয়ো না।”

সে ঘরে ঢুকে আলো জ্বালাল। আমি তার পেছনে ঢুকলাম।

ঠিক তখন পশ্চিমঘরের দৃশ্যসংযোগ থেকে অমিতের ডাক এল।

“হাসান, শেষ অংশটা দেখ।”

স্নেহা পর্দাটি চিকিৎসাকক্ষে খুলল। পশ্চিমঘরের দরজা বন্ধ। তালা অক্ষত। হলুদ আলো নিভে গেছে। কাগজটি আর নড়ছে না।

কিন্তু কাগজের একেবারে নিচে, আগে দরজার ফাঁকের ভেতরে থাকা অংশে, তিনটি ছোট ঘর দেখা যাচ্ছে।

প্রথম ঘরের নিচে নদীপথের চিহ্ন।

দ্বিতীয় ঘরের নিচে ভাঙা স্থলপথ।

তৃতীয় ঘরটি খালি।

তার পাশে বাদামি কালির আড়ালে একটি অসম্পূর্ণ সংখ্যা। প্রথমে তিন মনে হলো। পরে আলো বদলালে পাঁচও হতে পারে। ছবির মান থেকে নিশ্চিত হওয়া গেল না।

সুবর্ণা বলল, “পাঁচ, এগারো, সাতচল্লিশ।”

আমি উত্তর দিলাম, “সংখ্যাটি পাঁচ কি না নিশ্চিত নয়।”

“তবু যদি হয়?”

পর্ব ১৩-তে পাওয়া তার প্রান্তলিখনের তিন সংকেত মনে পড়ল। সাতচল্লিশ দিয়ে অনুসন্ধান শুরু না করার সতর্কতা। আমরা সাতচল্লিশের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু পাঁচ ও এগারোর পূর্ণ অর্থ এখনো জানি না।

“তাহলে আমরা ভুল দিক থেকে পড়ছি,” বললাম।

অমিত জিজ্ঞেস করল, “কাগজ?”

“কাগজ নয়। পুরো বিশৃঙ্খলা।”

স্নেহা বলল, “এখন কোনো সিদ্ধান্ত নয়।”

“না,” বললাম। “আগে পাঁচ।”

সুবর্ণা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, “পাঁচ নম্বর পাণ্ডুলিপি হারায়নি।”

“জানি।”

“শেষ কবে পড়েছ?”

প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার জন্য স্মৃতি খুঁজতে হলো না।

“কখনো পড়িনি,” বললাম। “লিখে শেষ করার পরও না।”

অমিতের কণ্ঠ এল, “কেন?”

“কারণ পাণ্ডুলিপি পাঁচ আমার একার লেখা ছিল না।”

ঘরের বাতাস যেন থেমে গেল।

সুবর্ণা খুব ধীরে জিজ্ঞেস করল, “আর কার?”

এইবার উত্তরটি পুরো জানা ছিল না। কিন্তু একটি মুখ মনে পড়ল। মুখ নয়, বাঁ হাতের লেখা। নীল কালি। বাক্যের শেষে পূর্ণচ্ছেদ না দিয়ে ছোট একটি বৃত্ত।

“নাম মনে নেই,” বললাম। “তবে হাতের লেখা চিনতে পারব।”

স্নেহা আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি বাকিটা লুকাইনি। কারণ বাকিটা সত্যিই জানতাম না।

অমিত বলল, “পাণ্ডুলিপি পাঁচ কোথায়?”

মৈত্রেয়ীর দূর সংযোগ থেকে উত্তর এল।

“১০১টি উপস্থিত পাণ্ডুলিপির সংরক্ষণতালিকায় আছে। তবে একটি সমস্যা হয়েছে।”

“কী সমস্যা?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।

“পাণ্ডুলিপি নম্বর পাঁচের মলাট আছে। ভেতরের পৃষ্ঠাগুলো নম্বর এগারোর।”

পাঁচ।

এগারো।

সাতচল্লিশ।

প্রথম দুটি সংখ্যা আলাদা সূত্র ছিল না। একই বস্তুতে পাশাপাশি রাখা ছিল।

আমি বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে পর্দার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ডান হাতের ব্যথা তখনো আছে। বাইরে গুজব পুরো থামেনি। পশ্চিমঘরের দরজাও খোলেনি।

তবু প্রথমবার আমাদের সামনে এমন একটি পথ খুলল, যার শুরু নতুন কোনো অজ্ঞাত বার্তায় নয়। শুরু আমার নিজের ১০১টি উপস্থিত পাণ্ডুলিপির ভেতরে।

হারানো ছয়টির আগে উপস্থিত একশ একটির হিসাব আবার করতে হবে।

চলবে...

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান মোঃ মেহেদি হাসান (কলম নাম: মি. বিকেল)—লেখক, ব্লগার, শিক্ষক এবং ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। • শিক্ষা: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। • প্রকাশনা: প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে’ (রকমারি.কম-এ উপলব্ধ)। • অন্যান্য: ‘দ্য ব্যাকস্পেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০২৩ থেকে মাইক্রোসফট ডেভেলপার প্রোগ্রামে যুক্ত। যেকোনো প্রশ্ন বা যৌথ কাজের আগ্রহে যোগাযোগ করুন: [email protected] অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!